লবণাক্ততার নীরব আঘাতে বিপন্ন উপকূলের নারী, বাড়ছে স্বাস্থ্য ও প্রজননঝুঁকি


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনজীবনে সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যে। তবে এই সংকটের সবচেয়ে কঠিন বোঝাগুলোর একটি বহন করছেন নারীরা। নিরাপদ খাবার পানির অভাব, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকট এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা তাঁদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন তাই উপকূলের নারীদের কাছে শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি হয়ে উঠছে দৈনন্দিন স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপদ জীবনের লড়াই।


সকালে ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজ শুরু করার আগেই উপকূলের অনেক নারীকে ভাবতে হয়, সারা দিনের নিরাপদ পানি কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন। কোথাও মিঠাপানির উৎস দূরে, কোথাও পুকুরের পানি লবণাক্ত, আবার কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে খাবার পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া ও দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা—প্রতিটি কাজেই তাঁদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা তাঁদের এই সংকটকে আরও তীব্র করছে।


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলীয় এলাকার নারীদের বাস্তবতা এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। এসব এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট ও নারীর স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ। ‘জেন্ডারড ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অন হেলথ ইন কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়। গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর।


গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ নিরাপদ মিঠাপানির সংকট তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ। আর এই পানির অনিরাপত্তা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার অসম অনুপাতে বড় অংশের চাপ পড়ছে নারীদের ওপর। বিশেষ করে নারীদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়টি গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।


লবণাক্ততা ও পানির সংকটে নারীর বাড়তি বোঝা


জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় মিঠাপানির উৎস সংকুচিত হলে তার প্রভাব শুধু খাবার পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংকটও তৈরি হয়। এর ফলে নারীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।


পরিবারে পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের ওপর বর্তায়। দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, তা সংরক্ষণ এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বণ্টন করতে গিয়ে তাঁদের সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। এই বাড়তি দায়িত্বের কারণে শিক্ষা, আয়মূলক কাজ, বিশ্রাম কিংবা ব্যক্তিগত যত্নের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।


বিশেষ করে কিশোরী, গর্ভবতী নারী, সন্তান জন্মদানের বয়সী নারী এবং বয়স্ক নারীরা পানির সংকটের কারণে ভিন্ন ভিন্ন স্বাস্থ্য ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন। মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, গর্ভাবস্থায় ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং সন্তান জন্মের পর প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ক্ষেত্রেও নিরাপদ পানির গুরুত্ব অপরিসীম।


যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যে বাড়ছে উদ্বেগ


গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুসন্ধান। সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ফসলের ক্ষতি কিংবা বাস্তুচ্যুতির বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এর সঙ্গে নারীর শরীর, স্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকার কীভাবে সম্পর্কিত, তা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।


অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় লবণাক্ততার কারণে সৃষ্ট পানির অনিরাপত্তাকে স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব নারীদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা।


নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্যশিক্ষা, গোপনীয়তা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবার সুযোগ। উপকূলীয় এলাকায় এসব সুবিধার ঘাটতি থাকলে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।


বিশেষ করে প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে অনেক নারী সামাজিক সংকোচ, সচেতনতার অভাব কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে সময়মতো সেবা নিতে পারেন না। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসমস্যাও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।


গবেষণায় কীভাবে উঠে এসেছে নারীদের সংকট


অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে মিশ্র পদ্ধতিতে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া এলাকার ৮৭১টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।


নারী, পুরুষ, কিশোরী এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৮টি দলীয় আলোচনা। এ ছাড়া রয়েছে নয়টি বিস্তারিত কেস স্টাডি। গবেষণায় ১৯৫০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকি বোঝার জন্য আইপিসিসির কাঠামো অনুসরণ করে পরিবারভিত্তিক ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স বা জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা সূচক তৈরি করা হয়। জলবায়ু ঝুঁকি, মিঠাপানির অনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সমস্যা ও নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের মধ্যকার সম্পর্ক বুঝতে বহুচলকভিত্তিক রিগ্রেশন বিশ্লেষণও করা হয়েছে।


গবেষণার সামগ্রিক ফলাফল বলছে, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ উপকূলীয় অঞ্চলে পানির অনিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই পানির সংকট স্বাস্থ্যগত সমস্যার অন্যতম প্রধান পথ তৈরি করছে, যার প্রভাব নারীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নারী ও পুরুষের জীবনে সমানভাবে পড়ছে না।


স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও বড় চ্যালেঞ্জ


উপকূলীয় নারীদের সংকট শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজনের সময় উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াও তাঁদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব, যাতায়াতের অসুবিধা, চিকিৎসাসেবার সীমিত সুযোগ এবং বিশেষায়িত প্রজননস্বাস্থ্যসেবার অভাব নারীদের চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।


জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় এই সংকট আরও তীব্র হয়। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হলে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার স্বাভাবিক সরবরাহও বিঘ্নিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে জরুরি।


এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় নারীর প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। শুধু বাঁধ নির্মাণ কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামো তৈরি করলেই নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর হবে না। তাঁদের নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।


সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ


অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল পানিব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ মিঠাপানির ব্যবস্থা শুধু খাবার পানির জন্য নয়, স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন মেটানোর জন্যও নিশ্চিত করতে হবে।


একই সঙ্গে প্রয়োজন সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম। প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান, স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন, পানির নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নকে আলাদা আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে সমন্বিত নীতিগত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।


স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলো নারীরা সরাসরি মোকাবিলা করেন। তাই তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে বিবেচনায় না নিয়ে কোনো অভিযোজন পরিকল্পনা কার্যকর করা কঠিন।


জলবায়ু সংকটে নারীর স্বাস্থ্যকে দিতে হবে অগ্রাধিকার


জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; উপকূলের মানুষের জীবনে এর প্রভাব প্রতিদিন দৃশ্যমান। তবে একই দুর্যোগ নারী ও পুরুষের জীবনে ভিন্ন ধরনের সংকট তৈরি করে। বিশেষ করে নিরাপদ পানি সংগ্রহ, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।


অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণাটি মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি, ফসল কিংবা অবকাঠামোর হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এর প্রভাব বুঝতে হলে দেখতে হবে নারীর শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে, তাঁদের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা কতটা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ কতটা সীমিত হচ্ছে।


উপকূলের নারীদের জন্য নিরাপদ মিঠাপানি নিশ্চিত করা তাই কেবল পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠারও প্রশ্ন। জলবায়ু অভিযোজনের প্রতিটি পরিকল্পনায় নারীর স্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে না পারলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও অবকাঠামোর পাশাপাশি নারীর নিরাপদ পানি, সুস্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

sidebar ad