কাবিননামার গুরুত্বপূর্ণ ধারা: কী লিখবেন, কী লিখবেন না

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা সিদ্দিকা কাবিন ও দেনমোহরকে নারীর আইনি ও আর্থিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল দিক হলো—কাবিননামাকে শুধু বিয়ের আনুষ্ঠানিক কাগজ হিসেবে না দেখে এর প্রতিটি শর্ত বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।


কাবিননামায় শুধু দেনমোহরের অঙ্কই নয়, বরং বিবাহের বিভিন্ন তথ্য ও বিশেষ শর্তও লিপিবদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। তাই শুধু ‘কত টাকা কাবিন’—এই প্রশ্নে আটকে না থেকে, কাবিননামার কোন ঘরে কী লেখা হচ্ছে, সেটিও বুঝে নেওয়া জরুরি।


কাবিননামা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?


কাবিননামা বা নিকাহনামা হলো বিবাহের লিখিত দলিল। এতে বর-কনের পরিচয়, বিবাহের তথ্য, দেনমোহর, বিশেষ শর্ত এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণের মতো বিষয় উল্লেখ থাকে। দেনমোহরের ক্ষেত্রে কাবিননামার গুরুত্ব আরও বেশি। বিবাহবিচ্ছেদের পরও স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত; Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939-এর ৫ ধারায়ও বলা হয়েছে, ওই আইনের কোনো কিছুই স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে না। তাই কাবিননামায় কী লেখা হলো, সেটি শুধু বিয়ের দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়।


১. দেনমোহরের অঙ্ক—শুধু বড় অঙ্ক লিখলেই হবে না


কাবিননামার সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো দেনমোহর। অনেক পরিবার সামাজিক মর্যাদা দেখাতে বড় অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবে সেই অঙ্ক কীভাবে এবং কখন পরিশোধ করা হবে, সেটিও পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।

দেনমোহর নির্ধারণের সময়—


মোট কত টাকা বা সম্পদ দেওয়া হবে;


কত অংশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা হয়েছে;


কত অংশ বাকি;


বাকি অংশ কখন পরিশোধযোগ্য হবে—

এসব বিষয় স্পষ্টভাবে লেখা উচিত। ‘পরে দিয়ে দেব’ বা ‘সব পরিশোধ করা হয়েছে’—এ ধরনের অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি করতে পারে।


কী লিখবেন না?


বাস্তবে পরিশোধ না করেও পুরো দেনমোহর ‘উসুল’ বা পরিশোধিত দেখানো ঠিক নয়। কারণ পরবর্তী সময়ে দেনমোহর নিয়ে বিরোধ হলে কাবিননামার লিখিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে আসতে পারে।


অ্যাডভোকেট মোঃ গোলাম জাকারিয়ার মতে, কাবিননামা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ নয়; বিবাহ ও তাতে সম্মত শর্ত প্রমাণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই এতে যা লেখা হচ্ছে, তা বর-কনে দুজনেরই বুঝে নেওয়া উচিত।



২. ১৭ নম্বর ধারা: বিশেষ শর্ত থাকলে লিখুন স্পষ্ট করে


কাবিননামার ১৭ নম্বর ঘরে বিশেষ শর্ত উল্লেখ করার সুযোগ থাকে। এই জায়গাটি অনেক সময় ফাঁকা রাখা হয় কিংবা না বুঝেই ‘নেই’ লিখে দেওয়া হয়।

কিন্তু স্বামী-স্ত্রী যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আগে থেকেই সম্মত হন, তা পরিষ্কার ভাষায় লিখে রাখা যেতে পারে।

যেমন—


স্ত্রী পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন;


স্ত্রী চাকরি বা পেশা চালিয়ে যেতে পারবেন;


দাম্পত্য জীবনে নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক দায়িত্ব স্বামী বহন করবেন;


কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে উভয়ের সম্মতি প্রয়োজন হবে।


তবে শর্ত এমন হওয়া উচিত, যার অর্থ পরিষ্কার এবং যা আইনগতভাবে কার্যকর করার সুযোগ আছে।


অস্পষ্ট ভাষা এড়িয়ে চলুন


‘স্ত্রীকে ভালোভাবে রাখতে হবে’, ‘কোনো কষ্ট দেওয়া যাবে না’—এ ধরনের সাধারণ বাক্যের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য শর্ত থাকলে ভবিষ্যতে তার অর্থ বোঝা সহজ হয়।


৩. ১৮ নম্বর ধারা: খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা


কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে প্রশ্ন থাকে—স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দিয়েছেন কি না এবং দিলে কী শর্তে দিয়েছেন। এটি সাধারণভাবে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ বা তালাক-ই-তাফওয়িজ হিসেবে পরিচিত।


বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৮ ধারায় বলা হয়েছে, স্ত্রীকে তালাকের অধিকার যথাযথভাবে অর্পণ করা থাকলে এবং তিনি সেই অধিকার প্রয়োগ করতে চাইলে, তালাকের ক্ষেত্রে ৭ ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে।


কী করবেন?


কাবিননামায় ১৮ নম্বর ঘর পূরণের আগে বর ও কনে দুজনেরই এর অর্থ বুঝে নেওয়া উচিত। কোনো শর্ত যুক্ত করলে সেটি হতে হবে পরিষ্কার। যেমন ‘অমুক পরিস্থিতিতে’—এই ধরনের অস্পষ্ট শব্দের বদলে পরিস্থিতিটি যথাসম্ভব নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা ভালো।


একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়


স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা মানে এই নয় যে স্বামীর নিজের তালাকের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে গেল। কাবিননামার ১৯ নম্বর ঘরেও স্বামীর তালাকের অধিকার কোনোভাবে সীমিত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আলাদা তথ্য চাওয়া হয়। তাই ১৮ ও ১৯ নম্বর ঘর পাশাপাশি বুঝে পূরণ করা প্রয়োজন।


৪. ১৯ নম্বর ধারা: স্বামীর তালাকের অধিকার


এই ঘরে জানতে চাওয়া হয়—স্বামীর তালাকের অধিকার কোনোভাবে সীমিত করা হয়েছে কি না। এখানে শুধু কাজী কী লিখছেন তা দেখে স্বাক্ষর না করে, লেখা কথাটির অর্থ বর-কনে দুজনেরই জেনে নেওয়া উচিত। কারণ বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে মৌখিক আলোচনা নয়, লিখিত দলিলের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


৫. ২০ নম্বর ধারা: আলাদা কোনো চুক্তি থাকলে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ


বিয়ের সময় দেনমোহর, ভরণপোষণ বা অন্য কোনো বিষয়ে আলাদা লিখিত চুক্তি করা হলে তার উল্লেখ কাবিননামায় যথাযথভাবে থাকা প্রয়োজন। অনেক সময় পরিবারে মৌখিকভাবে অনেক কথা ঠিক হয়—‘বিয়ের পর পড়াশোনা করবে’, ‘চাকরি করতে পারবে’, ‘প্রতি মাসে নির্দিষ্ট খরচ দেওয়া হবে’ ইত্যাদি। কিন্তু শুধু মুখের কথার ওপর নির্ভর না করে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাগুলো লিখিত রাখা বেশি নিরাপদ।


৬. ২১ নম্বর ধারা: স্বামীর আগের বিয়ে আছে কি না


কাবিননামায় বর আগে কোনো বিয়ে করেছেন কি না, এবং বিদ্যমান স্ত্রী থাকলে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য Arbitration Council-এর অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়। বাংলাদেশের Muslim Family Laws Ordinance, 1961 অনুযায়ী বিদ্যমান বিবাহ থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের ক্ষেত্রে Arbitration Council-এর পূর্বানুমতির বিধান রয়েছে। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রাপ্য দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধযোগ্য হওয়ার বিধানও রয়েছে। তাই এই অংশটিও ‘ফরমের নিয়ম’ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।


কাবিননামায় কি কি লিখবেন?


বিয়ের আগে কয়েকটি বিষয় নিয়ে দুজনের পরিষ্কার আলোচনা থাকা ভালো—


১. দেনমোহরের মোট পরিমাণ


বাস্তবসম্মত ও পরিশোধযোগ্য অঙ্ক নির্ধারণ করুন।


২. দেনমোহরের কত অংশ পরিশোধিত


বাস্তবে যা দেওয়া হয়েছে, সেটিই লিখুন।


৩. বাকি দেনমোহরের প্রকৃতি


কখন বা কোন পরিস্থিতিতে তা পরিশোধযোগ্য—এটি পরিষ্কার করুন।


৪. বিশেষ শর্ত


দুজনের সম্মত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থাকলে স্পষ্ট ভাষায় লিখুন।


৫. তালাকের ক্ষমতা অর্পণের বিষয়


১৮ নম্বর ধারা বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।


৬. আলাদা চুক্তি থাকলে তার উল্লেখ


মৌখিক সমঝোতার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লিখিত রাখুন।


৭. ব্যক্তিগত তথ্য


নাম, ঠিকানা, বয়স/জন্মতারিখসহ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন।



কী লিখবেন না?


বাস্তবে না দেওয়া টাকা ‘উসুল’ দেখাবেন না

কাগজে টাকা দেওয়া হয়েছে দেখিয়ে বাস্তবে না দেওয়া ভবিষ্যতে বিরোধের কারণ হতে পারে।


ফাঁকা জায়গা রেখে স্বাক্ষর করবেন না

যে ঘরগুলো প্রযোজ্য নয়, সেগুলো কীভাবে পূরণ হবে তা কাজীর কাছ থেকে জেনে নিন। ফাঁকা জায়গায় পরে কিছু লেখা হবে কি না—এমন সন্দেহ থাকলে স্বাক্ষর করার আগে বিষয়টি পরিষ্কার করুন।


না বুঝে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ লিখবেন না

বিশেষ করে ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০ নম্বর ঘরের ক্ষেত্রে শুধু কাজীর নির্দেশে স্বাক্ষর না করে বিষয়টির অর্থ বুঝে নেওয়া উচিত।


অস্পষ্ট শর্ত লিখবেন না


‘ভালো ব্যবহার করতে হবে’—এর চেয়ে নির্দিষ্ট শর্ত বেশি কার্যকর ও বোধগম্য।


 শুধু সামাজিক চাপের কারণে অস্বাভাবিক বড় দেনমোহর নির্ধারণ করবেন না দেনমোহর এমন হওয়া উচিত, যার অর্থনৈতিক বাস্তবতা উভয় পক্ষ বোঝেন। বড় অঙ্ক লিখে পরে পরিশোধ না করার পরিস্থিতি তৈরি করা কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়।


কাবিননামায় স্বাক্ষরের আগে পাঁচ মিনিটের চেকলিস্ট


স্বাক্ষর করার আগে বর-কনে দুজনেই দেখে নিন—


নাম ও পরিচয়ের বানান ঠিক আছে কি না



বয়স/জন্মতারিখ সঠিক কি না



ঠিকানা ঠিক আছে কি না



দেনমোহরের মোট অঙ্ক ঠিক আছে কি না



কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে তা সঠিক কি না


 বাকি দেনমোহর সম্পর্কে লেখা পরিষ্কার কি না


বিশেষ শর্তগুলো সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না


 ১৮ নম্বর ধারার অর্থ বোঝা হয়েছে কি না


১৯ ও ২০ নম্বর ধারায় কী লেখা হয়েছে তা পড়া হয়েছে কি না


কোনো ঘর ফাঁকা রাখা হয়েছে কি না


স্বাক্ষরের আগে পুরো কাবিননামাটি পড়ে নেওয়া হয়েছে কি না


নিবন্ধিত কাবিননামার কপি সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না


সারকথা হলো, বিয়ের আগে কাবিননামার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিয়ে বর-কনের মধ্যে পরিষ্কার আলোচনা থাকা উচিত। বিশেষ করে দেনমোহর, বিশেষ শর্ত এবং তালাকের ক্ষমতা অর্পণের বিষয়গুলো না বুঝে স্বাক্ষর করা উচিত নয়।


উল্লেখ্য, বিস্তারিত জানতে একজন আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। 


সূত্র: অ্যাডভোকেটিয়া

sidebar ad