১৯৯৪ সালের ২৯ জুন। সেদিন রাতে ব্রিটেনের আইটিভি (ITV) চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয়েছিল প্রামাণ্যচিত্র “চার্লস: দ্য প্রাইভেট ম্যান, দ্য পাবলিক রোল”। সাংবাদিক জোনাথন ডিম্বলবি-র সঙ্গে করা এই সাক্ষাৎকারে প্রিন্স চার্লস ক্যামিলার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। এই সাক্ষাৎকারটি ছিল রাজপরিবারের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের জন্য অভূতপূর্ব একটি পদক্ষেপ। প্রায় আড়াই ঘণ্টা দীর্ঘ এই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রিটিশ দর্শক দেখেছিলেন। চার্লসের এই স্বীকারোক্তি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।
আর এমন একটি রাত, যখন অসংখ্য ক্যামেরা তাক করে ছিল একজন নারীর দিকে। চাইলেই সেদিন প্রিন্সেস ডায়ানা সকল সমালোচনা এড়াতে ঘরেই থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নেন লন্ডনের বহুল আলোচিত একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
ক্যামেরার সামনে গাড়ি থেকে নামলেন ডায়ানা। আর শুরু হলো ফ্ল্যাশের ঝলকানি।
তাঁকে দেখে যতটা না সবাই অবাক হয়েছিলেন, সবার দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল তাঁর পরনের ছোট, কালো, অফ-শোল্ডার সিল্কের পোশাক দেখে। পরদিন পৃথিবীর সংবাদপত্রে তাঁর ছবি। ফ্যাশন দুনিয়ায় তুমুল আলোচনা। আর সেই কালো পোশাকের নাম হয়ে গেল—‘রিভেঞ্জ ড্রেস’।
তিন দশক পেরিয়ে গেছে। ডায়ানা আমাদের মাঝে নেই, সেই রাতও ইতিহাস। অথচ পোশাকটি এখনো বেঁচে আছে। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা সেই পোশাকটিই আবার নিলামের মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে। কি এই ড্রেসের কাহিনী? আর কেনোই বা এর নাম হয়েছে রিভেঞ্জ ড্রেস, আসুন জেনে নিই আদ্যোপান্ত।
যে রাতে বদলে গেল পোশাকটির গল্প
১৯৯৪ সালের সেই ঐতিহাসিক রাতে একদিকে যেখানে প্রিন্স চার্লস ডায়ানার সঙ্গে সম্পর্কের বাইরে পরকীয়ার কথা স্বীকার করেন, অন্যদিকে ঠিক ওই রাতেই লন্ডনের সার্পেন্টাইন গ্যালারিতে ভ্যানিটি ফেয়ারের একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দেন ডায়ানা। ওই অনুষ্ঠানে ডায়ানার ভ্যালেন্টিনো ব্র্যান্ডের একটি সাধারণ গাউন পরার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত বদল করেন।
ক্রিস্টিনা স্ট্যামবোলিয়ান এর ডিজাইন করা ড্রেসটি ছিল একটি স্ট্র্যাপলেস, অফ-দ্য-শোল্ডার, ফর্ম-ফিটিং কালো সিল্কের পোশাক, যার অসমান হেমলাইন ও শিফন ট্রেন ছিল। শরীরের গড়নকে ফুটিয়ে তোলার মতো কাট এবং তুলনামূলকভাবে সাহসী নেকলাইন ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রিন্সেস ডায়না তাঁর সাজের সঙ্গে কালো হিল জুতো, কালো ক্লাচ ব্যাগ এবং গলায় একটি নজরকাড়া চোকার ব্যবহার করেছিলেন। শোনা যায়, চোকারটি তৈরি করা হয়েছিল হীরা ও নীলকান্তমণি খচিত একটি প্রাচীন ব্রোচ থেকে— যা তাঁকে বিয়ের উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন স্বয়ং ‘কুইন মাদার'।
ডায়ানা পোশাকটি নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন বলেও বিভিন্ন ফ্যাশন-ইতিহাসের বর্ণনায় এসেছে। তিনি তিন বছর আগেই স্ট্যামবোলিয়ানের কাছ থেকে পোশাকটি তৈরি করিয়েছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন সেটি পরেননি। শেষ পর্যন্ত সেই বিশেষ রাতেই এটি বেছে নেন। তাঁর তৎকালীন স্টাইলিস্ট আনা হার্ভির ভাষায়, তিনি ‘মিলিয়ন ডলারের মতো’ দেখতে চেয়েছিলেন।
আর সেই রাতের ছবিগুলো পরবর্তীকালে ফ্যাশন ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় “লিটল ব্ল্যাক ড্রেস” মোমেন্ট হয়ে যায়।
ড্রেসটির নাম কেন ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’?
পোশাকটি পরে পরিচিত হয় ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামে। নামটি শুনলে মনে হতে পারে, ডায়ানা যেন ইচ্ছা করেই প্রতিশোধের ভাষা হিসেবে পোশাকটিকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি কিন্তু মোটেও তা নয়।
ডায়ানা নিজে পোশাকটির এই নাম দেননি। এই পোশাক ব্রিটিশ রাজবধূ হিসেবে বেশ সাহসী! এই ধারণার ভিত্তিতে তিনি পোশাকটি ওয়ার্ডরোবেই রেখে দিয়েছিলেন দীর্ঘদিন। ডায়ানা ও চার্লস আগে থেকেই আলাদা থাকছিলেন। এরই মধ্যে চার্লসের সেই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার এবং সেই রাতে ডায়ানার সার্পেন্টাইন গ্যালারিতে নৈশভোজে যোগ দিতে জনসম্মুখে এই অফ শোল্ডার ড্রেসটি পরে আত্মবিশ্বাসী ও গ্ল্যামারাস উপস্থিতি, সব সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়ে নেয়।
মূলত রাজকীয় প্রোটোকল অনুযায়ী কালো পোশাক সাধারণত শোকের সময় পরা হয়। আর তাছাড়া আজকের ফ্যাশনে এমন স্টাইলের পোশাক খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের রাজপরিবারের প্রেক্ষাপটে ডায়ানার এমন উপস্থিতি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ডায়ানা সেই প্রথা ভেঙে এই আঁটসাঁট কালো পোশাক পরে হাজির হয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীন মানসিকতার প্রকাশ ঘটান। তার রূপ ও আত্মবিশ্বাসী প্রকাশ দেখে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম বুঝতে পেরেছিল যে, ডায়ানা ভেঙে না পড়ে কতটা শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
চার্লসের বিশ্বাসঘাতকতার জবাবে ডায়ানার এই নীরব ও মার্জিত অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদী ফ্যাশন স্টেটমেন্টকে বিশ্ববাসী 'রিভেঞ্জ ড্রেস' বা প্রতিশোধের পোশাক হিসেবে আখ্যা দেয়।
ঘটনাটির পরের দিন থেকেই ডায়ানার এই পোশাকে তাঁর সাহসী অবতার নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা হতে থাকে। ভোগ ম্যাগাজিনের জন্য লিখতে গিয়ে এল পিথার্স পোশাকটিকে "রিভেঞ্জ ড্রেসিং"-এর জনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন । ২০২০ সালে , দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ- এ বেথান হোল্ট ডায়ানা স্পেন্সারের পোশাকটি বেছে নেওয়ার মধ্যে অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া নারীদের নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধে পোশাকটিকে "রিভেঞ্জ ড্রেসিং-এর চূড়ান্ত আধুনিক উদাহরণ" হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন। সেদিন ডায়ানার পোশাক শুধু কালো ছিল না; কালোর মধ্যেই যেন ছিল এক ধরনের দৃশ্যমান আত্মবিশ্বাস।
১৯৯৭—প্রথম নিলামের গল্প
১৯৯৪ সালে যে পোশাকটি একটি আলোচিত রাতের সাক্ষী হয়েছিল, মাত্র তিন বছর পর সেটিই ডায়ানার হাত ধরে পৌঁছে যায় নিলামের মঞ্চে।
১৯৯৭ সালে, মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে, দাতব্য কাজে অর্থ সংগ্রহের জন্য নিজের ৭৯টি পোশাক নিলামে দিয়েছিলেন ডায়ানা। নিউইয়র্কের আয়োজিত সেই বিক্রির উদ্দেশ্য ছিল ক্যানসার ও এইডস-সংক্রান্ত দাতব্য কাজে অর্থ সংগ্রহ করা। সেই নিলামে এই পোশাকটি ৫২ হাজার ৯১৭ ডলারে কিনেছিলেন গ্লাসগোর বাসিন্দা ব্রিগ এবং গ্রেম ম্যাকেঞ্জি। পরবর্তীকালে এটি স্কটল্যান্ডের দাতব্য তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়েছিল। পরে এটি পেইজলি জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়, যেখানে প্রায় ৩০ বছর আগে এটিকে শেষবার জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল।
আবারো নিলামে
প্রায় তিন দশক পর আগামী ৯ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে সোথবি'র নিলামে উঠতে চলেছে প্রিন্সেস ডায়ানার সেই ঐতিহাসিক পোশাকটি। যা সংগ্রাহকদের রাজকীয় ও ফ্যাশন ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত এই নিদর্শনটির মালিক হওয়ার আরেকটি সুযোগ করে দিচ্ছে। গ্রেম ম্যাকেঞ্জির মৃত্যুর পর ব্রিগ পোশাকটি আবার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পোশাটির সঙ্গে থাকবে ১৯৯৭ সালের 'ড্রেসেস ফ্রম দ্য কালেকশন অফ ডায়ানা', 'প্রিন্সেস অফ ওয়েলস' নিলামের ক্যাটালগের একটি নম্বরযুক্ত কপি, যাতে ডায়ানা ও ডিজাইনার ক্রিস্টিনা স্ট্যামবোলিয়ান-এর স্বাক্ষর রয়েছে।
এই পোশাকের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় কয়েক কোটি টাকা। বিক্রয়লব্ধ অর্থের একাংশ রয়্যাল এডিনবরা হাসপাতালের পক্ষ থেকে এনএইচএস লোথিয়ান চ্যারিটিকে দান করা হবে। নিলামের আগে পোশাকটি লন্ডন, হংকং, জেনেভা ও নিউইয়র্কে প্রদর্শিত হবে।
আসল দামটা কি পোশাকের?
তিন দশক পর যখন একটি পোশাকের সম্ভাব্য মূল্য কয়েক লাখ ডলারে পৌঁছে যায়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—একটি পোশাকের দাম এত হতে পারে কেন?
উত্তরটা পোশাকটির কাপড়, সেলাই কিংবা নকশার মধ্যেই আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজপরিবারের এক আলোচিত রাত, সম্পর্কের টানাপোড়েন, গণমাধ্যমের প্রবল নজর এবং নিজের গল্পটি নিজের মতো করে বলার এক নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি।
১৯৯৪ সালে এটি ছিল একটি রাতের পোশাক। ১৯৯৭ সালে এটি হয়ে উঠেছিল দাতব্য নিলামের অংশ। আর ২০২৬ সালে এসে এটি পরিণত হয়েছে ফ্যাশন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক মূল্যবান স্মৃতিচিহ্নে। এই পোশাকটি যেন আমাদের এই কথাই মনে করিয়ে দেয় যে; যখন শব্দ ব্যর্থ হয়, তখন ফ্যাশনই হতে পারে একটি ভাষা।
হয়তো এ কারণেই পোশাটির প্রকৃত মূল্য তার সম্ভাব্য নিলাম দামের চেয়েও বড়। কারণ কিছু পোশাক শুধু পরা হয় না, কিছু পোশাক ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।