দাম্পত্যে মিথ্যা অপবাদ নয়, সম্পর্ক না টিকলে বেছে নিন সম্মানজনক বিচ্ছেদ

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে একটি শিশুর সবচেয়ে বড় সংকট শুধু পরিবার ভেঙে যাওয়া নয়, বরং সে যখন অনুভব করে, তার পৃথিবীর সবচেয়ে আপন দুজন মানুষই পরস্পরের প্রতিপক্ষ। একটি দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে সব সময় তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি থাকে না। 


কখনো ভালোবাসার মৃত্যু হয়


কখনো বিশ্বাস হারিয়ে যায়, কখনো দুজন মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে যোজন যোজন দূরে চলে যান। আবার কখনো দুজনের জীবনদর্শন, চাহিদা ও প্রত্যাশা এতটাই আলাদা হয়ে যায় যে একসঙ্গে পথচলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।


প্রশ্ন হলো, এমন একটি সম্পর্ককে শুধু সামাজিক সম্মান রক্ষার জন্য টেনে নেওয়ার প্রয়োজন কতটুকু?বিয়ে কোনো কারাগার নয়, যেখানে অসুখী হয়েও সারাজীবন বন্দি থাকতে হবে। বর্তমানে অনেক দম্পতি পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। 


অর্থাৎ,  একজন আরেকজনকে দোষারোপ না করে, কাদা ছোড়াছুড়ি না করে, আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পর্কের ইতি টানছেন। এটি পরকীয়ার বিকল্প কোনো কৌশল নয় বরং যে সম্পর্ক আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, সেটি সম্মানজনকভাবে শেষ করার একটি পথ।


বিচ্ছেদ মানেই কি কেউ অপরাধী?


আমাদের সমাজে বিয়ের সম্পর্ক ভাঙলেই একজনকে অপরাধী বানানোর প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে নারী বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর চরিত্র, অতীত কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রেও নানা অপবাদ ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়।


অথচ একটি বিয়ে না টেকার অর্থ এই নয় যে একজন অবশ্যই ভালো আর অন্যজন খারাপ। সব সম্পর্কের ব্যর্থতার পেছনে পরকীয়া, প্রতারণা কিংবা চরিত্রের সমস্যা থাকে না। দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকতে না চাইলে তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।


একই ছাদের নিচে আলাদা জীবন কি সমাধান?


অনেক দম্পতি সন্তান, সম্পত্তি, আর্থিক অসুবিধা কিংবা সামাজিক পরিস্থিতির কারণে বিচ্ছেদের পরও একই বাড়িতে থাকেন। কেউ আলাদা ঘরে থাকেন, কেউ নিজেদের জীবনযাপন আলাদা করে নেন। তবে মনে রাখতে হবে, বিচ্ছেদ হয়ে গেলে শুধু আলাদা ঘরে থাকলেই আইনি ও বৈবাহিক অবস্থার সব জটিলতা মিটে যায় না। বিশেষ করে ধর্মীয় বিধান, বিবাহবিচ্ছেদের কার্যকারিতা, ইদ্দত, ভরণপোষণ ও সন্তানের দায়িত্বের বিষয়গুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা জরুরি।


নতুন সম্পর্কে যাওয়ার আগে পুরোনো সম্পর্কের সমাপ্তি হোক


কোনো বিবাহিত মানুষ যদি অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হন, কিংবা নতুন করে জীবন শুরু করতে চান, তাহলে গোপন সম্পর্ক, প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে নিজের বর্তমান বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে সৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।


কারণ নিজের সুখ খুঁজতে গিয়ে অন্য একজন মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তা, অপমান ও মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে না।


সন্তান থাকলে দায়িত্ব আরও বেশি


বাবা-মায়ের সম্পর্ক শেষ হতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না। বিচ্ছেদের পরও সন্তানের নিরাপত্তা, শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানকে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, তার সামনে অন্য অভিভাবককে অপমান করা কিংবা তাকে বিচ্ছেদের জন্য দায়ী করা অত্যন্ত ক্ষতিকর।


বিশেষজ্ঞের মতামত: বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হোক ভেবেচিন্তে


ঢাকায় ১৫ জন দম্পতি ও পারিবারিক থেরাপিস্টের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ২০২৫ সালে Journal of Marital and Family Therapy- তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দম্পতির নিজস্ব সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ পরামর্শ এবং সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।গবেষণাটিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, থেরাপিস্টের কাজ দম্পতিকে যেকোনো মূল্যে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করা নয় বরং তাঁদের পরিস্থিতি বুঝে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।


আইনজীবীর পরামর্শ: বিচ্ছেদ শুধু মৌখিক সিদ্ধান্ত নয়, বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন ও বিয়ের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।


মুসলিম পারিবারিক আইনে পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে শুধু আলাদা থাকা বা মৌখিকভাবে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়াই সব ক্ষেত্রে আইনগত বিচ্ছেদ সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ নয়। তাই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, হেফাজত এবং সাক্ষাতের অধিকারসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আইনজীবীর মাধ্যমে পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। 


একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হল,বিয়ে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব দুজনের, কিন্তু বিচ্ছেদের পর সন্তানের প্রতি দায়িত্বও দুজনের। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হতে পারে, বাবা-মায়ের দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না।


শেষ কথা, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা অবশ্যই করা উচিত, যদি সেখানে ভালোবাসা, সম্মান ও পরিবর্তনের আন্তরিক ইচ্ছা থাকে। কিন্তু যেখানে প্রতিনিয়ত অপমান, অবিশ্বাস, মানসিক নির্যাতন কিংবা অনিচ্ছার সহাবস্থান, সেখানে শুধু লোকলজ্জার ভয়ে সম্পর্ক টেনে নেওয়া কোনো মহৎ দায়িত্ব নয়।


মনে রাখতে হবে, বিচ্ছেদ সব সময় পরাজয় নয়। কখনো কখনো এটি দুজন মানুষের জন্যই নতুন করে বাঁচার সুযোগ। কারও ব্যক্তিগত জীবনের বিচারক হওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন, একটি অসুখী সম্পর্ক জোর করে টিকিয়ে রাখার চেয়ে সম্মানের সঙ্গে আলাদা হয়ে যাওয়া কি বেশি মানবিক নয়?

সম্পর্ক শেষ হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি সম্মান যেন শেষ না হয়।


তথ্যসূত্র, উম্মে কাউসার ও স্টিভেন এম. হ্যারিস  ‘বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে বাংলাদেশি দম্পতি-থেরাপিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি, জার্নাল অব ম্যারিটাল অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপি, ২০২৫।

sidebar ad