‘আমি ফাস্ট ফ্যাশনকে ভয় পাই। কেননা ফাস্ট ফ্যাশন ব্যক্তি, সমাজ এবং পরিবেশকে ক্ষতি করে।’ – রোদসীকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলছিলেন ‘সিগনেট’ এর স্বত্বাধিকারী ফারজানা রিপা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাসলিমা আক্তার।
রোদসী: বাংলাদেশের ফ্যাশন শিল্পকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ফারজানা রিপা: ফ্যাশন শিল্পকে কয়েকভাবে আমি মূল্যায়ন করি। প্রথমে বলব,
আমি ফাস্ট ফ্যাশনকে ভয় পাই। বাংলাদেশে যেহেতু ফাস্ট ফ্যাশনের প্রতি একধরনের প্রবণতা
শুরু হয়েছে, মানুষ এখন মানসম্মত পোশাক পরার কথা যতটা না চিন্তা করে, তার চেয়ে বেশি
ভাবে দ্রুত ফ্যাশন পরিবর্তনের কথা। যার কারণে স্বল্পমানের ও স্বল্পমূল্যের পণ্য বেছে
নেয়। তাদের দ্রুত পোশাক প্রয়োজন হয়। এটা আমার কাছে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সময় মনে হয়।
ফ্যাশন আমরা করব, অবশ্যই করব। তার সঙ্গে আমাদের অবশ্যই স্লো ফ্যাশন ও সাসটেইনেবিলিটির
দিকে সচেতন থাকতে হবে। যেটা আমাদের জন্য শারীরিকভাবে ক্ষতিকর, সে ধরনের পোশাক আমরা
যতই কিনি না কেন, সেটা পরিবেশের জন্যও ভালো নয়, তেমনি নিজের শরীরের জন্যও ভালো নয়।
সাসটেইনেবল ফ্যাশনে একটু বেশি মূল্য দিয়ে পণ্য কিনলেও সেটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার
করা যায় এবং সংগ্রহে রাখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই এটি সমাজ ও পরিবেশকে ক্ষতির হাত থেকে
রক্ষা করতে পারে।
রোদসী: সিগনেট প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প কী?
ফারজানা রিপা: সিগনেটের পেছনের গল্প বলতে গেলে আমাকে আসলে ছোটবেলার গল্প
থেকেই শুরু করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই আমি রং, ক্লে ও মাটি নিয়ে খেলতে ভালোবাসতাম। এই
যে তিনটি রং যে এতো বৈচিত্র এনে দিতে পারে এটা আমাকে খুব অবাক করত। আমি ক্লে দিয়ে নানান
ধরনের পুতুল তৈরি করতাম। এটাই ছিল আমার খেলার আসবাবপত্র, খেলার সরঞ্জাম। সেভাবেই আমার
বেড়ে ওঠা, শিল্পী হয়ে ওঠা এবং চারুকলায় পড়াশোনা। একসময় আড়ংয়ে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছি।
পরে দেশের বাইরে চলে গিয়েছি। পরবর্তীতে মনে হলো, আমি উদ্যোক্তা হব। দেশের পণ্যকে দেশের
বাইরে তুলে ধরব। সেভাবেই সিগনেটের ভাবনা শুরু হয়।
২০১৫ সালে আমি ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করি। আমাকে সহযোগিতা করেছিল
আমার ছয় বোন। সাতজন নারী উদ্যোক্তা মিলে এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু হয়। সিগনেট মনে করে,
শুধু মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসা নয়; ব্যবসার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহত্তর সমাজের জন্য কল্যাণকর
কাজ করা। শুরুতে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। ব্যবসা শুরু করতে গেলে আর্থিক
বিষয়টি বড় একটি চিন্তার বিষয় থাকে। আমরা কীভাবে বিনিয়োগ করব, কত টাকা বিনিয়োগ করব,
কীভাবে শুরু করব—এসব ভাবনা থেকেই সাতজন নারী মিলে ব্যবসাটি
শুরু করি।
রোদসী: শুরুতে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
ফারজানা রিপা: ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। চ্যালেঞ্জ ছিল—কী বিষয়ে ব্যবসা
শুরু করব। কারণ একজন ডিজাইনার সব সময় একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করতে চান, যেন তাঁকে
সবার থেকে আলাদা করা যায়। এটাই আমার চ্যালেঞ্জ ছিল। আমার প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডকে
যেন আলাদাভাবে বোঝা যায়—সিগনেট যে ফারজানা রিপার প্রতিষ্ঠান, সেটি
যেন মানুষ বুঝতে পারে।
আর্থিক সহায়তা আমি পরিবার থেকে পেয়েছি। সুতরাং আর্থিক চ্যালেঞ্জ যতটা না
মোকাবিলা করতে হয়েছে, তার চেয়ে বড় বিষয় ছিল কাজটাকে কতটা নান্দনিক করা যায়।
রোদসী: আপনার প্রতিষ্ঠানের
বিশেষত্ব কী, যা অন্যদের থেকে আলাদা করে?
ফারজানা রিপা: ফ্যাশন হচ্ছে মানুষের
রুচিবোধ, রঙের প্রতি অনুভূতি এবং শিল্পমতি। আমরা যেটা করি, আমাদের পোশাকের নকশা থেকে
শুরু করে নির্মাণ—অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত—সৃজনশীলতা ধরে রাখার
চেষ্টা করি। এটাই আমাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যেটার মাধ্যমে আমাদের কাজ অন্যদের থেকে
ভিন্ন হয়ে ওঠে।
রোদসী: নতুন ডিজাইন তৈরির ক্ষেত্রে আপনার অনুপ্রেরণার উৎস কী?
ফারজানা রিপা: ডিজাইন তৈরির ক্ষেত্রে আমার অনুপ্রেরণার উৎস হচ্ছে দেশীয়
পণ্য। আমি সাধারণত দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করি। আমাদের কালেকশনে বেশি থাকে খাদি, প্রাকৃতিক
সিল্ক এবং প্রকৃতির রং। এগুলোই আমাদের প্রধান বৈচিত্র্য। একেবারে হাতের এমব্রয়ডারি
ও নকশাকে আমরা প্রাধান্য দিই। এটি আমাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
নতুন ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমি সব সময় ফিউশন ও আধুনিক ধারাকে বজায় রেখে মানুষের চিন্তাধারা ও রুচি অনুযায়ী আমার যে শিল্পবোধ, সেটি প্রকাশ করতে ভালোবাসি।
রোদসী: গ্রাহকদের চাহিদা কীভাবে বিশ্লেষণ করেন?
ফারজানা রিপা: বিশ্লেষণ করাটা আমার জন্য একটু কঠিন হয়ে যায়। আমি বরাবরই
স্লো ফ্যাশন নিয়ে কাজ করি। আমি কাজের ব্যাপারে যত্নশীল। আমি সময় নিয়ে কাজ করি। সে কারণে
অনেক সময় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পুরোপুরি পণ্য বাজারে আনতে পারি না। কারণ আমি স্লো
ফ্যাশন নিয়ে কাজ করি, যত্ন নিয়ে কাজ করি। তবে আমি চেষ্টা করি আমার ক্লায়েন্টরা কী ধরনের
কাজ চান, কী কাজ পছন্দ করেন, তা বুঝতে।
আমি সুতি কালেকশন নিয়ে কাজ করি। আমার পণ্য কর্মজীবী নারীদের জন্য বেশি ব্যবহারযোগ্য। আমি তাঁদের নিয়েই বেশি কাজ করি।
রোদসী: অনলাইন ব্যবসায় কীভাবে এলেন?
ফারজানা রিপা: অনলাইন ব্যবসায় আমি শুরুতে ছিলাম না। কিন্তু করোনার কারণে
আমার অনেক আউটলেট বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এর পর আমি অনলাইন ব্যবসায় আসি। আমি মনে করি,
এটা একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে সরাসরি আমি আমার ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি।
আমার মনে হয়, প্রতিদিন আমার আউটলেটে যাওয়া সম্ভব হতো না। কিন্তু অনলাইনে
আমি যেকোনো সময় গাড়িতে কোথাও যাচ্ছি বা বাসায় বসে আছি—তখন চট করে দেখে
নিতে পারি এবং আমার কাস্টমারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। অনলাইনে আমি বেশ ভালো সাড়া
পেয়েছি এবং এখন পর্যন্ত সিগনেট নিয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। আমরা ক্রেতার চাহিদা মিটিয়ে
মানসম্মত পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করি।
রোদসী: টেকসই ফ্যাশন নিয়ে আপনার প্রতিষ্ঠানের কোনো উদ্যোগ আছে?
ফারজানা রিপা: টেকসই ফ্যাশনই হচ্ছে সাসটেইনেবল ফ্যাশন এবং স্লো ফ্যাশন।
আমি টেকসই ফ্যাশন নিয়ে কাজ করি। এটাই আমার উদ্যোগ, এটাই আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ।
আমি মনে করি, স্লো ফ্যাশন আমাদের দেশের মানুষ, সমাজ ও পরিবেশকে রক্ষা করবে।
রোদসী: আগামী পাঁচ বছরে সিগনেটকে কোথায় দেখতে চান?
ফারজানা রিপা: আগামী পাঁচ বছরে আমি সিগনেটকে অনেক দূর দেখতে চাই। এটা কঠিন
একটি স্বপ্ন। করোনার কারণে আমার যে আউটলেটগুলো বন্ধ করেছি, সামনে সেগুলো আবার চালু
করতে চাই। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও কাজ আরও বাড়াতে চাই।
আমি দেশের বাইরে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরে আমাদের পণ্য যাচ্ছে। আমি আরও বেশি করে পুরো বিশ্বে সিগনেটকে ছড়িয়ে দিতে চাই। দেশীয় পণ্যকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই।
রোদসী: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ফারজানা রিপা: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আমার একটি পরামর্শ—কেউ উদ্যোক্তা হতে
চাইলেই যে উদ্যোক্তা হয়ে যাওয়া যায়, তা নয়। একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে, সদিচ্ছা ও সাহস
থাকতে হবে। থাকতে হবে ধৈর্য। ব্যবসায় উত্থান-পতন আছে, অনেক ধরনের ঝড়-ঝাপটা আছে। সবকিছু
মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার যাঁদের মনোবল আছে, তাঁরা উদ্যোক্তা হোন—আমি চাই।
ছোট ছোট উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছেন, কিন্তু তাঁরা খারাপ অভিজ্ঞতা বা মানসিকতার
কারণে পিছিয়ে পড়ছেন—এটা আমার পছন্দ নয়। আমি চাই, একটি কাঠামো
তৈরি করে, প্রস্তুতি নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়া জরুরি।
রোদসী: আপনার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা কী?
ফারজানা রিপা: আমার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা ব্যাপক। আমার সৃষ্টি বা শিল্পকে
আমার ক্লায়েন্ট, দেশের মানুষ এবং দেশের বাইরের মানুষ কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, আমার শিল্পবোধ
তাঁদের কাছে কতটা প্রকাশ পাচ্ছে—এটাই আমার কাছে বিশাল সাফল্য।
মুনাফা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি ব্যবসায় মনোযোগী হই, ধৈর্যশীল হই
এবং কর্মঠ হই, তাহলে মুনাফা আসবেই। আমার ব্র্যান্ডকে মানুষ শিল্পমনস্ক একটি ব্র্যান্ড
হিসেবে মূল্যায়ন করুক, অন্যান্য বড় ব্র্যান্ডের পাশে যেন দাঁড়াতে পারে—এটাই আমার স্বপ্ন।
মানুষ যেন এটিকে সুন্দরভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।
আমি যে শিল্পী ও ফ্যাশন ডিজাইনার—এই দুইয়ের সমন্বয়ে
কাজটি তৈরি করি, সেটি যেন আমার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
রোদসী: যারা সিগনেট ফ্যাশন হাউসের নিয়মিত ও নতুন ক্রেতা, তাঁদের জন্য আপনার
বার্তা কী?
ফারজানা রিপা: সিগনেটের ক্রেতারা প্রত্যেকেই আমার ভীষণ শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁরা
সিগনেটের পাশে আছেন—এটাই আমার সাফল্য। অনেক ক্রেতা নিয়মিত আমাদের
পণ্য কিনছেন, কেউ কেউ একাধিক পণ্যও কিনেছেন।
নতুন ক্রেতাদের বলব, আপনারা টেকসই পণ্য কিনবেন, যা দীর্ঘ সময় ব্যবহার করতে
পারবেন এবং বারবার নতুন কালেকশন তৈরি করার প্রয়োজন হবে না। আমি মনে করি, আপনারা তৃতীয়
বা চতুর্থবারও সিগনেট থেকে পণ্য কিনবেন।
ঢাকা/টিএ