সময়টা ছিল ২০১১ সালের মে মাস, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর কাছে একটি ছোট দ্বীপে বাস করতেন জোয়াও পেরেইরা দে সোজা নামে ৭১ বছর বয়সী একজন অবসরপ্রাপ্ত রাজমিস্ত্রী ও খণ্ডকালীন জেলে। একদিন তিনি তার বাড়ির কাছে প্রোভেটা বিচে একটি ছোট ম্যাগেলানিক পেঙ্গুইন দেখতে পান, যার পুরো শরীর কালো ক্ষতিকর তেলে মাখামাখি ছিল, এটি ক্ষুধার্ত ছিল এবং নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়েছিল।
জোয়াও পাখিটিকে উদ্ধার করে পরম যত্নে বাড়ি নিয়ে আসেন। টানা কয়েকদিন ধরে পেংগুইনটির পালক থেকে বিষাক্ত তেল পরিষ্কার করেন এবং প্রতিদিন তাকে তাজা সার্ডিন মাছ খাওয়ান। ধীরে ধীরে পাখিটি সুস্থ হয়ে উঠলে জোয়াও তার নাম রাখেন ডিনডিম।
প্রায় ১১ মাস ডিনডিম জোয়াও-এর বাড়িতেই থেকে যায়। এরপর যখন তার শরীরের পুরনো পালক খসে নতুন পালক গজায়, তখন জোয়াও বুঝতে পারেন যে এটিকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। তিনি ডিনডিমকে নৌকায় করে সমুদ্রে নিয়ে ছেড়ে দেন, ভাবেন হয়তো বন্য পাখিটি তার আপন ঠিকানায় ফিরে গেছে এবং আর কখনো দেখা হবে না।
কিন্তু জোয়াও-কে অবাক করে দিয়ে মাত্র কয়েক মাস পরেই ডিনডিম আবার সেই দ্বীপে ফিরে আসে এবং সরাসরি জোয়াও-এর বাড়ি চলে যায়। এরপর থেকে ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ৭-৮ বছর ডিনডিম প্রতি বছর নিয়ম করে জোয়াও-এর কাছে ফিরে আসত।
সাধারণত এই প্রজাতির পেংগুইনরা আর্জেন্টিনা ও চিলির পাতাগোনিয়া অঞ্চলে প্রজননের জন্য থাকে। জীববিজ্ঞানীদের ধারণা, ডিনডিম প্রতি বছর জোয়াও-এর সাথে দেখা করতে প্রায় ৫,০০০ মাইল সমুদ্র পথ সাঁতরে যাতায়াত করত। প্রতি বছর জুন মাসের দিকে ডিনডিম ব্রাজিলে জোয়াও-এর কাছে চলে আসত এবং পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত (প্রায় ৮ মাস) তার সাথেই থাকত। বাকি ৪ মাস সে প্রজননের জন্য চলে যেত।
জোয়াও ও ডিনডিমের মধ্যকার সম্পর্ক এতোটাই অনন্য ছিল যে সংবাদমাধ্যমে পর্যন্ত উঠে এসেছিল তাদের অদ্ভুত বন্ধুত্বের গল্প। আর ২০২৪ সালে তো এই হৃদয়স্পর্শী কাহিনী নিয়ে এক আস্ত চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল।
ডিনডিমের গল্প আমাদের মনে একটা প্রশ্ন জাগায়—পরিচিত আশ্রয়ের কাছে ফিরে আসার এই টানটা কি শুধু প্রাণীদের মধ্যেই থাকে?
আমাদের জীবনেও তো এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের সঙ্গে একসময় প্রতিদিন কথা হতো। দিনের ছোটখাটো ঘটনা থেকে শুরু করে জীবনের বড় দুশ্চিন্তা সবকিছুই ভাগাভাগি হতো। তারপর বাস্তবতার চাপে, ব্যস্ততার ভিড়ে কখন যে কথাগুলো কমতে কমতে বন্ধ হয়ে গেল, তা আর খেয়াল করা হয়নি।ফোন নম্বরটা এখনো আছে, মানুষটিও হয়তো আছেন; শুধু ফোন করা হয় না। যোগাযোগের অভাব, ব্যস্ততার অজুহাতে প্রিয় মানুষদের খোঁজ নেওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
একটি সম্পর্ক কি সব সময় বড় কোনো ঝগড়ায় ভেঙে যায়, নাকি কখনো কখনো ছোট ছোট নীরবতার মধ্যেই হারিয়ে যায়?
সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার আগে আমরা ফোনটাই হাতে নিই। ম্যাসেজ চেক, নোটিফিকেশন, নিউজ ফিড স্ক্রলিং; সবই চলে। রাতে ঘুমানোর আগেও ফোন দেখি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত মানুষের ছবি দেখি, পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানাই, কত অপ্রয়োজনীয় কথায় সময় কাটাই!
মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করা হয় না, ‘কী করছ?’ কালেভদ্রে হয়তো কথা হয়, কিন্তু সবসময় যে খোঁজ নেয়া তা আর কেন যেন হয়ে ওঠেনা।
দূরে থাকা বন্ধুটিকে বলা হয় না, ‘অনেক দিন কথা হয় না, কেমন আছিস?’ অথচ যে বন্ধুটির সঙ্গে একসময় কথা না বলে দিন শেষ হতো না, তাকে একটা ফোন করার সময়ও হয় না।
বাবার শরীরটা কেমন আছে, পুরোনো সহকর্মীটি কেমন আছেন, কিংবা একসময় খুব কাছের সেই আত্মীয়টির দিনকাল কেমন যাচ্ছে—খোঁজ নেওয়া হয় না।
আমরা ভাবি, পরে কথা বলব। একটু সময় হলেই ফোন করব। ব্যস্ততা কমলে আবার দেখা করব।
কিন্তু সেই ‘পরে’ আর আসে না।
এভাবেই সম্পর্কের মৃত্যু হয়। একটু খেয়াল করে দেখবেন এসবের পেছনে সব সময় বড় কোন ঝগড়া, তীব্র অভিমান কিংবা বিশ্বাসভঙ্গের মত নাটকীয় ঘটনা ঘটে না। শুধু কথা কমতে থাকে, খোঁজ নেওয়া বন্ধ হয়। আমরা বলি, সময় পাইনি। ফোন করার কথা মনে ছিল না। অনেক দিন কথা হয়নি, এখন হঠাৎ কীভাবে কথা শুরু করব? তারপর আর ফোন করা হয় না। এভাবেই মাস পেরিয়ে বছর চলে যায়।
দুজন মানুষই হয়তো দুজনকে মনে করেন। দুজনেরই হয়তো কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কে আগে ফোন করবে, কী বলে কথা শুরু করবে, এত দিন পর ফোন করলে অন্যজন কী ভাববে—এসব ভাবতে ভাবতেই সময় চলে যায়।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সবসময় বড় উপহারের প্রয়োজন পড়েনা। ‘কেমন আছ?’ -বলার জন্য বিশেষ কোনো উপলক্ষ লাগে না। একটু খোঁজ নেওয়া, পাশে থাকা, দূরত্ব ছাপিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করা। কখনো কখনো পাঁচ মিনিটের একটা ফোনকলই কাউকে বুঝিয়ে দিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ এখনো তাঁর কথা মনে রেখেছেন।
তবে এই কথাও সত্য যে, সব নীরবতা অবহেলা থেকে নয়। কেউ মানসিক ক্লান্তিতে থাকেন, কেউ বিষণ্নতায় ভোগেন, কেউবা আবার জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে যোগাযোগ করার শক্তিটুকুও পান না। আবার পুরোনো কোনো আঘাতের কারণেও সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব চলে আসে। জরুরী নয় যে, সব সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা। অনেক সময় তা সম্ভব হয়েও ওঠে না। কিন্তু যেসব সম্পর্ক আমাদের কাছে মূল্যবান, সেগুলোর যত্ন নেওয়ার সুযোগ থাকলে শুধু সংকোচ কিংবা অজুহাতের কারণে তা ফেলে রাখব কেন?
ডিনডিমের গল্প আমাদের শেখায় না যে প্রানীকূলের আচরণ আর মানুষের ভালোবাসা এক। বরং গল্পটি আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি আমাদের জীবনের পরিচিত মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের সুতোটা যত্ন করে ধরে রাখছি? মানুষ হারিয়ে যাওয়ার পর খোঁজ নেওয়ার চেয়ে, থাকতে থাকতে খোঁজ নিন।
একবার ভাবুন, আপনার ফোনে এমন কার কার নাম আছে, যাঁদের সঙ্গে কথা বলার কথা আপনি অনেক দিন ধরে ভাবছেন? এমন কোনো বন্ধু, যাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে একসময় রাত পেরিয়ে যেত? এমন কোনো মানুষ, যাঁর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে অথচ মনে মনে এখনো তাঁর ভালো থাকাটা কামনা করেন? হয়তো আজই তাঁদের কাউকে ফোন করা যায়।
কোনো অভিযোগ নয়, পুরোনো হিসাব মেলাতে নয়। শুধু একটু কথা বলতে। জানতে চাইতে, মানুষটা কেমন আছেন। দিনশেষে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সব সময় কাছে থাকা লাগে না। কখনো কখনো দূরে থেকেও বুঝিয়ে দেওয়া যায়, সে আপনার কাছে এখনো স্পেশাল।