কথা না বলেও যৌন হয়রানি! কর্মক্ষেত্রে যে আচরণগুলো এড়িয়ে যান অনেকে

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

অক্টোবর ২০১৭, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়েছিল দুটি শব্দ—"মি টু" (Me Too)। মার্কিন প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের বহু অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর, মার্কিন অভিনেত্রী আলিসসা মিলানো টুইটারে যৌন হয়রানির শিকার নারীদের 'মি টু' হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার আহ্বান জানান। অল্প কিছুদিনের মধ্যে হ্যাশট্যাগটি বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। হলিউডের ঝলমলে জগৎ থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মক্ষেত্র—বিভিন্ন জায়গা থেকে নীরবতা ভেঙে নারীরা তাদের হয়রানির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তবে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কিন্তু আরো আগেই, ২০০৬ সালে।


আমেরিকান সামাজিক কর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট তারানা বার্ক (Tarana Burke) যৌন সহিংসতার শিকার প্রান্তিক নারীদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে প্রথম এই ''মি টু'' বাক্যাংশটি ব্যবহার করেছিলেন। যৌন নিপীড়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক ট্যাবু বা নীরবতা ভেঙে ফেলাই ছিল এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। 


এই আন্দোলন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—যৌন হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আর এর বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য ভুক্তভোগীদের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কিন্তু যৌন হয়রানির কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত ভেসে ওঠে অশালীন মন্তব্য, কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শের ছবি। অথচ  কিছু না বলেও এমন কিছু আচরণ আছে, যা পারতপক্ষে আমরা অনেক সময় এড়িয়ে চলি। এই আচরণ কখনো প্রকাশ পায় অস্বস্তিকর দৃষ্টিতে, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গভঙ্গিতে, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে কিংবা ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে -যা যৌন হয়রানির রূপ নিতে পারে। 


ধরুন, একজন নারী সহকর্মী প্রতিদিন অফিসে এসে লক্ষ্য করছেন, তাঁরই এক সহকর্মী বারবার তাঁকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখছেন। কথা বলার সময় অস্বস্তিকরভাবে শরীরের দিকে তাকাচ্ছেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে গা ঘেঁষে যাচ্ছেন। অথচ লোকটি এমন কিছু বলছেন না, যা সরাসরি অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরা যায়। ফলে ওই নারী বুঝতে পারছেন, আচরণগুলো তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলছে, কিন্তু কীভাবে বিষয়টি অন্য কারো কাছে ব্যাখ্যা করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ছেন। 


এই যে কথা ছাড়াই কাউকে অস্বস্তিতে ফেলা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘন করা—এসবই অমৌখিক যৌন হয়রানির আলোচনার অংশ হতে পারে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Non-verbal Sexual Harassment।


মুখে কিছু বলেননি, তাতে কী!


যৌন হয়রানি সব সময় শব্দ দিয়ে প্রকাশ পায় না; কখনো আচরণই হয়ে ওঠে তার ভাষা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক একটি সুপরিচিত কর্মসংস্থান আইন বিষয়ক ল ফার্ম "কিং অ্যান্ড সিগেল এলএলপি" (King & Siegel LLP) ২৫ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে "Common Examples of Non-Verbal Sexual Harassment in the Workplace" শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। সেখানে কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের অমৌখিক হয়রানির কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। কোনো আচরণে অস্বস্তি বোধ করলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সেটি আইনগতভাবে যৌন হয়রানি প্রমাণিত হয় না। আচরণের ধরন, প্রেক্ষাপট, পুনরাবৃত্তি, তীব্রতা এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হয়। 


১. অস্বস্তিকর দৃষ্টি: চোখের ভাষাও যখন সমস্যার কারণ


কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের মধ্যে চোখাচোখি হওয়া বা একে অপরের দিকে স্বাভাবিকভাবে তাকানো কোনটাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যখন এই দেখা বা চোখের ভাষার বদলে যায়, তখন কিন্তু সেটি ভিন্ন অর্থ বহন করে। কখনও কখনও একটি চাহনিই অন্যদের জন্য কর্মক্ষেত্রকে অনিরাপদ করে তোলার জন্য যথেষ্ট। ইংরেজিতে এ ধরনের আচরণকে elevator eyes বলা হয়। কাউকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা বা এক কথায় আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখা, যা ভুক্তভোগীর মনে চরম অস্বস্তি ও হীনম্মন্যতা তৈরি করে। 


এখন প্রশ্ন হতে পারে, একটি দৃষ্টি থেকেই কি কারো উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়? ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো দিকে একবার নজর যাওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু দৃষ্টি যদি ধারাবাহিকভাবে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ হয়, অন্য ব্যক্তির আপত্তি উপেক্ষা করে চলতে থাকে এবং তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।


২. অশালীন যৌন ইঙ্গিত ও অঙ্গভঙ্গি


অশালীন যৌন ইঙ্গিত ও আপত্তিকর শারীরিক অঙ্গভঙ্গি (Graphic or Lewd Gestures) হলো অ-বাচনিক যৌন হয়রানির এমন এক চরম রূপ, যেখানে কোনো কথা না বলে কেবল হাত, মুখ বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের মাধ্যমে যৌন উদ্দীপক ভঙ্গি করা, নিজের বা অন্যের সংবেদনশীল অংশের দিকে ইঙ্গিত করার মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন উদ্দীপক ভাব প্রকাশ করা হয়। কর্মক্ষেত্রে বা জনসমক্ষে এই ধরণের আচরণ শুধু শিষ্টাচার বহির্ভূতই নয়, বরং এটি প্রচলিত আইন অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।


এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির অর্থ এক নয়। বন্ধুত্বপূর্ণ চোখ টেপা, সাধারণ হাসি কিংবা নিরীহ অঙ্গভঙ্গিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়রানি বলা যায় না। কিন্তু কারও প্রতি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করা হলে এবং তা তাঁকে অপমানিত, বিব্রত বা অনিরাপদ বোধ করালে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। 


এ ধরনের আচরণ অনেক সময় "আই এম জাস্ট জোকিং" বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সবসময় কোনো আচরণকে মজা বলে দাবি করলেই সেটি গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে অফিসের মতো পেশাদার পরিবেশে এ ধরনের আচরণ সহকর্মীর প্রতি অসম্মান প্রকাশ করতে পারে এবং কখনো যৌন হয়রানির অভিযোগের ভিত্তিও হতে পারে। 


৩. অনাকাঙ্ক্ষিত উপহার


সৌজন্যের আড়ালেও কি হয়রানি হতে পারে? এই পর্যায়ে এসে মনে এই প্রশ্নটা আসাটাই স্বাভাবিক। কারন উপহার দেওয়া সাধারণত সৌজন্য, বন্ধুত্ব কিংবা ভালো লাগা প্রকাশের একটি উপায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে উপহারের ধরন, প্রেক্ষাপট ও দেওয়ার পদ্ধতি কখনো কখনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।


কোনো কর্মী বা সুপারভাইজার কর্তৃক অন্য কর্মীকে তার অমতে কোনো সংবেদনশীল বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপহার (যেমন অন্তর্বাস, কনডম, যৌন খেলনা বা ফুল) দেওয়া। এমনকি কোনো বিশেষ জেন্ডারকে হেয় করার জন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সামগ্রী (যেমন না চাইতেই স্যানিটারি প্যাড) উপহার দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।


আবার একইভাবে, কোনো নারী সহকর্মীকে ফুল দেওয়া বা জন্মদিনে উপহার দেওয়া নিজে থেকেই যৌন হয়রানি নয়। কিন্তু কাউকে উপহার দেওয়ার পর তিনি তা গ্রহণ না করলে সেটিকে সম্মান করা উচিত। উপহার গ্রহণ না করার কারণে তাঁকে চাপ দেওয়া, অপমান করা বা প্রতিশোধমূলক আচরণ করা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে এবং সেটি তখন আর নিছক সৌজন্যের পর্যায়ে থাকে না।



৪. ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ


প্রত্যেক মানুষেরই কাজের জায়গায় বা সমাজে একটি নিজস্ব "কমফোর্ট জোন" বা ব্যক্তিগত সীমানা থাকে। কোনো যৌক্তিক কারণ বা সম্মতি ছাড়া কেউ এই সীমানায় প্রবেশ করলে তা ভুক্তভোগীকে চরমভাবে অস্বস্তিকর, অনিরাপদ ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।


কর্মক্ষেত্রে কোনো প্রয়োজন বা কারণ ছাড়াই কারও খুব গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, কথা বলার সময় মুখের খুব কাছে চলে আসা কিংবা বসার জায়গায় গা ঘেঁষে বসা। আবার করিডোর, লিফট, কিউবিকল বা ডেস্কে কাউকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করা বা পথ আগলে দাঁড়ানো যাতে সে সহজে সেখান থেকে বের হতে না পারে। এই ধরনের আচরণ সেই ব্যক্তির মধ্যে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। 


নিবন্ধে এ ধরনের আচরণের পাশাপাশি অনুসরণ করা বা স্টকিং (stalking)-এর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অফিসে বা অফিসের বাইরে কারও অলক্ষ্যে বা প্রকাশ্যে তাকে বারবার অনুসরণ করা বা তার গতিবিধির ওপর নজর রাখা। কর্মক্ষেত্রের বাইরে বা ছুটির দিনে কোনো সহকর্মীর ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের (যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) প্রোফাইলে অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারি করা, সব পোস্টে রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট করা বা গভীর রাতে ব্যক্তিগত মেসেজ পাঠানো- এ সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। 


এখানে সমস্যা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত মনোযোগ নয়; বরং অন্য ব্যক্তির সীমারেখাকে অগ্রাহ্য করা। তবে কারও প্রকাশ্য পোস্ট দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত থাকা নিজে থেকেই হয়রানি নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের ধারাবাহিকতা, নজরদারি, ভীতি সৃষ্টি কিংবা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত কি না, তা বিবেচ্য। 


৫. সম্মতি ছাড়া স্পর্শ করা


কোনো কর্মচারীর উপর যৌন কার্যকলাপ চাপিয়ে দেওয়া শুধু যৌন হয়রানিই নয়, এটি একটি ফৌজদারি অপরাধও বটে। এছাড়াও স্পর্শের এমন কিছু ধরন আছে যা হয়তো ফৌজদারি বা যৌন প্রকৃতির নয়, কিন্তু হয়রানি-বিরোধী আইন অনুযায়ী সেগুলোও সমানভাবে বেআইনি। আপনার অনুমতি ছাড়া কেউ আপনার কাঁধে চাপড় দিলে, আপনার পোশাক ধরে টানলে, বা তার শরীরের কোনো অংশ দিয়ে আপনার শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ করলে, তা যৌন হয়রানির আওতায় পড়তে পারে। আপনার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য দুর্ঘটনাবশত ধাক্কা লাগা বা শরীরের কোনো অ-ঘনিষ্ঠ অংশে হালকা টোকা দেওয়া হয়তো হয়রানি নয়, কিন্তু আপনি যদি কর্মক্ষেত্রে কাউকে স্পর্শ করা বন্ধ করতে বলেন এবং সেই আচরণ চলতে থাকে, তবে তা সাধারণত একটি শাস্তিযোগ্য লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। 


৬. অশালীন হাতের ইশারা ও শরীরী ভাষা


যৌন হয়রানির আরেকটি রূপ হলো এমন হাতের ইশারা বা শরীরী ভাষা, যার মাধ্যমে অশালীন যৌন অর্থ প্রকাশ করা হয়। কোনো সহকর্মীর সামনে যৌনক্রিয়ার অনুকরণ করা, অশালীন ইঙ্গিত করা কিংবা শরীরের নড়াচড়ার মাধ্যমে যৌন মন্তব্যের বিকল্প তৈরি করা। 


এ ধরনের আচরণের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এতে সরাসরি কোনো কথা বলা হয় না। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি পরে বলতে পারেন, “আমি তো কিছু বলিনি!” কিন্তু হয়রানি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু মুখে কী বলা হয়েছে, তা নয়; আচরণটির অর্থ, পরিস্থিতি এবং অন্য ব্যক্তির ওপর তার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।


কখন অমৌখিক আচরণ যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে?


নিবন্ধটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো আচরণ অস্বস্তিকর হলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি যৌন হয়রানি হয়ে যায় না। আইনি মূল্যায়নের জন্য আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়।


- যেকোনো অমৌখিক আচরণ তখনই হয়রানি হয়, যখন তা ভুক্তভোগীর কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অস্বস্তিকর মনে হয়।


-  যদি ভুক্তভোগী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার পরেও একই ব্যক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি, অঙ্গভঙ্গি, স্পর্শ বা অনুসরণ বারবার ঘটে থাকলে বিষয়টি আরও গুরুতর হতে পারে।


- আচরণটি কর্মীর মর্যাদা, নিরাপত্তাবোধ বা কাজ করার পরিবেশকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও বিবেচ্য।


- সুযোগের বিনিময়ে ইঙ্গিত। কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সুপারভাইজার যদি কোনো কর্মীকে পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট বা চাকরিতে বহাল রাখার বিনিময়ে কোনো আপত্তিকর অমৌখিক ইঙ্গিত (যেমন: ব্যক্তিগত কেবিনে ডেকে খুব কাছে বসা, আপত্তিকর উপহার দেওয়া) করেন।


কর্মক্ষেত্রে এমন হয়রানির শিকার হলে কী করবেন?


নিবন্ধে হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।


প্রথমত, সম্ভব হলে নিজের আপত্তি স্পষ্ট করুন। কোনো আচরণ অস্বস্তিকর মনে হলে হেনস্তাকারীকে সরাসরি ও দৃঢ় কণ্ঠে বলুন যে তার আচরণটি আপত্তিকর এবং এটি যেন আর না করা হয়। কেউ ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘন করলে বা খুব কাছে আসার চেষ্টা করলে অবিলম্বে সেখান থেকে সরে যান। তবে ভয়, ক্ষমতার অসমতা বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে সরাসরি প্রতিবাদ করতেই হবে—এমন নয়। প্রতিবাদ করতে না পারা মানে সম্মতি দেওয়া নয়।


দ্বিতীয়ত, ঘটনার নথি রাখুন। আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো প্রমাণ। তাই প্রতিটি ঘটনার পর কখন, কোথায়, কী ঘটেছে, কারা উপস্থিত ছিলেন—এই সব তথ্যগুলো ডায়েরিতে বা সুরক্ষিত ডিজিটাল নোটে লিখে রাখুন। প্রাসঙ্গিক ইমেইল, মেসেজ বা অন্য প্রমাণ থাকলে সেগুলোও সংরক্ষণ করুন।


তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত অভিযোগপ্রক্রিয়া অনুসরণ করুন। আপনার প্রতিষ্ঠানের ‘যৌন হয়রানি বিরোধী নীতিমালা’ বা ‘আচরণ বিধি’ (Code of Conduct) ভালো করে পড়ে নিন। সংগৃহীত প্রমাণ ও বিবরণসহ মানবসম্পদ বিভাগ (HR), ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ গ্রহণের জন্য নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে বিষয়টি জানানো যেতে পারে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলে বিকল্প অভিযোগের পথ খুঁজতে হবে।


চতুর্থত, প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিন। প্রতিষ্ঠান যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় বা পক্ষপাতিত্ব করে, তবে আপনি দেশের প্রচলিত শ্রম আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আইনি নোটিশ বা মামলা করতে পারেন।


বাংলাদেশেও কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি নির্দেশনা রয়েছে। ২০০৯ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনায় যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মোকাবিলার কার্যকর প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের হয়রানি হলে কি করনীয় তা ব্যাপারে আরো জানতে "কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি: অভিযোগ, প্রমাণ ও নিরাপত্তা—যা জানা জরুরি" শিরোনামে লেখা পড়ে দেখতে পারেন। 


একটি কর্মক্ষেত্র শুধু বেতন পাওয়া বা পেশাগত দক্ষতা দেখানোর জায়গা নয়; এটি এমন একটি পরিবেশ, যেখানে প্রত্যেক কর্মী সম্মান নিয়ে কাজ করতে চান। কিছু কিছু আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে নীরবতা থাকা মানেই সম্মতি নয়। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে চুপ থাকেন, কেউ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করেন, আবার কেউ বুঝতেই পারেন না, ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন। কর্মক্ষেত্র হোক সম্মান ও নিরাপত্তার জায়গা, এটাই সবার প্রত্যাশা। 

sidebar ad