বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মেয়েদের সংখ্যা উদ্বেগজনক


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মেয়েদের সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় পাঁচজন মেয়ের মধ্যে দুজন পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। তাদের বড় একটি অংশ আর শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে আসে না। কেন মেয়েরা স্কুল ছাড়ে, আবার পড়াশোনায় ফিরতে চাইলে তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে ব্র্যাকের একটি গবেষণা।


একটি মেয়ের স্কুলে যাওয়া শুধু তার নিজের শিক্ষাজীবনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবন, বিয়ে, পরিবার, সন্তান এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। তাই কোনো মেয়ে মাধ্যমিকের মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যায়।


বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া শিশুদের আবার শিক্ষার আওতায় আনতে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মেয়েদের জন্য এমন সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। ব্র্যাকের গবেষণাটি বলছে, মাধ্যমিকের পর যারা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, তাদের প্রয়োজনও প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের মতো নয়। তাদের বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় আলাদা ধরনের সহায়তা দরকার।


পাঁচ মেয়ের প্রায় দুজন ঝরে পড়ে


গবেষণায় ২০২২ সালের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার পর তাদের বড় অংশ আর শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে আসে না।


কেন এমন হয়? গবেষণাটি দেখেছে, এর পেছনে কোনো একটি কারণ কাজ করে না। ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে শুরু করে পরিবারের মনোভাব, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক মূল্যবোধ এবং স্কুলের পরিবেশ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় ঝরে পড়ার পরিস্থিতি।


পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরের কাজ


মেয়েদের ঝরে পড়ার পেছনে ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। শিক্ষায় দুর্বলতা, পড়াশোনায় সমস্যা, অতিরিক্ত গৃহস্থালি কাজ, পড়াশোনার জন্য সহায়তা না পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকাও এর মধ্যে রয়েছে।


একজন কিশোরীর দিনের বড় একটি অংশ যদি পরিবারের কাজে চলে যায়, তাহলে নিয়মিত পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার পর স্কুলের প্রতি আগ্রহও কমে যায়।


গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, মেয়েদের সামনে অনুপ্রেরণার মতো কোনো ‘রোল মডেল’ না থাকাও তাদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।


পরিবার যখন বিয়েকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে


মেয়েদের শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার চেয়ে বিয়েকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।


একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রয়োজন নেই—এমন ধারণাও রয়েছে কিছু পরিবারের মধ্যে। বিশেষ করে আর্থিক সংকট থাকলে পরিবারের কাছে মেয়ের শিক্ষায় বিনিয়োগের চেয়ে দ্রুত বিয়ে দেওয়াকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে হতে পারে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বাস্তবতা—‘মেয়ে তো অন্যের বাড়ি চলে যাবে’—এমন মানসিকতা। ফলে মেয়ের শিক্ষা পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয় না।


অর্থের সংকট বড় বাধা


পরিবারের আর্থিক অবস্থাও মেয়েদের শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। স্কুলের খরচ, বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত, কোচিং বা গৃহশিক্ষকের ব্যয়—সব মিলিয়ে শিক্ষার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। দরিদ্র পরিবারে এই চাপ আরও বেশি।


গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পরিবার মেয়েদের শিক্ষায় অর্থ ব্যয় করতেও আগ্রহী নয়। ছেলেদের শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় দেখা যায় না।


বিয়ে, নিরাপত্তা ও সামাজিক চাপ


মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার সঙ্গে বাল্যবিবাহের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, অল্প বয়সে বিয়ে, নিরাপত্তা ও চলাচলের সমস্যা, প্রেম বা সম্পর্ককে ঘিরে পারিবারিক চাপ, যৌন হয়রানি বা হয়রানির ভয় এবং ধর্মীয় বাধার মতো বিষয়ও উঠে এসেছে।


বিশেষ করে কিশোরী মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারে উদ্বেগ থাকলে অনেক সময় স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হয়।


অর্থাৎ, একটি মেয়ে স্কুলে যাবে কি না—সেটি শুধু তার নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। পরিবারের ভয়, সামাজিক পরিবেশ এবং চারপাশের নিরাপত্তার পরিস্থিতিও তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।


স্কুলের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ


শুধু পরিবারকে দায়ী করলেই সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। স্কুলের পরিবেশও মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় স্কুলের দূরত্ব ও যাতায়াতের সুবিধা, বিদ্যালয়ের সহজলভ্যতা এবং শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পরিবেশকে ঝরে পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


একটি মেয়ে যদি নিয়মিত ক্লাসে গিয়ে পড়া বুঝতে না পারে, শিক্ষকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পায় বা স্কুলের পরিবেশ তার কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ না হয়, তাহলে ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।


আবার পড়তে চাইলে কী প্রয়োজন?


মাধ্যমিক থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের একটি বড় প্রশ্ন হলো—তারা যদি আবার পড়াশোনায় ফিরতে চায়, তাহলে কীভাবে ফিরবে? গবেষণায় এ জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, বিদ্যালয় এবং নীতিগত—পাঁচটি স্তরে সহায়তার প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।


ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রয়োজন পড়াশোনায় সহায়তা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরিতে সহযোগিতা। পরিবারকে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়াও জরুরি।


সামাজিক পর্যায়ে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। আর স্কুলের ক্ষেত্রে দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বয়স বা পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে পড়া মেয়েরাও আবার পড়াশোনা শুরু করতে পারে।


বিকল্প শিক্ষার সুযোগও দরকার


সব মেয়ে প্রচলিত স্কুলব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারবে—এমন নয়। কারও বয়স বেড়ে গেছে, কারও বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ দীর্ঘদিন পড়াশোনার বাইরে ছিল, আবার কেউ পরিবারের দায়িত্বে আটকে গেছে।


তাই গবেষণায় বিকল্প শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।


এই প্রেক্ষাপটে ব্র্যাকের PASS (Post Primary and Secondary School) Centre উদ্যোগটিও গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে মাধ্যমিক থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের আবার শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।


গবেষকেরা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আর্থিক স্বস্তি, মেয়েদের শিক্ষার প্রতি পরিবারের ইতিবাচক মনোভাব এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ—মেয়েদের আবার পড়াশোনায় ফেরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


৫৭টি সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে মেয়েদের গল্প


গবেষণাটি শুধু পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেনি। বাংলাদেশের তিনটি জেলা—সিলেট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা—থেকে গুণগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।


চা-বাগান এলাকা, আধা-শহুরে ও গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে মাধ্যমিক থেকে ঝরে পড়া মেয়ে ও তাদের অভিভাবকদের ২৪টি গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষক, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, এনজিওকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ২০টি সাক্ষাৎকার এবং চারটি দলীয় আলোচনার আয়োজন করা হয়।


দ্বিতীয় পর্যায়ে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ব্র্যাকের পাইলট কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত মেয়েদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।


সব মিলিয়ে গবেষণায় ৫৭টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।


মেয়েকে স্কুলে রাখার লড়াই শুধু পরিবারের নয়


গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি হলো—মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে শুধু একটি পক্ষের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।


একজন মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারকে পাশে থাকতে হবে। স্কুলকে হতে হবে নিরাপদ ও সহায়ক। সমাজকে মেয়েদের শিক্ষা সম্পর্কে ইতিবাচক হতে হবে। আর রাষ্ট্র ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এমন কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে ঝরে পড়া মেয়েরা আবার শিক্ষায় ফিরতে পারে।


বিশেষ করে দরিদ্র, প্রত্যন্ত বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেয়েদের জন্য আলাদা সহায়তা প্রয়োজন।


কারণ একই ধরনের সুযোগ সবার জন্য সমান ফল তৈরি করে না। যে মেয়েটি প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যায়, যে মেয়েটিকে বাড়ির কাজ করতে হয়, কিংবা যে মেয়েটির পরিবার বিয়েকে শিক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে—তার জন্য শুধু স্কুলের দরজা খোলা থাকাই যথেষ্ট নয়।


একটি মেয়েকে ফিরিয়ে আনা মানে একটি ভবিষ্যৎকে ফিরিয়ে আনা


একটি মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্পের শুরু হয়তো একটি স্কুল থেকে। কিন্তু তার প্রভাব গিয়ে পড়ে তার পুরো জীবনে। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে তার কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারলে সে নিজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।


তাই মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা শুধু শিক্ষার হার বাড়ানোর বিষয় নয়। এটি নারী ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ কমানো, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের সঙ্গেও জড়িত।


বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং যারা ঝরে পড়েছে, তাদের আবার শিক্ষার পথে ফিরিয়ে আনা।


কারণ একটি মেয়ে যখন স্কুল ছেড়ে দেয়, তখন শুধু একটি খাতা বন্ধ হয় না; অনেক সময় তার সামনে থাকা সম্ভাবনার দরজাগুলোও একে একে বন্ধ হতে থাকে।

sidebar ad