নারীদের জীবনে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নানা শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে নারীদের মেনোপজ হয়। তবে এর আগে কয়েক বছর ধরে শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এই সময়কে বলা হয় পেরিমেনোপজ। শরীরের এসব লক্ষণ চিনতে পারলে পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
মেনোপজের আগে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে—
১. অনিয়মিত ঋতুস্রাব: মেনোপজের আগে মাসিকের চক্রে পরিবর্তন আসতে পারে। কখনো নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে মাসিক হতে পারে, আবার কখনো রক্তপাতের পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে। এটি পেরিমেনোপজের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ। তবে অতিরিক্ত রক্তপাত বা দীর্ঘদিন ধরে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
২. হঠাৎ গরম লাগা ও রাতে ঘাম: কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ শরীরের ওপরের অংশে গরম অনুভূত হওয়া, মুখ লাল হয়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। রাতে এমন হলে ঘুমের ব্যাঘাতও ঘটে। হরমোনের ওঠানামার কারণে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. ঘুমের সমস্যা: রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, ঘুম আসতে দেরি হওয়া কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত লাগতে পারে। রাতে ঘাম হওয়া এবং হরমোনের পরিবর্তন—দুটিই ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. মেজাজের পরিবর্তন: অল্পতেই বিরক্তি, মন খারাপ, উদ্বেগ কিংবা আবেগের ওঠানামা দেখা দিতে পারে। কারও কারও মনোযোগ ধরে রাখতে বা কোনো কিছু মনে রাখতেও সাময়িক অসুবিধা হতে পারে। তবে এসব লক্ষণের অন্য কারণও থাকতে পারে।
৫. যোনিপথে শুষ্কতা ও অস্বস্তি: ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে যোনিপথে শুষ্কতা, চুলকানি, জ্বালাপোড়া কিংবা যৌনমিলনের সময় ব্যথা হতে পারে। প্রস্রাবের তাগিদ বেড়ে যাওয়া বা বারবার মূত্রনালির সংক্রমণের সমস্যাও কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে।
৬. যৌন আগ্রহে পরিবর্তন: হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ কিংবা যোনিপথের শুষ্কতার কারণে যৌন আগ্রহ কমে যেতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এমন হয় না।
৭. ওজন ও শরীরের গঠনে পরিবর্তন: বয়স বাড়ার সঙ্গে বিপাকক্রিয়া, পেশির পরিমাণ ও শারীরিক সক্রিয়তায় পরিবর্তন আসে। ফলে পেটের চারপাশে চর্বি জমতে পারে বা ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর পেছনে শুধু মেনোপজ নয়, জীবনযাপন ও অন্যান্য শারীরিক কারণও ভূমিকা রাখে।
৮. মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা: কারও কারও মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। জয়েন্টে ব্যথা বা পেশিতে অস্বস্তিও অনুভূত হতে পারে। তবে এসব লক্ষণকে শুধু মেনোপজের ফল ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মেনোপজের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারও একাধিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে, আবার কারও তেমন কোনো সমস্যা নাও হতে পারে। সাধারণত টানা ১২ মাস ঋতুস্রাব না হলে, অন্য কোনো কারণ না থাকলে, মেনোপজ হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।
তবে ৪৫ বছরের আগে মেনোপজের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে ৪০ বছরের আগে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে মূল্যায়ন জরুরি। আর মেনোপজ নিশ্চিত হওয়ার পর যোনিপথে রক্তপাত হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এই সময়ে সুস্থ থাকতে সহায়ক। গরম লাগা, ঘুমের সমস্যা বা যোনিপথের শুষ্কতা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।
মেনোপজ কোনো রোগ নয়; এটি নারীর জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়। শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা নেওয়াই এ সময় সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা