শায়লা জাহান-
আদৌ কি সম্ভব? প্রিয় খাবারগুলো একপাশে ঠেলে রেখে স্ট্রিক্ট চার্ট ফলো করা আর জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানোই যেনো এর মূলমন্ত্র। কিন্তু বিজ্ঞান কি বলে? ওজন কমানোর রহস্য না খেয়ে থাকার মধ্যে নেই; বরং আমাদের প্রতিদিনকার গড়ে উঠা কিছু অভ্যাসের মাঝেই লুকিয়ে থাকতে পারে এর মাস্টার কি। এই প্রতিবেদনে ডায়েট ছাড়াই বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ওজন কমানোর কিছু উপায় সম্পর্কে জানবো আজ।
সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন একে অপরের পরিপূরক। সঠিক জীবনযাত্রা ও নিয়ন্ত্রিত ওজন ব্যবস্থার উপর এই শারীরিক সুস্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে। ওজন কমাতে শুধুমাত্র ক্যালোরি মেপে খাওয়া কিংবা একেবারেই না খেয়ে থাকা- ধারনাটি এখন বড্ড সেকেলে। তুমি কি খাচ্ছো, কখন ঘুমাচ্ছো, কতটুকু পানি পান করছো- এই সিম্পল কিন্তু কার্যকর বিষয়গুলো শরীরের ফ্যাট বার্ন প্রসেসকে বাড়িয়ে দিতে পারে। একটা সামান্য প্লেটের সাইজও এখানে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। মোটকথা, শরীরকে কষ্ট না দিয়ে চর্বি গলানো সম্ভব, যদি তুমি জানো শরীরের মেটাবলিজমের সুইচগুলো কোথায়? আসো জেনে নিই এমন ৭টি উপায়, যা ডায়েট ছাড়াই শরীরকে রাখবে ফিট ও ঝরঝরে।
লক্ষ্য নির্ধারন করা: যেকোন যাত্রায় লক্ষ্য নির্ধারন করার মানেই হলো, সফলতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা। আর প্রসঙ্গ যদি হয় ওজন কমানোর, সেক্ষেত্রে সঠিক লক্ষ্য ছাড়া এই পথচলা তোমার কাছে পালবিহীন নৌকার মতো মনে হবে। বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট ভাগ করলে তা অর্জন করা সহজ হবে এবং সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট ট্র্যাকে পরিচালিত হবে। বেশিরভাগ পুষ্টিবিদ প্রতি সপ্তাহে ১ থেকে ২ পাউন্ড (০.৫ থেকে ১ কেজি) ওজন কমানোর পরামর্শ দেন, যা একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। ২ সপ্তাহে ৫ কেজি ওজন কমানো, এমন প্রলোভিত কথা শুনতে ভালো লাগলেও আদতে তা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।
পর্যাপ্ত পরিমানে প্রোটিন গ্রহন: ওজন কামানোর যাত্রায় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকলে তা পেশি ঠিক রেখে চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে। প্রানীজ প্রোটিন হিসেবে মুরগি, মাছ, ডিম, দই ও পনিরের মতো দুগ্ধজাত খাবার এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন হিসেবে শিম, ডাল, বাদাম, সূর্যমুখী বা কুমড়োর বীজ খাবারের তালিকায় রাখতে পারো। এ জাতীয় খাবার দীর্ঘক্ষন পেট ভরা রাখে ফলে বারবার ক্ষুধা লাগেনা এবং ক্যালোরি গ্রহন কমে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। শুধু কি তাই? প্রোটিন হজম করার জন্য শরীর বেশি ক্যালোরি খরচ করে, যা মেটাবলিজম বা বিপাক ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
সক্রিয় থাকা: কর্মব্যস্ততার জন্যই হোক কিংবা আলসেমি; আয়োজন করে জিমে যেয়ে ঘাম ঝরানোটা সবার জন্য সম্ভব হয়ে উঠেনা। তাহলে উপায়? ছোট ছোট কিছু অভ্যাসই পারে তোমাকে বদলে দিতে।
* প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা
* লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করা
* কম দূরত্বের পথে যানবাহন না নিয়ে হেঁটে যাওয়া
* ঝাড়ু দেয়া, মোছা বা বাগান করার মতো কাজগুলো বেশি ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে
* প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট নাচ বা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করা
* দীর্ঘ সময় বসে না থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পর পর একটু স্ট্রেচিং করা
পর্যাপ্ত পানি পান
ওজন কমাতে পানি একটি ন্যাচারাল মেটাবলিক বুস্টার হিসেবে কাজ করে। ৫০০ মিলি পানি পান করার প্রায় এক ঘন্টা পর্যন্ত মেটাবলিজম ২৪-৩০% বৃদ্ধি পেতে পারে। দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করলে শরীরের আদ্রতা বজায় থাকে। শরীরকে আর্দ্র রাখলে কিডনি ভালো থাকে এবং শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে আসে। খাবার খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে পানি খেলে ক্ষুধার তীব্রতা কমে যায়, ফলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহনের প্রবনতা কমে।
ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবারের প্রাধান্য
শর্করাজাতীয় খাবারের রাশ টেনে ধরে খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবারের আধিক্য আনতে হবে। সবজি যেমন ব্রোকোলি, গাজর, ঢেঁড়শ; ফলের মধ্যে পেয়ারা, নাশপাতি, আপেল, কলা। এছাড়াও শস্যদানা, বীজ ও আমন্ড বা কাঠবাদাম ফাইবারের ভালো উৎস। আঁশযুক্ত খাবার খেলে-
পেট ভরা অনুভূতি বাড়ায়
ক্যালোরি শোষণ কমায়
হজম প্রক্রিয়া ধীর করে
রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে
পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে
ছোট প্লেট ও ধীরগতিতে খাবার খাওয়া
অদ্ভুত শোনালেও, ওজন কমানোর লক্ষ্যে ক্যালোরি নিয়ন্ত্রনে প্লেটের আকার এক বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। খাবারের পরিমান নিয়ন্ত্রনে প্লেটের আকার অনেকটা দৃষ্টিবিভ্রমের সৃষ্টি করে। এর ফলশ্রুতিতে অল্প পরিমানের খাবার বড় প্লেটের তুলনায় ছোট প্লেটে খেলে মস্তিষ্ক এবং পেট দুটোই তৃপ্তি পায়। প্লেটের ৫০% অংশ শাকসবজি ও ফল, বাকি অর্ধেক অংশের এক ভাগে চর্বিহীন প্রোটিন আর শেষভাগে শর্করা যোগ করে একটি আদর্শ প্লেট সাজাতে পারো।
খাবার ভালো করে চিবিয়ে ধীর গতিতে খাওয়া ভালো। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ধীরে ধীরে খাওয়ার ফলে তৃপ্তির হরমোন এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা কম ক্যালোরিতেই তোমাকে তৃপ্তবোধ করতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত ঘুম
অসংখ্য গবেষণায় ঘুমের ব্যাঘাত ও ওজন বৃদ্ধির মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। ঘুমের অভাব হলে শরীরে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রনকারী হরমোন লেপটিন ও ঘেরলিন এর ভারসাম্য নষ্ট হয়। কম ঘুমালে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেড়ে যায়, যা চর্বি জমাতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে ওজন বাড়ায়। তাই দিনে অন্তত ৭-৮ ঘন্টা গভীর ঘুম মেটাবলিজম ঠিক রেখে চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে।
ওজন কমানো মানে নিজেকে নিজে কষ্ট দেয়া নয়। বরং অনেক স্মার্ট ওয়েতে নিজের মাঝে বদল আনা যেতে পারে। মনে রেখো, খুব দ্রুত কমানো ওজন দ্রুতই ফিরে আসে। কিন্তু নিয়ম মেনে কমানো ওজনই থাকবে দীর্ঘদিন। তাই আজ থেকেই শুরু করে দাও এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো। আর ফলাফল!! নিজেই দেখে নাও।