চিন্তায় বদল দরকার : আফরোজা পারভীন

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬

চিন্তায় বদল দরকার : আফরোজা পারভীন

রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম। ভাবনাতেই ছিল না এই সেক্টরে পেশা গড়বেন। পড়াশোনাও অন্য বিষয়ে। তবু মনের এক কোণে দাগ কেটে যায় বিউটিফিকেশন নিয়ে ভাবার, নিরীক্ষা করার। পথটা খুব সহজ ছিল না। বলছিলাম 'আফরোজা পারভীনের' কথা, যিনি বিউটি সেক্টরে এক অনবদ্য নাম। তার জীবনের বাঁকবদলের গল্প থাকছে রোদসীর নারী দিবসের আয়োজনে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুরাইয়া নাজনীন



যাত্রা শুরু যেভাবে-

শুরুটা হয়েছিল এক গল্পের মধ্য দিয়ে। ২০০৬-এ আমার শাশুড়িকে সারপ্রাইজ দেওয়ার ইচ্ছা হলো। ভাবলাম একটা ফটোশুট গিফট করব। তখন ফটোগ্রাফার অপূর্ব ভাই দাপিয়ে কাজ করছেন। অপূর্ব ভাইয়ের ওখানে আমরা যাই। নয়ন নামে একজন মেকআপ আর্টিস্ট ওনাকে সাজান, সেই আড়াই ঘণ্টা আমি দাঁড়িয়ে! কীভাবে সময় চলে গিয়েছিল, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তখন ভাবলাম তুমুল আগ্রহ এবং ভালো লাগার জায়গা বোধ হয় আমি ধরতে পেরেছি। ফটোশুট হলো। আমি পরে নয়নকে কন্ট্যাক্ট করলাম। বললাম আমাকে কাজ শেখাতে হবে। সে-ও রাজি হয়ে গেল। কাজগুলো ঠিক আমার ভেতরেই ছিল কিন্তু কৌশলগুলো ওর কাছ থেকে শিখে নিলাম। সাত-আট দিন লেগেছিল। এই সময়ের মধ্যেই নয়নের দুটো কাজ পড়ে গেল। একটা টিভিসির, একটা স্টিল ফটোর। একসঙ্গে তো দুটো করা যায় না। তাই নয়ন আমাকে স্টিল ফটোর কাজটি করতে বলল। কিন্তু আমার কাছে তখন ততটা ইকুইপমেন্টসও নেই। কিন্তু কাজের আগ্রহ থেকে কিনে ফেললাম। প্রথম কাজ হয়েছিল ফেরদৌস ভাই আর সুমাইয়া শিমুর সঙ্গে। সুমাইয়া শিমু তখন ফুল ভলিউমে কাজ করছে। আমার বেশ কনফিডেন্স ছিল, তাই প্রথম কাজটিই খুব আনন্দের সঙ্গে শেষ করতে পেরেছিলাম। কাজটি এত ভালো হয়েছিল যে, ওই সপ্তাহে আমি আরও তিনটি কাজ করি। পরের সপ্তাহে আরও কয়েকটি কাজের অফার পাই। ওখান থেকেই আমার মূল আর্নি।


সমস্যা হয়েছিল যেখানে-

বিউটিফিকেশন জগৎ নিয়ে ততটা সমস্যা হয়নি। তবে নেগেটিভ ভাইব পেলাম প্রতিষ্ঠান খুলতে গিয়ে। কেউ আমাকে বিউটি স্যালনের জন্য ভাড়া দেবে না। কিন্তু পরে দেখলাম ওই সব বিল্ডিংয়েই বুটিক হাউসসহ নানা রকম দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। খুব সুন্দর একটি বাড়ি পছন্দ করলাম, অ্যাডভান্সও দিলাম কিন্তু কয়েক দিন পর বাড়িওয়ালা আমাকে ডেকে সেটি ফিরিয়ে দিলেন। তবে এখন সময় বদলেছে, যদি এখন গিয়ে দাঁড়াই সেসব জায়গায় তারা কিন্তু না করবে না। জরিপ করলে বোঝা যেত, বিউটি সার্ভিস নেয় না এমন পরিবার খুবই কম। নেই বললেই চলে। তবু কেন যেন আমাদের দেশে বিউটি স্যালনের সেই মূল্যায়নটা নেই, হয়ে ওঠেনি।


করোনা এবং টিকে থাকা-

এইটা আসলে গোটা বিশ্বের সমস্যা। একজন-দুজনের নয়। আমি আমার একটা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছি। অনেকে বন্ধ করেছে কিন্তু লুকাচ্ছে। এখানে লুকানোর কিছু নেই আমার মনে হয়। সমস্যা বিশ্বব্যাপী। যে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করেছি, সেখানকার এমপ্লয়িদের কাজের ব্যবস্থা করেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।


বিউটিফিকেশন এবং আত্মবিশ্বাস-

বিউটিফিকেশন একজন মানুষকে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। একটা মেয়ে শিক্ষিত, মেধাবী কিন্তু তার মধ্যে বিউটিফিকেশনের গ্রুমিংটা নেই, সে কোথাও গিয়ে কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস পাবে না, যেটি সে করতে পারে। একই প্ল্যাটফর্ম থেকে বিউটিফিকেশনে আত্মবিশাসী হয়ে অন্য একটি মেয়ে যদি কোথাও যায়, আর তার যদি কিছুটা ল্যাকিংসও থাকে, তবে সে কিন্তু ওভারকাম করতে পারবে। তবে বিউটিফিকেশন মানেই যে জবরজং সাজগোজ, তা নয়। নিজেকে গুছিয়ে রাখা। পরিস্থিতি এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে সচেতন করার মতো অনেক কিছুই বিউটিফিকেশনের অংশ। এটা জীবনের শৈল্পিকতাও।


অপ্রত্যাশিত ঘটনাও এসেছে-

অনেকে বলেছে, মডেলদের দিয়ে ফটোশুট করাব। হেল্প লাগবে। ওকে ফাইন, সে জন্য আমার দুয়ার সব সময় উন্মুক্ত। কিন্তু এখান থেকেই অনেকে এমন এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, যেটার অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। একবার একদল এসেছে একই কথা বলে। সাজগোজ শেষ হলো। যাওয়ার সময় বলছে আমাদের গোল্ড হারিয়েছে। তারপর বলে পাঁচ ভরি গোল্ড হারিয়েছে। তখন পুলিশ, মামলার কথা বললে উল্টো মাফ চাওয়া। এগুলো খুবই বিব্রতকর অভিজ্ঞতা। এমনকি অনেক সময় বিভিন্ন চাঁদাবাজির সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেগুলোও টেকনিক্যালি হ্যান্ডেল করতে হয়েছে। এসব আসলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় কুড়াল মারা তবে এসব ভেবে লাভ নেই। এগিয়ে যেতে হবে সামনে। মনকে ভাঙতে দেওয়া যাবে না।


প্রতিবন্ধকতাই ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়-

উদ্যোক্তা হতে গেলে প্রতিবন্ধকতা আসবেই। সবার জীবনেই আসে। যখন ব্যবসা শুরু করলাম, তখনই আমি কনসিভ করি। তা ছাড়া আমার শারীরিক কিছু জটিলতা ছিল। নতুন ব্যবসা, আবার সন্তানের আগমন। দুটো বাচ্চা পালা একসঙ্গে বলতে গেলে। কিন্তু ঝড়টা ওঠে সন্তান হওয়ার আগেই, হয়তোবা আমি সেটা বুঝতে পারিনি কিংবা আমলেই নিইনি। কিন্তু কি বুঝলাম ডেলিভারির পর যখন নিজের বিল নিজেকে দিতে হলো, বের হয়ে দেখলাম দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোনো লোক নেই ড্রাইভার ছাড়া। তখন কিছু সমস্যা ফাইন্ড আউট করি। এভাবে চলতে থাকে তিন বছর।

ভাবলাম এই বুঝি সব ঠিক হলো কিন্তু কিছুই ঠিক হলো না, উল্টো খারাপ হলো। আমি আমার একটা জীবন থেকে ব্রেক নিলাম। সংসার দুভাগ হয়ে গেল। সেই মানুষটির সিদ্ধান্তে আমি প্রতিবাদ করিনি। জোর করে তো আর সংসার হয় না! তবে কষ্ট হয়েছে এখানেই যে ছেলেটি বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হলো আড়াই বছর বয়স থেকে। তারপর ছেলেকে নিয়ে শুরু হলো আমার আরেক লড়াই। যেটাতে হেরে যাওয়া যাবে না। হেরে গেলে চলবে না। ভাবলাম বাবার আদর ছাড়া আমাকে সবই দিতে হবে, সে জন্য ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সাহস, শক্তি, মেধা, দক্ষতা, নিষ্ঠা এসব নিয়ে লেগে পড়লাম। সমানতালে শুরু হলো দুই বাচ্চা একসঙ্গে পালা। একটি সন্তান, অন্যটি ব্যবসা। শুরু করলাম 'রেড'। এখন 'রেড' যে পর্যায়ে এসেছে, শুরুটা ঠিক ততটা সহজ ছিল না। হেরে যাওয়ার, পিছিয়ে পড়ার অনেক কিছু সামনে এসেছে কিন্তু খুলে দাঁড়িয়েছি বারবার। ডিভোর্সের পর পাঁচ বছর সিঙ্গেল ছিলাম। এরপর অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করেছি। জীবনসঙ্গী হয়ে এখন যে এসেছে, আমি মনে করি সে আমার জন্য এবং আমার সন্তানের জন্য আশীর্বাদ।


সমাজ থেকে কী কী বদলালে নারীমুক্তি সম্ভব-

আসলে এটা কোনো চাবি সিস্টেম নয়, চাবি ঘুরিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রথমে ভাবনার জায়গাটা বদলাতে হবে। এখনো সমাজে যে পরিমাণ লকিং আছে, থট প্রসেসগুলো এত বেশি কমপ্লিকেটেড, যা এক দিন বা এক বছরেও সম্ভব নয়। আগে ঘরে পরিবর্তন আনতে হবে। আমার সন্তান ছেলে, তাই তার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে হবে কিন্তু মেয়ের জন্য কোনো দায়বদ্ধতা নেই! কারণ ওর তো বিয়ে হয়ে যাবে। সে জিনিসগুলো আমাদের ঠিক করতে হবে। ছেলের চলাফেরায় আমরা কখনোই বাধা দিই না কিন্তু মেয়েটাকে প্রতি পদে পদে দেয়াল তুলে দিই। পরিবেশ, প্রতিবেশী, সমাজ সবাই। আমার সন্তান আমার কাছে রক্তের সম্পর্ক, কিন্তু ছেলের বউটা পর। ধ্যানধারণার এই ফরম্যাটটা বদলাতে হবে। কারণ, আমার পরে আমার সন্তানকে ছেলের বউটাই ভালো রাখতে হবে। তাহলে আমি কেন বউটাকে আগলে রাখব না? আর সবচেয়ে জরুরি সবার মধ্যে মানবিক শিক্ষা গ্রো করা। এটা না হলে সমাজ কোনোকালেই বদলাবে না।


প্রতিদিনই নারী দিবস-

আমার কাছে মনে হয় প্রতিদিনই নারী দিবস। কারণ, নারী যদি একটা দিন কোনো কাজ না কওে, তাহলে গোটা বিশ্ব অচল হয়ে যাবে। তাই নারীদের জন্য আলাদা দিবসের দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে একটা দিন স্বীকৃতির জন্য রাখা যেতে পারে। এবারের নারী দিবসে আমরা যদি প্রত্যেক নারীকে তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদও দিই, তাহলে সেটাও হবে বড় পাওয়া।


টিএ

sidebar ad