সিফাতুন নুর মরে প্রমাণ করলেন স্বামীর বাড়ির অনাচার মরে নাই

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬

মো. তারেক ও সিফাতুন নুর
মো. তারেক ও সিফাতুন নুর

মাত্র পাঁচ মাসের সংসার। অনাগত সন্তানকে নিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন। অথচ সেই স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটল এক মর্মান্তিক পরিণতিতে। হাতে তৈরি নাশতার পরিমাণ নিয়ে বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়িতে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠার নয় দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেলেন ২২ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ সিফাতুন নুর। তাঁর মৃত্যু ঘিরে উঠেছে পারিবারিক নির্যাতন, নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।


চট্টগ্রামের পটিয়ায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়; এটি পারিবারিক সম্পর্কের আড়ালে নারীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং সেই নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।


নাশতা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা, তারপর মারধরের অভিযোগ


সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার (৫৫) মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিজের হাতে তৈরি নাশতা নিয়ে যান। কিন্তু নাশতার পরিমাণ আশানুরূপ না হওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়।


অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে সিফাতুনের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম (৬০) তাঁর বেয়াইন জুহিনুর আক্তারকে মারধর করেন। একই সময়ে পরিবারের অপর দুই সদস্য রাশেদা বেগম (৫৫) ও সুমি আক্তার (৫২) সিফাতুনের চুলের মুঠি ধরে তাঁকে মাটিতে ফেলে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার।


চিৎকার শুনে আশপাশের প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন। তাঁদের সহায়তায় মা ও মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে সিফাতুনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ে বলে পরিবারের দাবি।


নয় দিনের লড়াই, শেষ পর্যন্ত হার


অভিযোগের পরপরই ওই রাতেই সিফাতুনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর দেড়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।


সিফাতুনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর বাবা মো. নুর। মেয়েকে হারানোর শোকের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদের এখন দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যাঁদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।


পাঁচ মাসের সংসার, স্বামীর অনুপস্থিতিতে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস


চন্দনাইশ পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরের তিন সন্তানের মধ্যে সিফাতুন ছিলেন সবার ছোট। প্রায় পাঁচ মাস আগে পারিবারিকভাবে পটিয়ার কুসুমপুরা ইউনিয়নের পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের ইলিয়াছ খাঁ বাড়ির মৃত আব্দুল সবুরের ছেলে দুবাইপ্রবাসী মো. তারেকের (২৬) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী বিদেশে থাকায় সিফাতুন শ্বশুরবাড়িতেই বসবাস করতেন।


সিফাতুনের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তিনি শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।


আগেই থানায় অভিযোগ, এবার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি


মারধরের ঘটনার দিনই, ১৪ অক্টোবর, সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার পটিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এতে সিফাতুনের শাশুড়িসহ পরিবারের তিন নারীকে অভিযুক্ত করা হয়।


সিফাতুনের বাবা মো. নুরের অভিযোগ, মারধরের ঘটনা আড়াল করতে এবং তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন—এমন একটি গল্প সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।


অন্যদিকে, পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, গৃহবধূকে মারধরের বিষয়ে আগে থেকেই একটি লিখিত অভিযোগ ছিল। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।


ন্যায়বিচারের প্রশ্ন


সিফাতুনের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, তিনি একই সঙ্গে ছিলেন একজন তরুণী স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের মা। তাঁর জীবনের এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনে কী ঘটেছিল, কার কী ভূমিকা ছিল এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে।


পারিবারিক বিরোধ কখনোই সহিংসতার অজুহাত হতে পারে না। ঘরের ভেতরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া—এসবই ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত।


সিফাতুনের পরিবারের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ অগ্রগতি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কোনো নারীকে যেন পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে এমন পরিণতির মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়েও সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।


একটি অনাগত প্রাণসহ সিফাতুনের মৃত্যু তাঁর পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা কোনো বিচারেই পূরণ হওয়ার নয়। তবু সত্য উদ্‌ঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

sidebar ad