পথচলার শুরুটা খুব একটা সহজ ছিল না। আমাদের সমাজে এখনো মেয়েদের এগিয়ে চলতে হয় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই। আর সেই বাধাটা প্রথম আসে পরিবার থেকে। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তো আছেই। ব্যবসা শুরু করতে প্রথম যে বাধার সম্মুখীন হই, তা হলো মূলধনের অপ্রতুলতা। তারপর দক্ষ কর্মী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে রাখাটাও একটা চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে মেয়েদের ব্যাংক লোন পাওয়া ততটা সহজ নয়। বলছিলেন রন্ধনশিল্পের অতি পরিচিত মুখ আফরোজা নাজনীন সুমী। কথা হলো রোদসীর সঙ্গে। গ্রন্থনা করেছেন সুরাইয়া নাজনীন।
সংগ্রামের গল্প-
আমার সংগ্রামের গল্পটা সমস্ত
প্রতিকূলতা কাটিয়ে একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে বহুমুখী প্রফেশনাল হয়ে ওঠার। পড়াশোনা করেছি
'এইচআর' নিয়ে এমবিএ। ইচ্ছা ছিল করপোরেট জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু সংসার
ও সন্তান সামলিয়ে নানা প্রতিকূলতার কারণে সেই করপোরেট জগতে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু সব সময়ই ইচ্ছা ছিল কিছু একটা করার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। এই কিছু একটা করার
ইচ্ছা তাড়িয়ে বেড়াত সব সময়। কারণ নিরেট সত্য হলো আর্থিক সচ্ছলতা ছাড়া কেউ কখনো স্বনির্ভর
হতে পারে না। প্রথম সংগ্রাম শুরু হয় নিজের সঙ্গেই। ড্রাইভিং শেখা, ফুড অ্যান্ড বেভারেজের
ওপর প্রফেশনাল ট্রেনিং, বারিস্তা ট্রেনিং নেওয়া, ফুড হাইজিনের ওপর কোর্স করা, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের
ওপর সার্টিফিকেশন কোর্স করা, ফটোগ্রাফির কোর্স করা, এসবের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নিজেকে
ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে ছোটবেলাটা কেটেছে বাংলাদেশের
বিভিন্ন জেলায়। সেই থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক খাবারের সঙ্গে পরিচয় আর ভালোবাসা।
বাধাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে
দেখেছি-
আমি প্রতিটি বাধাকেই আলাদা
চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেছি। আমি মনে করি সফলতার জন্য নিষ্ঠা,
ধৈর্যশীলতা ও অধ্যবসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস যদি থাকে,
প্রতিটি মানুষই সেসব বাধা অতিক্রম করে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, সফল হতে পারে। পরিবারের
এক দিক থেকে যেমন বাধা পেয়েছি, তেমনি অন্যদিকে আমার মা, আমার সন্তানেরা আমাকে অনুপ্রেরণা
জুগিয়েছে, নানাভাবে সাহায্য করেছে। আমার এই আজকের 'আফরোজা নাজনীন সুমি' হয়ে ওঠার পেছনে
তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
এখন পেশার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
বদলাচ্ছে-
সামাজিক অবস্থা আর গড়পড়তা মানুষের স্বাধ্যায়নের কথা যদি বলো, সেটা তখন যেমন খুব অনুকূলে ছিল না, এখনো লোই। তবে আমি আশাবাদী এই ভেবে যে আস্তে আস্তে মানুষের এই পেশার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে, শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হচ্ছে।
আমাদের বাংলাদেশের প্রায়
প্রতিটি বাড়িতে মেয়েরাই সব সময় রান্না করছে কিন্তু এই কাজটাই যখন বাইরে গিয়ে করছে,
তখন সে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে, নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার
এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারছে। কিন্তু তারপরও মেয়েদের এ কাজটাকে
যতটা মূল্যায়ন করা উচিত, ততটা করা হচ্ছে না।
হাজারো প্রতিকূলতা সামাল
দিয়ে-
পরিবার থেকে সে রকম কোনো সহযোগিতা না থাকায় একাই ঘরসংসার সব সামলিয়ে হাজারো প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বাইরের জগতে টিকে থেকে, কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু হয় নতুন এক সংগ্রামের। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সুনামের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি সুমিস কিচেনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিষ্ঠিত করা শুরু হয়। শুধু রন্ধনশিল্পী থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে একজন উদ্যোক্তার ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হই। এই পথচলার শুরুটাও খুব সহজ ছিল না। আসলে আমাদের এই সমাজে এখনো মেয়েদের এগিয়ে চলতে হয় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই আর সেই বাধাটা প্রথম আসে পরিবার থেকেই। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তো আছেই। ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে প্রথম যে বাধার সম্মুখীন হই, সেটা হলো মূলধনের অপ্রতুলতা। তারপর দক্ষ কর্মী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে রাখাটাও একটা চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে মেয়েদের ব্যাংক লোন জোগাড় করা খুব একটা সহজ নয়। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না।
এই পেশার প্রতি আগ্রহ যে
কারণে-
ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খাবার রান্না করতে আর আশপাশের মানুষকে খাওয়ানোর আনন্দ থেকেই এই পেশার প্রতি আগ্রহ জন্মে। ভালো রান্নার হাত থাকায় খুব অল্প সময়েই আশপাশে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই একদিন ডাক পড়ে যমুনা টেলিভিশনের লাইভ কুকিং শোতে। সেই থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পথচলা শুরু। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি।
করোনো পরিস্তিতিতে যেভাবে
কাজ করেছি-
পথিবীজুড়েই করোনার ভয়াবহতার একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। করোনাকালে প্রথমে আসলে আমি সব কাজই বন্ধ রেখেছিলাম। পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আমাদের সবারই কিছুটা সময় লেগেছিল। তারপর আস্তে আস্তে অনলাইনে ট্রেনিং করা, স্বল্প পরিসরে খাবারের অর্ডার নেওয়া শুরু করি। আমি মনে করি দৃঢ় মনোবল থাকলে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়া যায়।
প্রথমে নারীকে নিজের প্রতি
শ্রদ্ধাশীল হতে হবে-
নারীর নিজের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং কারও করে দেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে নিজের কাজ নিজেকেই করে যেতে হবে। আর আমি কোনো বিশেষ দিবসে বিশ্বাসী নই। একটা নির্দিষ্ট দিবসের মধ্যে সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকার মনমানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তরুণদের বলব, এ পেশায় বাংলাদেশ এবং দেশের বাইরে সব জায়গাতেই কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। দিন দিন ফুড ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করার নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সাফল্যকে হাতের মুঠোয় আনা
খুব একটা কঠিন নয়-
যেকোনো সাফল্যকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। নিষ্ঠা, ধৈর্যশীলতা, কাজের প্রতি ভালোবাসা এবং অধ্যবসায় যে কাউকেই পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের দোরগোড়ায়। সুতরাং লেগে থাকো, এগিয়ে যাও, ব্যর্থতাগুলোকে পরিণত করো ভুল শুধরে নেওয়ার শিক্ষায়। তাহলেই দেখবে সাফল্য তোমার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়েছে।
ঢাকা/টিএ