একটি শিশু যখন প্রথমবার মঞ্চে ওঠে, তখন সে শুধু নাচ, গান বা আবৃত্তি পরিবেশন করে না সে আসলে নিজের ভয়কে জয় করার একটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। সামনে অসংখ্য মানুষের চোখ, চারপাশে পরিচিত-অপরিচিত মুখ, অথচ সেই ছোট্ট মানুষটিকে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে হয়। এই অভিজ্ঞতা তার আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমাদের সমাজে সন্তানের ভালো ফলাফল, ক্লাসে প্রথম হওয়া কিংবা পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়াকে অনেক বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়।কিন্তু সন্তান মানুষের সামনে কথা বলতে পারে কি না, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে কি না, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে কি না এসব বিষয়ও যে তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ, তা অনেক অভিভাবকই গুরুত্ব দেন না।
শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে যেভাবে:
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিন। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ, গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, খেলাধুলা কিংবা দলীয় কার্যক্রম প্রতিটি অভিজ্ঞতাই শিশুকে নতুন কিছু শেখায়। মঞ্চে দাঁড়ানোর অভ্যাস শিশুর মানুষের সামনে কথা বলার জড়তা কমাতে, নিজের প্রকাশভঙ্গি উন্নত করতে এবং অপরিচিত পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি দলগত কাজে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধও তৈরি হয়।
সন্তানকে উৎসাহ দিন, চাপ দেবেন না:
অনেক অভিভাবক সন্তানের প্রতিভা প্রকাশের নামে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেন। সন্তান নাচতে না চাইলে নাচ শেখানো, গান ভালো না লাগলেও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাধ্য করাই এসব তার মধ্যে উল্টো ভয় ও অনীহা তৈরি করতে পারে। সন্তানের আগ্রহ বুঝুন। তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জানার ও চেষ্টা করার সুযোগ দিন। সে কোন বিষয়ে আনন্দ পায়, কোন কাজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেটিকে গুরুত্ব দিন।
পারফরম্যান্স নয়, সাহসের প্রশংসা করুন:
সন্তান মঞ্চে উঠে ভুল করতেই পারে, সংলাপ ভুলে যেতে পারে, নাচের স্টেপ মিস করতে পারে কিংবা নার্ভাস হয়ে যেতে পারে। এ নিয়ে তাকে সমালোচনা না করে বলুন, তুমি অনেক চেষ্টা করেছ, এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় অর্জন। শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে যেতে একটি নেতিবাচক মন্তব্যই যথেষ্ট হতে পারে। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজের অগ্রগতিকে মূল্যায়ন করুন।
লাজুক সন্তানকে কীভাবে সাহসী করবেন?
প্রথমেই তাকে বড় কোনো মঞ্চে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। পরিবারের সদস্যদের সামনে গল্প বলা, কবিতা আবৃত্তি, নিজের পছন্দের বিষয়ে কথা বলা কিংবা ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করতে দিন। ধীরে ধীরে স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উৎসাহিত করুন।
প্রতিটি ছোট অর্জনে তার পাশে থাকুন।
একটা বিষয় মাথায় রাখবেন
জীবনের মঞ্চ শুধু স্কুলের স্টেজ নয়। ভবিষ্যতে সন্তানকে চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে হবে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে হবে, প্রয়োজনে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।
এসব ক্ষেত্রেই আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। তাই সন্তানের জন্য শুধু ভালো স্কুল, ভালো শিক্ষক কিংবা ভালো ফলাফলের ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যেন সে নিজের পরিচয় দিতে ভয় না পায়, নিজের যোগ্যতায় বিশ্বাস রাখতে শেখে এবং ব্যর্থ হলেও আবার চেষ্টা করার সাহস পায়। আপনার সন্তান জীবনের প্রতিটি মঞ্চে সফল হবে কি না, তা কেউ বলতে পারে না।কিন্তু সে যেন ভয় পেয়ে নিজের প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে লুকিয়ে না রাখে, সেই সাহসটুকু তৈরি করে দেওয়াই প্রকৃত প্যারেন্টিং।