সন্তান বেশি সরল হলে বাবা-মাও কী তাকে অবহেলা করেন?

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

অর্থ, যত্ন আর ভালোবাসার অদৃশ্য হিসাব। ছোটবেলায় আমরা শিখি, বাবা-মায়ের ভালোবাসার কোনো হিসাব নেই। সন্তান ধনী হোক বা গরিব, সফল হোক বা ব্যর্থ মায়ের কাছে সন্তান তো সন্তানই। কিন্তু বড় হতে হতে অনেক সন্তান এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যা খুব সহজে বলা যায় না।


যে সন্তান বেশি উপার্জন করে, প্রয়োজনের সময় টাকা দিতে পারে, চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে কিংবা পারিবারিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারে বাবা-মায়ের কাছে তার কথার গুরুত্বও কি কখনো একটু বেড়ে যায়?


আর যে সন্তান খুব বেশি আয় করে না, কিন্তু নিয়মিত খোঁজ নেয়, অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে থাকে, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে দায়িত্ব পালন করে তার অবদান কি অনেক সময় স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে ধরে নেওয়া হয়?


প্রশ্নটা তাই শুধু টাকার নয়


প্রশ্ন হলো সন্তানের আর্থিক সামর্থ্য কি কখনো তার প্রতি বাবা-মায়ের আচরণকে প্রভাবিত করে?


আগেকার পরিবার, এখনকার বাস্তবতা


আগের দিনের যৌথ পরিবারে সন্তান ছিল শুধু ভালোবাসার মানুষ নয়, বৃদ্ধ বয়সের ভরসাও। পরিবারে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করত সন্তানদের ওপর।


এখন বাস্তবতা বদলেছে


এক সন্তান ঢাকায়, আরেকজন বিদেশে। একজন বড় চাকরি করে, অন্যজন ছোট ব্যবসা বা সীমিত আয়ের কাজে যুক্ত। কারও হাতে অর্থ আছে, কারও হাতে সময়। ফলে বাবা-মায়ের প্রয়োজনের সময় কে কী দিতে পারছে, সেটি খুব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যে সন্তান টাকা পাঠায়, তাকে নিয়ে হয়তো বেশি আলোচনা হয়। তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।


অন্যদিকে কম উপার্জন করা সন্তানটি মনে মনে প্রশ্ন করতে পারে,“আমার টাকা কম, তাই কি আমার গুরুত্বও কম?”অবশ্যই প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন হয় না। অনেক বাবা-মা আর্থিক সক্ষমতা নয়, সন্তানের ব্যবহার, দায়িত্ববোধ ও উপস্থিতিকে মূল্য দেন।কিন্তু যেখানে অর্থ ধীরে ধীরে ভালোবাসা ও মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে ওঠে, সেখানেই সমস্যা তৈরি হয়। সন্তান বেশি সরল, তার কষ্টটাই অনেক সময় অদৃশ্য।পরিবারে এমন সন্তানও থাকে যে নিজের দাবি খুব বেশি জানায় না। বাবা-মায়ের কাছে টাকা চাইতে সংকোচ করে। নিজের সমস্যার কথা চেপে রাখে।


প্রয়োজন হলে ছুটে আসে। ভাইবোনের বিপদে নিজের সামান্য সঞ্চয়টুকুও দিয়ে দেয়। কিন্তু সে যেহেতু প্রতিবাদ করে না, পরিবার অনেক সময় ধরে নেয়, “ও তো বুঝবে।” এখানেই বিপদ।


যে মানুষটি বারবার ছাড় দেয়, তার ছাড়কে একসময় অন্যরা অধিকার বলে ভাবতে শুরু করতে পারে। ফলে সন্তানটি বাইরে থেকে শান্ত থাকলেও ভেতরে জমতে থাকে অভিমান। সে হয়তো বাবা-মাকে ভালোবাসা বন্ধ করে না, শুধু নিজের কষ্টের কথা বলা বন্ধ করে দেয়।


ভালোবাসা আর নির্ভরশীলতা এক নয়


বৃদ্ধ বাবা-মা যে সন্তানের ওপর আর্থিকভাবে বেশি নির্ভর করবেন, এটি স্বাভাবিক। যে সন্তান চিকিৎসার খরচ দিতে পারে, নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারে কিংবা পাশে থেকে দায়িত্ব নিতে পারে, তার ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই, যখন এই নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে ভালোবাসার মাপকাঠি হয়ে যায়।


“ও টাকা দেয়, তাই ও ভালো সন্তান।”


“ও কিছু দিতে পারে না, তাই ওর কথার মূল্য কম।”


তখন সন্তান আর শুধু সন্তান থাকে না,সে হয়ে ওঠে পরিবারের একটি আর্থিক নিরাপত্তার উৎস।


আর ভালোবাসার জায়গায় ঢুকে পড়ে উপযোগিতার হিসাব।


সম্পত্তি বণ্টনের সময় পুরোনো অভিমান সামনে আসে, ভাইবোনের মধ্যে বড় দ্বন্দ্ব অনেক সময় সম্পত্তি দিয়ে শুরু হয় না।

তার আগে হয়তো বহু বছর ধরে চলে তুলনা,

“ওকে বেশি দেওয়া হলো।”

“ওর ভুল ক্ষমা করা হলো।”

“ওর কথা বেশি শোনা হয়।”

“আমি এত কিছু করলাম, কিন্তু আমার মূল্য কোথায়?”


সম্পত্তি তখন শুধু সম্পত্তি থাকে না। এটি হয়ে ওঠে বহু বছরের জমে থাকা অভিমানের প্রকাশ।


গবেষণাতেও দেখা যায়, সন্তানরা বাবা-মায়ের আচরণকে পক্ষপাতদুষ্ট বা অন্যায্য মনে করলে তা ভাইবোনের সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


তবে সব অসম বণ্টনই পক্ষপাত নয়। কোনো সন্তানের প্রয়োজন বেশি হতে পারে, কেউ বাবা-মায়ের দেখাশোনায় বেশি যুক্ত হতে পারে।


ন্যায্যতা সবসময় সমান পরিমাণ দেওয়ার অর্থ নয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি ও স্বচ্ছতা না থাকলে সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক।


পক্ষপাত শুধু অবহেলিত সন্তানকেই আঘাত করে না


যে সন্তান বেশি গুরুত্ব পায়, সেও সবসময় স্বস্তিতে থাকে না। তার ওপর হয়তো বাবা-মায়ের প্রত্যাশা বেশি থাকে।


“তুমিই তো আমাদের দেখবে।”


“তোমার ওপরই ভরসা।”


ফলে একদিকে সে বাড়তি সুবিধা পায়, অন্যদিকে বাড়তি দায়িত্বও বহন করে।



ভাইবোনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে তারাও একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। অর্থাৎ পক্ষপাত কোনো একজনকে এগিয়ে দিয়ে পুরো পরিবারকে সুখী করে না,বরং সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি করতে পারে।


সন্তানের সবচেয়ে চাপা কষ্ট


সব সন্তান প্রতিবাদ করে না।কেউ চুপ হয়ে যায়। কেউ ফোন করা কমিয়ে দেয়।কেউ নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আর বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাগ করে না। বাইরে থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক দেখায়, কিন্তু ভেতরে তৈরি হয় একটি দূরত্ব।



সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সন্তানটি হয়তো ভালোবাসা হারায়নি, শুধু প্রত্যাশা হারিয়েছে। সে আর ভাবে না, “বাবা-মা আমাকে বুঝবেন।” সে শুধু ভাবে, “আমার নিজের মতোই আমাকে চলতে হবে।” এই মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেলে পরে শুধু টাকা বা সম্পত্তি দিয়ে সম্পর্ক আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা কঠিন।


আজকের প্রজন্ম এই বিষয়টি বেশি প্রশ্ন করছে


আগের প্রজন্মের অনেক সন্তান পারিবারিক বৈষম্য মেনে নিয়েছে, কারণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক বিকল্প তুলনামূলকভাবে কম ছিল।



এখন সন্তানরা অন্য শহরে থাকতে পারে, বিদেশে যেতে পারে, নিজের আয় করতে পারে, আলাদা সংসার করতে পারে।


তাই তারা শুধু ভালোবাসা নয়, সম্মান, ন্যায্যতা ও ব্যক্তিগত সীমারেখাকেও সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখতে চায়।


এটি বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা কমে যাওয়ার লক্ষণ নয়।

বরং সম্পর্কটিকে নতুনভাবে বোঝার একটি পরিবর্তন।



তাহলে সমাধান কোথায়?

সমাধান হলো সব সন্তানকে একই পরিমাণ টাকা দেওয়া নয়।

সমাধান হলো সব সন্তানকে সমান মর্যাদা দেওয়া।


কোনো সন্তানকে বেশি সাহায্য করার প্রয়োজন হলে তা করা যেতেই পারে। কিন্তু অন্য সন্তানকে যেন বোঝানো না হয় যে তার মূল্য কম।


তুলনা না করা।

এক সন্তানের সাফল্য দিয়ে অন্য সন্তানকে ছোট না করা।


সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব পরিষ্কার থাকা।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্তানের অর্থনৈতিক অবস্থাকে তার ভালোবাসার মাপকাঠি না বানানো।


কারণ একজন সন্তানের কাছে হয়তো টাকা আছে।

অন্যজনের কাছে আছে সময়।


কেউ চিকিৎসার বিল দেয়।

কেউ হাসপাতালের বিছানার পাশে রাত কাটায়।

কেউ দূরদেশ থেকে টাকা পাঠায়।

কেউ প্রতিদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করে

“মা, ওষুধ খেয়েছ?”

সবকিছুর মূল্য টাকায় মাপা যায় না।



সন্তান শেষ পর্যন্ত কী মনে রাখে?

একজন সন্তান হয়তো ভুলে যাবে, বাবা তাকে কোন বছরে কত টাকা দিয়েছিলেন।

কিন্তু সে সহজে ভুলবে না,

ব্যর্থ হওয়ার পর তাকে কীভাবে দেখা হয়েছিল।

ভাইবোনের সঙ্গে তাকে কতবার তুলনা করা হয়েছিল।


তার আয় কম বলে তার মতামতকে কতবার গুরুত্বহীন করা হয়েছিল।

আর সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে। 


তার বাবা-মায়ের কাছে সে কি শুধু প্রয়োজনের সময়ের মানুষ ছিল, নাকি প্রয়োজনের বাইরেও একজন প্রিয় সন্তান ছিল।


বাবা-মায়ের সম্পদ একদিন ভাগ হয়ে যায়।

কিন্তু সন্তানদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভালোবাসা কিংবা দূরত্ব তার প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী।



তাই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো জমি, বাড়ি বা ব্যাংক ব্যালান্স নয়।


বরং এই নিশ্চয়তাটুকু

“তোমার আয় কম হতে পারে, সাফল্য অন্যরকম হতে পারে, জীবন তোমার নিজের পথে চলতে পারে কিন্তু আমার সন্তান হিসেবে তোমার মূল্য কখনো কমবে না।”


কারণ পরিবারে সবচেয়ে ভয়ংকর বৈষম্য সবসময় সম্পত্তিতে হয় না।


কখনো কখনো বৈষম্যটা হয়,

কার কষ্টকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিলাম, আর কার কষ্টকে স্বাভাবিক ধরে নিলাম।

sidebar ad