মা হওয়ার পর ‘পারফেক্ট’ থাকার চাপটা যদি একটু কমতো…

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মা হওয়ার পর একজন নারীর জীবনে অনেক কিছুই বদলে যায়। বদলে যায় শরীর, বদলে যায় ঘুমের সময়, বদলে যায় দিনের হিসাব। নিজের জন্য আলাদা করে রাখা সময়টুকুও কখন যেন সন্তানের প্রয়োজনের ভিড়ে ছোট হয়ে আসে। তবু এই পরিবর্তনের মাঝেও সমাজের একটি অদৃশ্য প্রত্যাশা যেন থেকেই যায়—মা হয়েছেন, কিন্তু দেখতে যেন তার ছাপটুকুও না থাকে!


সন্তান জন্মের পরও যেন আগের মতোই পরিপাটি থাকতে হবে, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ থাকা যাবে না, শরীরের পরিবর্তন চোখে পড়া যাবে না, চুল সবসময় গোছানো থাকবে, পোশাক হবে নিখুঁত। যেন মা হওয়ার পরও একজন নারীকে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি এখনো ‘পারফেক্ট’।


ক্যাটরিনা কাইফ মা হওয়ার পরের সাম্প্রতিক কিছু ছবিতে যেন সেই ধারণাটাকেই একটু নরম করে দিলেন। বলিউডের তারকাদের আমরা সাধারণত দেখি নিখুঁত মেকআপ, সাজানো চুল, স্টাইলিশ পোশাক আর ক্যামেরার সামনে একেবারে প্রস্তুত এক অবয়বে। সেই চেনা গ্ল্যামারের বাইরে ক্যাটরিনার সহজ, স্বাভাবিক উপস্থিতি তাই আলাদা করে চোখে পড়ে।


চোখেমুখে হয়তো ক্লান্তির হালকা ছাপ। সাজসজ্জা কম। আগের মতো ক্যামেরার জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতির চিহ্নও নেই। কিন্তু সেখানে আছে আরও পরিচিত কিছু—একজন নতুন মায়ের বাস্তবতা।


একজন নারী মা হওয়ার পর শুধু সন্তানের জন্ম দেন না, নিজের শরীরকেও একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিয়ে যান। গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পর শরীরে আসে নানা পরিবর্তন। রাতের পর রাত ঘুম ভেঙে যায়। সন্তানের কান্না, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, অসংখ্য ছোট-বড় দায়িত্বের ভিড়ে নিজের যত্নের সময়টুকু অনেক সময়ই হারিয়ে যায়।


কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে, আগের মানুষটিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চোখের নিচে কালি পড়তে পারে। চুল এলোমেলো থাকতে পারে। শরীরের গড়ন বদলে যেতে পারে। কখনো সাজতে ইচ্ছে নাও করতে পারে।


কখনো হয়তো শুধু একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে ইচ্ছে করবে। এসবের কোনোটিই ব্যর্থতা নয়। বরং একজন মা যখন নিজের এই পরিবর্তিত, ক্লান্ত, স্বাভাবিক চেহারাটিকে লুকিয়ে রাখার বদলে স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারেন, সেটিও এক ধরনের আত্মবিশ্বাস।


ক্যাটরিনার এই লুক তাই শুধু একজন তারকার ‘নো-মেকআপ লুক’ হিসেবে দেখলে হয়তো গল্পটির বড় অংশটাই বাদ পড়ে যায়। এর মধ্যে আরও বড় একটি বিষয় আছে—মা হওয়ার পর নিজেকে সবসময় নিখুঁত দেখানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।


সন্তানের জন্য ভালো মা হওয়ার সঙ্গে সবসময় সুন্দর দেখানোর কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মা ক্লান্ত হতে পারেন। তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর নিজের জন্য কিছুটা সময় চাইতে পারেন। কোনো দিন সাজতে ভালো লাগতে পারে, আবার কোনো দিন আয়নার সামনে দাঁড়ানোরও ইচ্ছে নাও হতে পারে। দুটোই স্বাভাবিক।


তাই মা হওয়ার পর নিজেকে একটু সময় দেওয়া দরকার। নিজের শরীরকে তার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া দরকার। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। ভালো লাগলে সাজতে হবে, ভালো না লাগলে নয়। কারণ মা হওয়ার পর একজন নারীর সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় তাঁর নিখুঁত চেহারা নয়।


তিনি একজন মানুষ—যিনি নিজের শরীর, সময়, ঘুম, স্বস্তি আর ভালোবাসার অনেকটা দিয়ে আরেকটি মানুষকে পৃথিবীতে বড় করে তুলছেন।


তাই সেই স্বাভাবিক, ক্লান্ত, একটু এলোমেলো মানুষটিও কম সুন্দর নন। হয়তো মা হওয়ার পর ‘পারফেক্ট’ থাকার চাপটা সত্যিই একটু কমানো দরকার। একটু বেশি জায়গা দেওয়া দরকার বাস্তবতাকে। একটু বেশি স্বীকৃতি দেওয়া দরকার ক্লান্তিকে।


আর সবচেয়ে বেশি—একজন মাকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তাঁকে সবসময় নিখুঁত হতে হবে না। তিনি এমনিতেই যথেষ্ট।

sidebar ad