রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট মৎস্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ‘জাতীয় রপ্তানিযোগ্য মৎস্যজাতপণ্য, রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট উদ্যোক্তা উন্নয়ন মেলা-২০২৭’ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাছ শুধু বাঙালির খাবারের অংশ নয়, দেশের অর্থনীতি, পুষ্টি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। তবে মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরির সুযোগ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ফিশ ফার্ম ওনার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ফোয়াব) ও নারী কেন্দ্রিক পারিবারিক ম্যাগাজিন রোদসী যৌথভাবে এ মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। মেলায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছেন নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মৎস্যচাষীরা।
এই মেলার আয়োজক প্যানেলে রয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শেফ টনি খান। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন কৃষিবিদ শামিমুল ইসলাম, গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বিএনপি জাতীয় কমিটি। মেলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দূতাবাস। মেলার আহ্বায়ক
সাবিনা ইয়াসমিন, কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা ড, বায়েজিদ মোড়ল। সদস্যরা হলেন— মোল্লা সামছুর
রহমান, রাশিদা খাতুন স্বরলিপি, তুষার জামাল, সাকিফ শামিম, এবং খন্দকার ড. হাবিবুর রহমান।
মেলার আহ্বাবায়ক সাবিনা ইয়াসমীন জানিয়েছেন, ২৮ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৭ রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্ক মাঠে মেলাটি আয়োজনের কথা রয়েছে। এ জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি ও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
যাঁরা উপকৃত হবেন
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা: মৎস্য খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে এ মেলা। বিশেষ করে যেসব নারী ঘরে বসে মাছের আচার, ফিশ নাগেট, ফিশ কাটলেট, সসেজ কিংবা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তৈরি করেন, তাঁরা নিজেদের পণ্য বৃহত্তর বাজারে পরিচিত করার সুযোগ পাবেন। তরুণ উদ্যোক্তারাও নতুন খাদ্যপণ্য উদ্ভাবন, ব্র্যান্ড তৈরি এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের ধারণা পাবেন। মেলায় তাঁদের পণ্য প্রদর্শন ও পরিচিতির জন্য বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষী: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক মৎস্য ও চিংড়িচাষী উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। তাঁদের উৎপাদিত পণ্য জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং নতুন ক্রেতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুধু কাঁচা মাছ বিক্রির পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির মাধ্যমেও তাঁরা বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পেতে পারেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা: মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য মেলাটি ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি সুযোগ হতে পারে। সুপারশপ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবেশক ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নতুন ক্রেতা পাওয়া, পণ্যের চাহিদা বোঝা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।
মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও রপ্তানিকারক: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শুধু কাঁচা বা হিমায়িত মাছ রপ্তানি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য তৈরি। মেলায় দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রপ্তানিকারকেরা নতুন বাজার ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা খুঁজে পেতে পারেন।
ভোক্তা ও খাদ্যপ্রেমী: মেলার সুবিধা পাবেন সাধারণ ভোক্তারাও। মাছ দিয়ে তৈরি নতুন নতুন খাবারের স্বাদ নেওয়া, পণ্য সম্পর্কে জানা এবং সহজে রান্না করা যায় এমন খাদ্যপণ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে কর্মব্যস্ত পরিবারগুলোর জন্য রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট পণ্য হতে পারে সুবিধাজনক বিকল্প।
মাছের পরিচিত খাবারের বাইরে নতুন আয়োজন
মেলায় রেডি-টু-কুক বিভাগে ফিশ ফিঙ্গার, ফিশ সিঙ্গাড়া, ফিশ সমুচা, ফিশ নাগেট, ফিশ কাটলেট, ফিশ সসেজ এবং রান্নার উপযোগী পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত মাছ প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। রেডি-টু-ইট বিভাগে থাকবে মাছের আচার, মাছভিত্তিক স্ন্যাকস, মাছের পেস্ট, মাছের সসসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত খাদ্যপণ্য।
এ ছাড়া পাঙ্গাস, মাগুর, শিং ও তেলাপিয়া মাছ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের স্যুপও মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচলিত রান্নার বাইরে দেশীয় মাছের বহুমুখী ব্যবহার এবং নতুন খাদ্যপণ্য তৈরির সম্ভাবনা দেখানো হবে এসব আয়োজনের মাধ্যমে।
মেলার অংশ হিসেবে মাছ রান্না এবং মূল্য সংযোজিত মৎস্যপণ্য উদ্ভাবন প্রতিযোগিতার প্রস্তাবও রয়েছে। এতে নতুন রেসিপি ও পণ্য উদ্ভাবনে আগ্রহী উদ্যোক্তা, রন্ধনশিল্পী ও খাদ্যপ্রেমীরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
থাকবে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়
তিন দিনের আয়োজনের প্রথম দিন ২৮ জানুয়ারি মেলার উদ্বোধন এবং বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য মৎস্যপণ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় দিন ২৯ জানুয়ারি পণ্য প্রদর্শনী, রান্না ও নতুন পণ্য উদ্ভাবন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সুপারশপ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবেশক ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) বৈঠকের আয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে। তৃতীয় দিন ৩০ জানুয়ারি দেশি-বিদেশি বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা এবং প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে মেলা শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শেফ টনি খানের অংশগ্রহণের পরিকল্পনাও মেলার আকর্ষণ বাড়াবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা। তাঁর মাধ্যমে আধুনিক রান্নার কৌশল, মৎস্যজাত খাদ্যপণ্যের নতুন ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক ফুড কালচার সম্পর্কে ধারণা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আয়োজকদের মতে, মেলার মাধ্যমে দেশের মৎস্য খাতের উৎপাদক, উদ্যোক্তা, প্রক্রিয়াজাতকারী ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন ব্যবসার সুযোগ, উপকূলীয় মৎস্যচাষীদের পণ্যের বাজার এবং মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্যের প্রসার ঘটানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
মেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু মাছের প্রদর্শনী বা বিক্রির আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশীয় মৎস্যসম্পদকে নতুন পণ্যে রূপান্তর, উদ্যোক্তা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।