বিয়ের পর একজন নারী কি স্ত্রী হওয়ার অপরাধে নিজের পরিবার, স্বপ্ন, স্বাধীনতা আর আত্মসম্মানের ওপর অধিকার হারিয়ে ফেলেন?ভাবুন, একটি মেয়ে বহু স্বপ্ন নিয়ে বিয়ে করেছে।সে চায় স্বামীর সঙ্গে একটি সুন্দর সংসার গড়তে, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে, সন্তানদের নিয়ে ভালো থাকতে। অথচ সংসার টিকিয়ে রাখার শর্ত হিসেবে স্বামী একের পর এক দাবি তুলছেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কমাতে হবে। নিজের উপার্জন বন্ধ করতে হবে। কার সঙ্গে কথা বলবে, কোথায় যাবে, কী পরবে সবকিছুর সিদ্ধান্ত স্বামী নেবেন। এমনকি স্বামীর অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করলেও শুনতে হবে, ‘এতই যদি সমস্যা হয়, তাহলে তালাক নিয়ে নাও!’
সংসারে দুজন মানুষের পছন্দ, অপছন্দ, প্রত্যাশা ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা থাকবেই। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবাসের জায়গা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সন্তানদের দায়িত্ব কিংবা পারিবারিক সীমারেখা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। কিন্তু আলোচনা আর চাপিয়ে দেওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে।
স্বামী যদি বলেন, আমরা কি আলাদা বাসায় থাকলে দুজনের জন্য ভালো হবে।এটি আলোচনার বিষয়। তিনি যদি বলেন, ‘তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা চলবে না, না হলে সংসার শেষ’ তাহলে সেটি আর সাধারণ মতবিরোধ থাকে না। এটি স্ত্রীর সম্পর্কের ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হতে পারে। একইভাবে, চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তও সব পরিস্থিতিতে অন্যায় নয়। সন্তান, নিরাপত্তা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন নিয়ে দুজনের আলোচনা হতে পারে। কিন্তু স্ত্রীর মতামত অগ্রাহ্য করে তাঁর আর্থিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং তাঁকে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে তোলার চেষ্টা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সংসারে সমঝোতা থাকবে, কিন্তু সমঝোতার নামে একজনের ইচ্ছার কাছে অন্যজনের পুরো অস্তিত্ব জিম্মি হতে পারে না। আমাদের সমাজে অনেক সময় স্বামীর কর্তৃত্বের কথা বলা হয়, কিন্তু সেই কর্তৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দায়িত্বের কথা বলা হয় না। রাগ, ভয় কিংবা তালাকের হুমকি দিয়ে নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াকে দাম্পত্য জীবনের আদর্শ বলা যায় না।স্ত্রীর বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, চাকরি, বাসস্থান কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মতো বিষয়ে ধর্মীয় বিধান, বাস্তব পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট সবার অধিকার বিবেচনা করতে হবে।
প্রতিটি পারিবারিক বিরোধের উত্তর এক নয়। তাই কোনো একটি শর্তকে যাচাই না করে সব ক্ষেত্রে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করাও ঠিক নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট স্বামী হওয়ার অর্থ স্ত্রীকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা তাঁর ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করার অনুমতি পাওয়া নয়।
যে শর্তগুলো একজন নারীকে ধীরে ধীরে অসহায় করে তোলে
কিছু আচরণকে আমরা সংসারের নিয়ম ভেবে মেনে নিই। অথচ সেগুলো দীর্ঘদিন চলতে থাকলে নারীর আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১. পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা:
স্ত্রীকে বাবা-মা, ভাইবোন কিংবা বিশ্বস্ত মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, যাতে তিনি বিপদে কারও সাহায্য চাইতে না পারেন।
২. আর্থিকভাবে নির্ভরশীল করে রাখা:
চাকরি বা উপার্জনের পথ বন্ধ করতে চাপ দেওয়া, অথচ নিজের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক দায়িত্বও ঠিকভাবে পালন না করা।
৩. ভয় দেখিয়ে সিদ্ধান্ত আদায়:
প্রতিটি মতবিরোধে তালাক, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কিংবা সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া।
৪. ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ:
কার সঙ্গে কথা বলবেন, কোথায় যাবেন, কী করবেন সবকিছুতে একতরফা অনুমতি ও নজরদারি দাবি করা।
৫. ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে আত্মসমর্পণ দাবি:
আমাকে ভালোবাসলে আমার সব কথা মানতে হবেএই ধারণার মাধ্যমে নিজের অন্যায় আচরণকেও স্বাভাবিক করে তোলা।
একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো সম্পর্কের বিচার করা যায় না। কিন্তু এসব আচরণ যদি বারবার ঘটে, ভয় সৃষ্টি করে এবং একজনকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে একজন স্ত্রী কী করা উচিত :
প্রথমেই নিজের কাছে পরিষ্কার করুন। আপনি কি একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজছেন, নাকি আপনাকে ভয় দেখিয়ে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রথম পদক্ষেপ:
নিজের অবস্থান বুঝুন। কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা সম্ভব এবং কোন আচরণ আপনার নিরাপত্তা, মর্যাদা বা মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, তা চিহ্নিত করুন। শান্তভাবে নিজের সীমারেখা জানান।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ:
একা হয়ে যাবেন না। বিশ্বস্ত আত্মীয়, বন্ধু বা নিরপেক্ষ কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন। দুই পরিবারের এমন ব্যক্তিদের যুক্ত করুন, যাঁরা শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার কথা বলবেন না, ন্যায়সংগত সমাধানও চাইবেন। তবে নির্যাতন বা ভয়ভীতির আশঙ্কা থাকলে সরাসরি মুখোমুখি সালিশে বসার আগে নিজের নিরাপত্তা বিবেচনা করুন।
তৃতীয় পদক্ষেপ:
প্রয়োজনীয় প্রমাণ ও কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন। হুমকিমূলক বার্তা, প্রাসঙ্গিক কথোপকথন, আর্থিক লেনদেন এবং ঘটনার তারিখ নিরাপদে লিখে রাখুন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ রেকর্ড করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন মেনে চলুন।
চতুর্থ পদক্ষেপ:
নিজের আইনি অধিকার জানুন। বাংলাদেশে দেনমোহর, ভরণপোষণ, বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন এবং ঘটনার ধরন অনুযায়ী প্রতিকার ভিন্ন হতে পারে। কাবিননামার শর্ত, বিয়ের ধরন এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি না জেনে কোনো শর্তকে আইনগতভাবে অকার্যকর বা কোনো আচরণকে নিশ্চিতভাবে অপরাধ বলা ঠিক নয়। প্রয়োজনে আইনজীবী বা সরকারি আইনগত সহায়তার পরামর্শ নিন। আর যদি শারীরিক ক্ষতি, আটকে রাখা বা গুরুতর হুমকির আশঙ্কা থাকে, তাহলে আগে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিন। তাৎক্ষণিক বিপদে বাংলাদেশে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
প্রতিটি মতবিরোধের সমাধান বিচ্ছেদও নয়। যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আছে, সেখানে আলোচনা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পর্ক ভালো হতে পারে। আর যেখানে বারবার অপমান, নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতন চলছে, সেখানে নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন, সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের অহংকার ছাড়তে হতে পারে, কিছু অভ্যাস বদলাতে হতে পারে, কিন্তু নিজের মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া কোনো সম্পর্কের পূর্বশর্ত হতে পারে না। একটি সুস্থ সংসারে স্ত্রীকে প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় না যে তিনি স্বামীর অধীন। সেখানে দুজনেই বুঝতে শেখেন। আমরা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়, পাশাপাশি পথ চলার জন্য জীবনসঙ্গী হয়েছি।
পাঠকের কাছে একটি প্রশ্ন
একজন নারী যদি সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের বাবা-মা, পেশা, স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান সবকিছু একে একে বিসর্জন দেন, অথচ বিনিময়ে পান শুধু ভয় আর শর্ত, তাহলে সেই সংসার টিকিয়ে রাখাকে কি সত্যিই সফল দাম্পত্য বলা যায়? আপনার মতে, সংসার বাঁচানোর দায়িত্ব কি দুজনের, নাকি সমাজ এখনো সেই দায়িত্বের পুরো বোঝা নারীর কাঁধেই চাপিয়ে দিতে চায়?