এক ইঁদুর আর এক ব্যাঙের মধ্যে ছিল বেশ ভাব। বন্ধুত্ব এতটাই গভীর ছিল যে, একজন আরেকজনকে ছেড়ে থাকতে পারতো না। একজন কোথাও গেলে অন্যজনও তার সঙ্গে সেখানে হাজির হয়ে যেত। তাই তারা ঠিক করল, সব সময় যাতে একসঙ্গে থাকতে পারে তাই নিজেদের একটি করে পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবে।
কিন্তু বিপত্তি ঘটল একদিন। জলাশয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ব্যাঙটি পানি দেখে স্বভাবসুলভভাবেই সাঁতার কাটার জন্য লাফ দিল। ব্যাঙের সঙ্গে দড়িতে বাঁধা ইঁদুরটিও পানিতে পড়ে গেল। সাঁতার জানা না থাকায় পানিতে নাকানিচুবানি খেয়ে তার মৃত্যু হলো। ঠিক তখনই আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একটি চিল। পানিতে ভেসে থাকা ইঁদুরটিকে শিকার করতে গিয়ে সে ইঁদুরের সঙ্গে বাঁধা ব্যাঙটিকেও তুলে নিয়ে গেল আকাশে। বেচারা ব্যাঙ ইঁদুরের পায়ের সাথে ঝুলতে ঝুলতে এক পর্যায়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে মারা গেল।
গল্পটির এই করুণ পরিণতির জন্য কাকে বেশি দায়ী মনে হয়? ব্যাঙকে, যে ইঁদুরটির সাঁতার না জানার কথা বিবেচনা না করেই পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল? নাকি ইঁদুরকে, যে বন্ধুর ওপর বিশ্বাস রেখে নিজের পা তার সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিল, অথচ একবারও ভাবেনি যে তাদের দুজনের সক্ষমতা ও বাস্তবতা আলাদা?
একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, এই পরিণতির পেছনে আসল দায়ী সেই দড়িটি, যা দুজনকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। যা ছিল তাদের কাছে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের প্রতীক, শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠল দুজনের মৃত্যুর কারণ।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কি বিষয়টি এমন নয়? ভালোবাসার মানুষকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখাই কি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ? নাকি সুস্থ ভালোবাসা হলো এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়, পছন্দ ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারেন?
আর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে তখনই সামনে আসে মনোবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—কোডিপেডেন্সি (Codependency) এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা (Personal Boundaries)।
কোডিপেন্ডেন্সি: ভালোবাসা, নাকি একে অপরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা?
কাউকে ভালোবাসলে প্রিয় মানুষটার সাহচর্য ভালো লাগবে, তার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছা করবে, তার সুখে আনন্দ হবে, দুঃখে পাশে দাঁড়াতে মন চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। জীবনের কঠিন সময়ে সঙ্গীর ওপর নির্ভর করা, সাহায্য চাওয়া কিংবা তাঁর কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পাওয়াও সুস্থ সম্পর্কের অংশ।
কিন্তু যখন একজন মানুষের ভালো থাকা, আত্মবিশ্বাস কিংবা মূল্যবোধের অনুভূতি অতিরিক্তভাবে অন্য একজনের আচরণ, উপস্থিতি কিংবা অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখনই কিন্তু সম্পর্কের সমীকরণটি জটিল হতে শুরু করে।
মনোবিজ্ঞানে কোডিপেন্ডেন্সি বলতে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক আচরণকে বোঝানো হয়, যেখানে একজন মানুষ নিজের আবেগ, চাহিদা ও অস্তিত্বকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে অন্য একজন মানুষের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সহজ কথায়, এটি হলো "ভালোবাসার ছদ্মবেশে থাকা একটি পরজীবী সম্পর্ক।"
তবে এই কোডিপেন্ডেসি-এর কোনো একক, সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। এটি নিজে থেকেই কোনো আনুষ্ঠানিক মানসিক রোগের নির্ণয় নয়। তাই কাউকে ভালোবাসেন, সঙ্গীর জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন কিংবা তাঁর ওপর নির্ভর করেন বলেই তাঁকে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বলা ঠিক হবে না। সম্পর্কের আচরণগুলো কতটা একতরফা, দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, সেটিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন নারী তাঁর প্রিয় মানুষটার সাথে কোথাও যেতে চান। সঙ্গী ব্যস্ত থাকায় যেতে পারলেন না। তিনি হতাশ হলেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই সময় দিতে না পারায় যদি তাঁর মনে হয়, ‘তাহলে কি সে আমাকে আর ভালোবাসে না?’
কিংবা নিজের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, পছন্দের কাজ করা, একা সময় কাটানো—সবকিছুই যদি সঙ্গীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার প্রশ্ন উঠতে পারে।
আবার এমনও হতে পারে, একজন সঙ্গী সব সময় অন্যজনের সমস্যার সমাধান করতে ব্যস্ত। অন্যজনের ভুলের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন, তাঁর ভূল আচরণ ঢাকার জন্য অজুহাত তৈরি করেন, সঙ্গী যেন কষ্ট না পায় সে জন্য নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেন। বাইরে থেকে একে "চরম আত্মত্যাগ বা মহান ভালোবাসা" মনে হতে পারে, কিন্তু মনস্তত্ত্বের ভাষায় এটিই হলো কোডিপেন্ডেন্সি।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট কোডা ডেরিগে এই ব্যাপারে বলেন "কোডিপেন্ডেন্ট সম্পর্কের মূল সংকটটি হলো এর ভেতরের চরম বৈষম্য। এখানে সম্পর্কের সমীকরণটি এমন হয়ে দাঁড়ায় যেখানে একজন মানুষ তার পুরো অস্তিত্ব, সময় ও শক্তি অন্যজনের জন্য উজার করে দেয়। আর অপরজন, জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে, এই অন্ধ আত্মত্যাগের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থ ও খেয়ালখুশি চরিতার্থ করতে ব্যস্ত থাকে।"
শুরুতে এই আচরণগুলো ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ কিংবা আত্মত্যাগ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে একজনের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অন্যজন ক্লান্ত, অসহায় কিংবা নিজের পরিচয় সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন।
কেন এমন নির্ভরশীলতা তৈরি হয়?
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কোডিপেন্ডেন্সি বা এই ধরনের আত্মঘাতী নির্ভরশীলতা হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন—
- একাকীত্ব ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার চরম ভয় কাজ করতে পারে। এদের মনে অবচেতনভাবেই এই ভয় কাজ করে যে, "আমি যদি ওর সব কথা না শুনি বা ওর খেয়াল না রাখি, তবে ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।" এই একা হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে তারা সঙ্গীর সব অন্যায় বা শোষণ মুখ বুজে সহ্য করে এবং পা বেঁধে রাখা ইঁদুরের মতো সম্পর্কের জালে আটকে থাকে।
- আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকতে পারে। কোডিপেন্ডেন্ট ব্যক্তিরা ভেতর থেকে নিজেদের ভীষণ মূল্যহীন মনে করেন। তারা ভাবেন, তারা নিজেরা এককভাবে ভালোবাসার যোগ্য নন। তাই যখন তারা অন্য কোনো মানুষের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন বা কাউকে 'উদ্ধার' করতে পারেন, তখন তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় বা মূল্যবান মনে করেন। অন্যের প্রশংসা, অনুমোদন কিংবা ভালোবাসার ওপর নির্ভর করেই তাদের নিজস্ব আত্মপরিচয় (Identity) তৈরি হয়।
- এর পেছনে অনেক সময় শৈশবের অভিজ্ঞতাও বড় ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ কোডিপেন্ডেন্ট ব্যক্তি এমন পরিবারে বড় হন যেখানে বাবা-মা বা অভিভাবকের কেউ একজন মানসিকভাবে অসুস্থ, মাদকাসক্ত, খিটখিটে মেজাজের কিংবা ভীষণ দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের আবেগ সামলানোর দায়িত্ব নেয়া বা পরিবারের বড়দের মতো আচরণ করতে বাধ্য হয়, তখন সে ধরে নেয় যে "অন্যের যত্ন নেওয়া এবং নিজেকে উজাড় করে দেওয়াটাই" তার জীবনের একমাত্র ভূমিকা।
- উদ্ধারকর্তা হওয়ার এক ধরনের মানসিক আনন্দ পাওয়া। অনেকের ধারণা থাকে যে তারা তাদের ভালোবাসা ও ত্যাগ দিয়ে যেকোনো খারাপ বা সমস্যাগ্রস্ত মানুষকে বদলে দিতে পারবেন। এই মানসিকতা থেকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন সঙ্গী বেছে নেন যারা ভাঙা, ছিটগ্রস্ত বা আসক্ত। অপরজনকে 'ঠিক' করার এই অন্তহীন লড়াইয়ে তারা নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
এগুলো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, সবার ক্ষেত্রে এই কারণগুলো যে একইভাবে কাজ করে, তা কিন্তু না। অতিরিক্ত নির্ভরশীল আচরণকে শুধু ব্যক্তির দুর্বলতা হিসেবে দেখাও ঠিক নয়; সম্পর্কের পরিবেশ, অতীত অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভালোবাসার সম্পর্কেও সীমারেখা থাকা জরুরি
ইঁদুর ও ব্যাঙের গল্পে আবার ফিরে যাওয়া যাক। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে থাকা। কিন্তু সেই একসঙ্গে থাকার জন্য তারা এমন একটি ব্যবস্থা বেছে নিয়েছিল, যেখানে একজনের স্বাভাবিক চলাফেরা অন্যজনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। দুজনের ভিন্ন সক্ষমতা, প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় না নিয়েই তারা নিজেদের বেঁধে রেখেছিল।
সম্পর্কের ক্ষেত্রটাও এমন। একটি সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো পারস্পরিক সীমারেখা বা পার্সোনাল বাউন্ডারি (Personal Boundaries)। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও সত্যি যে, সম্পর্কে সীমারেখা থাকা মানে দূরত্ব তৈরি করা নয়, বরং এটি হলো সম্পর্ককে সুস্থভাবে টিকিয়ে রাখার দেয়াল।
যেমনটি ইঁদুর আর ব্যাঙের গল্পে দেখা গেছে—পা বেঁধে ফেলার কারণে দুজনের ব্যবধান ঘুচে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই সীমারেখাহীনতাই শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
সম্পর্কের কোন কোন ক্ষেত্রে সীমারেখা প্রয়োজন?
১. ব্যক্তিগত সময় ও পরিসর:
একসাথে থাকা মানেই ২৪ ঘণ্টা আঠার মতো লেগে থাকা নয়। প্রতিটি মুহূর্ত একসঙ্গে কাটানোই ভালোবাসার একমাত্র প্রমাণ নয়। দুজনেরই নিজস্ব একটা জগত থাকা দরকার। কেউ হয়তো কাজ শেষে একা কিছুক্ষণ থাকতে চান, কেউ বই পড়তে ভালোবাসেন, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মানসিকভাবে সতেজ বোধ করেন। সঙ্গীর ব্যক্তিগত সময়ের প্রয়োজনকে অবহেলা বা প্রত্যাখ্যান হিসেবে না দেখে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
২. মানসিক ও আবেগগত সীমারেখা:
সঙ্গীর মন খারাপ হলে তাঁর পাশে থাকা ভালোবাসার অংশ। কিন্তু তাঁর প্রতিটি অনুভূতি ঠিক করে দেওয়া কিংবা তাঁর সব সমস্যার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া আপনার দায়িত্ব নয়। আপনি সহায়তা করতে পারেন, কিন্তু অন্য ব্যক্তির প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও আবেগের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে নেই।
৩. ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা:
পড়াশোনা, পেশা, পোশাক, বন্ধুত্ব কিংবা নিজের আগ্রহ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দুজনেরই মতামত ও স্বাধীনতা থাকা জরুরি। যৌথ সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার নামে একজন অন্যজনের জীবনের সব সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন—এটি সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়।
৪. গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল সীমারেখা:
সম্পর্কে বিশ্বাস থাকা জরুরি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে অপরজনের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা 'প্রাইভেসি' থাকবে না। সঙ্গীর ফোন, ব্যক্তিগত বার্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার থাকলেই যে সবকিছু পরীক্ষা করার অধিকার তৈরি হয়, তা নয়। পাসওয়ার্ড ভাগ করে নেওয়া বা ফোন দেখানোর বিষয়ে দম্পতিরা নিজেদের মতো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু ভয় দেখিয়ে, চাপ দিয়ে বা সন্দেহের অজুহাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা আলাদা বিষয়।
অতীতের কোনো বিষয় নিয়ে যদি কেউ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করে, তবে তা নিয়ে জোর জবরদস্তি না করা।
৫. আর্থিক সীমারেখা:
টাকা-পয়সা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি অনেক সুন্দর সম্পর্ককেও নষ্ট করে দেয়। তাই শুরুতেই এই বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। নিজের উপার্জিত অর্থ কীভাবে খরচ বা সঞ্চয় করা হবে, তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার।
যৌথ খরচের ক্ষেত্রে কে কতটুকু বহন করবে এবং কার ওপর কতটুকু আর্থিক দায় থাকবে, তা পরিষ্কার করা। একে অপরের ওপর জোরপূর্বক ঋণের বোঝা চাপিয়ে না দেওয়া।
৬. শারীরিক সীমারেখা:
সম্পর্ক বা বিবাহের মধ্যেও প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের ওপর নিজের অধিকার রয়েছে। কোনো ধরনের স্পর্শ, ঘনিষ্ঠতা কিংবা যৌন আচরণে সম্মতি থাকা জরুরি। আগে সম্মতি দিয়েছেন বলে সব সময় দিতে হবে, এমন নয়। অস্বস্তি হলে ‘না’ বলার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্কের দড়িটা কেমন হওয়া উচিত?
একটি সুস্থ ও সুন্দর সম্পর্কে সম্পর্কের দড়িটা এমন হওয়া উচিত যা আটকে রাখবে না, কিন্তু যুক্ত রাখবে। রূপক অর্থে সম্পর্কের দড়িটির বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত ঠিক এমন:
- সম্পর্কের সুতো বা দড়িটা হতে হবে ইলাস্টিকের মতো নমনীয়। যখন দুজনে একসাথে সময় কাটাবে, তখন দড়িটি তাদের কাছাকাছি রাখবে। আবার যখন কাজের তাগিদে, ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে বা ব্যক্তিগত স্পেসের জন্য তারা কিছুটা দূরে যাবে, তখন দড়িটি যেন ছিঁড়ে না গিয়ে সহজে প্রসারিত হতে পারে। অর্থাৎ, এটি দূরে যাওয়ার স্বাধীনতা দেবে, আবার ফিরে আসার টানও বজায় রাখবে।
- পা বেঁধে রাখার মতো দৃশ্যমান বা জোরপূর্বক কোনো বন্ধন সম্পর্কে থাকা উচিত নয়। সম্পর্কের দড়িটা তৈরি হবে বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার উপাদান দিয়ে। বাইরে থেকে কোনো কড়াকড়ি বা নজরদারি দেখা যাবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাদের আত্মিক বন্ধন হবে দৃঢ়।
- জাহাজের নোঙরের মতো, যা মাঝসমুদ্রে জাহাজকে ঝড়ের হাত থেকে স্থির রাখে, কিন্তু জাহাজটিকে পানির ওপর ভেসে থাকার ও দোলার স্বাধীনতা দেয়। সম্পর্কের দড়িটি হবে এমন এক নোঙর, যা জীবনের কঠিন সময়ে দুজনকে মানসিক নিরাপত্তা ও স্থিরতা দেবে।
- সম্পর্কের বাঁধন এমন হওয়া উচিত নয় যা দম বন্ধ করে দেয়। বন্ধনটি হবে একটি আলগা কিন্তু সুরক্ষিত গিঁটের মতো। যেখানে দুজন মানুষ স্বেচ্ছায় একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, কোনো বাধ্যবাধকতা বা অন্ধ ভয় থেকে নয়। তারা চাইলে যেকোনো সময় আলাদা হতে পারে—এই স্বাধীনতা থাকার পরেও যখন তারা একসাথে থাকে, সেটাই হলো প্রকৃত ভালোবাসা।
লেখা- শায়লা জাহান