ছবির মেয়েটিকে দেখে মনে হতে পারে, সে বুঝি কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়ে পড়েছে। শরীরটা বসা অবস্থায়, চোখ বন্ধ, পরনে প্রাচীন পোশাক। অথচ তার বয়স পাঁচ শতকেরও বেশি। আন্দিজ পর্বতমালার তুষার ও শুষ্ক ঠান্ডা বাতাসে সংরক্ষিত এই কিশোরী ইতিহাসে পরিচিত ‘লুল্লাইয়াকো মেইডেন’ নামে।
১৯৯৯ সালে আর্জেন্টিনার লুল্লাইয়াকো আগ্নেয়গিরির প্রায় ৬ হাজার ৭৩৯ মিটার উচ্চতায় আরও দুই শিশুর সঙ্গে তার মমি আবিষ্কৃত হয়। তাদের দেহ এতটাই ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল যে বিজ্ঞানীরা চুল, নখ, দাঁত ও শরীরের ভেতরের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করে প্রায় ৫০০ বছর আগের জীবনের নানা তথ্য বের করতে পেরেছেন।
সাম্প্রতিক গবেষণায় ইনকা সাম্রাজ্যের মানববলির সঙ্গে যুক্ত শিশুদের শরীরে কী ধরনের মাদক বা মনঃপ্রভাবক পদার্থ পৌঁছেছিল, সে বিষয়ে আরও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। গবেষকেরা বিভিন্ন পর্বতের আটটি মমির চুল ও নখ পরীক্ষা করেছেন। আটজনের চুলের নমুনাতেই কোকেনের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে—যা গবেষকদের মতে কোকা পাতা চিবানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। কয়েকজনের ক্ষেত্রে অ্যালকোহল গ্রহণেরও প্রমাণ মিলেছে। একটি মমির নখে পাওয়া গেছে হারমিন, যা বানিস্টেরিওপসিস গোত্রের উদ্ভিদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আয়াহুয়াস্কা নামের আচারিক পানীয়তে পাওয়া যেতে পারে।
কেন দেওয়া হতো এসব পদার্থ?
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে। ইনকা সাম্রাজ্যে কাপাকোচা নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার ছিল। এতে শিশু ও তরুণীদের দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হতো। পাহাড়ের চূড়া, আগ্নেয়গিরি কিংবা পবিত্র স্থানকে ঘিরে এই আচার অনুষ্ঠিত হতো। গবেষকদের ধারণা, নির্বাচিত শিশুদের দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো এবং অনেক সময় তাদের দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হতো।
কোকা পাতা ইনকা সমাজে শুধু নেশাজাতীয় বস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হতো না। ধর্মীয় আচার, দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদন, ক্লান্তি কমানো এবং উচ্চভূমির পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার ছিল। ফলে মমির চুলে কোকেনের রাসায়নিক চিহ্ন পাওয়া মানেই আধুনিক অর্থে কেউ ‘কোকেন সেবন’ করেছিল—এমনটা বলা ঠিক নয়। বরং কোকা পাতা চিবানোর প্রমাণ হিসেবে এটিকে দেখা হয়। তবে শেষ সময়ের দিকে এর ব্যবহার নিয়ে অন্য প্রশ্ন তৈরি হয়।
মৃত্যুর আগে বদলে গিয়েছিল জীবন
২০১৩ সালে লুল্লাইয়াকো মেইডেনসহ তিন শিশুর চুল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছিলেন, বিশেষ করে মেইডেনের ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগের এক বছরে কোকা গ্রহণ বেড়ে যায়। শেষ কয়েক সপ্তাহে তার অ্যালকোহল গ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। তার মুখের ভেতর চিবানো কোকা পাতার একটি দলাও পাওয়া গিয়েছিল।
চুলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই গবেষণাকে সম্ভব করেছে। চুল বাড়ার সময় শরীরে থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদান তার মধ্যে জমা হতে পারে এবং পরে সেগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে। ফলে চুলকে অনেকটা জীবনের রাসায়নিক ‘টাইমলাইন’ হিসেবে পড়া যায়।
শুধু নেশা নয়, ধর্মীয় বিশ্বাসও ছিল
প্রাচীন ইনকা সমাজে এসব উদ্ভিদ ও পানীয়ের ব্যবহারকে বর্তমান সময়ের মাদক ব্যবহারের ধারণা দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। কোকা, অ্যালকোহল এবং অন্যান্য উদ্ভিদজাত পদার্থের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস, দেবতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং আচারিক পরিবর্তনের ধারণা জড়িয়ে ছিল।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় পেরুর আমপাতো পর্বতে পাওয়া দুটি ইনকা শিশুর চুল ও নখ পরীক্ষা করে কোকা-জাতীয় উপাদানের পাশাপাশি হারমিন ও হারমালিন পাওয়া যায়। গবেষকেরা তখন ধারণা করেছিলেন, এগুলো এমন কোনো আচারিক পানীয়ের অংশ হতে পারে, যা শিশুদের মানসিক অবস্থা শান্ত রাখতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
নতুন গবেষণার ফলাফলও বলছে, সব শিশুকে একইভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। বিভিন্ন মমির রাসায়নিক চিহ্নের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কোন পাহাড়ে, কোন দেবতার উদ্দেশে এবং কোন ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে আচারটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে—তার ওপর প্রস্তুতির ধরন বদলাতে পারে।
একটি মমি, একটি মানুষের গল্প
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত মাদক বা রাসায়নিক পদার্থের তালিকা নয়। বরং একটি শিশুর জীবনের শেষ অধ্যায়কে নতুন করে দেখতে পারা।
লুল্লাইয়াকো মেইডেনের বয়স ছিল প্রায় ১৩ বছর। তার চুলে খাবার, কোকা ও অ্যালকোহল গ্রহণের পরিবর্তনের যে চিহ্ন পাওয়া গেছে, তা থেকে বোঝা যায়—তার মৃত্যু হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে একটি বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
তখনকার সমাজে এই শিশুদের হয়তো পবিত্র ও বিশেষ মর্যাদার মানুষ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আধুনিক দৃষ্টিতে প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি শিশু নিজের জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে কতটা সিদ্ধান্ত নিতে পারত?
গবেষকেরাও সতর্ক। মমির চুল ও নখ থেকে রাসায়নিক তথ্য পাওয়া গেলেও সেই শিশুর মনের ভেতর কী চলছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। নতুন গবেষণার ভাষ্যও তাই—তাদের ধর্মীয় মর্যাদা ছিল বলে ধরে নেওয়া যায় না যে অভিজ্ঞতাটি তাদের জন্য ভীতিকর বা মানসিকভাবে কঠিন ছিল না।
পাঁচ শতক পর বিজ্ঞান তাই শুধু ইনকা সভ্যতার একটি অন্ধকার আচারকে উন্মোচন করছে না; উন্মোচন করছে কয়েকজন শিশুর হারিয়ে যাওয়া জীবনের শেষ দিনগুলোকেও। বরফে জমে থাকা সেই শরীরগুলো কথা বলতে পারে না। কিন্তু তাদের চুল, নখ, দাঁত আর শরীরে রয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র রাসায়নিক চিহ্নগুলো যেন আজও বলে যাচ্ছে—মৃত্যুর আগে তাদের জীবন কতটা বদলে গিয়েছিল।
সূত্র: জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স রিপোর্ট