সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ের একটি সম্মাননা গ্রহণ করছিলেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, করতালির শব্দ আর অভিনন্দনের ভিড়ে তিনি যখন বক্তব্য দিতে উঠলেন, সবাই ভেবেছিলেন, নিজের সংগ্রামের গল্পই বলবেন।
কিন্তু তিনি বললেন অন্য কথা—‘আজ আমার এই সাফল্যের জন্য সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। কিন্তু আমি জানি, আমার বাবা যদি সেদিন সমাজের কথা শুনতেন, তাহলে আজ আমি এখানে দাঁড়াতে পারতাম না।’
এক মুহূর্তের জন্য পুরো হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি আর কিছু বলেননি। কিন্তু তাঁর সেই একটি বাক্য যেন শত শত বাবার মুখ হয়ে কথা বলছিল।
আমরা যখন কোনো সফল নারীর গল্প শুনি, তখন তাঁর মেধা, পরিশ্রম, সাহস আর সংগ্রামের কথাই বলি। বলা উচিতও তাই। কারণ, সাফল্যের আসল দাবিদার তিনিই। কিন্তু সেই গল্পের পেছনে অনেক সময় এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের নাম সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে না। তাঁরা করতালিও পান না। অথচ তাঁদের একটি সিদ্ধান্ত, একটি উৎসাহ, একটি বিশ্বাস কিংবা একটি ছোট সহযোগিতা একজন নারীর পথচলাকে অনেক সহজ করে দেয়।
এই মানুষগুলোর অনেকেই পুরুষ
এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সফল নারীর পেছনে একজন পুরুষ থাকেন। বাস্তবতা তা নয়। অসংখ্য নারী আছেন, যাঁরা প্রতিকূলতা, অবহেলা কিংবা একাকিত্বকে সঙ্গী করেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁদের সাফল্য তাঁদের নিজের শক্তির গল্প।
কিন্তু এটাও বাস্তব যে আমাদের চারপাশে হাজারো নারী আছেন, যাঁদের জীবন একটু সহজ হয়েছে একজন বাবার বিশ্বাসে, একজন ভাইয়ের সাহসে, একজন স্বামীর বোঝাপড়ায় কিংবা একজন সহকর্মীর সম্মানজনক আচরণে।
এই লেখাটি তাঁদের নিয়েই।
একটি মেয়ের প্রথম শক্তি
একটি শিশু যখন হাঁটতে শেখে, তখন বাবার আঙুল শক্ত করে ধরে। হয়তো সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্বাসের প্রথম পাঠ। মেয়েটি বড় হতে থাকে। একসময় সমাজ প্রশ্ন করতে শুরু করে— ‘এত পড়াশোনা করে কী হবে?’
‘এখনই বিয়ে দিলে ভালো হয়।’, ‘মেয়েদের এত স্বাধীনতা দিলে সমস্যা হবে।’
এই প্রশ্নগুলোর ভিড়ে একজন বাবা যদি শান্তভাবে বলেন, ‘আমার মেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করবে’, তাহলে সেই কথাটিই হয়ে ওঠে একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি।
সব বাবা হয়তো মুখে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন না। অনেকেই কঠিন মানুষ। কিন্তু ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়া, নিজের শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো, সমাজের সমালোচনা উপেক্ষা করে মেয়েকে এগিয়ে যেতে দেওয়া—এসবই ভালোবাসার অন্য ভাষা।
অনেক সফল নারী যখন জীবনের দিকে ফিরে তাকান, তখন তাঁদের চোখে প্রথম যে মুখটি ভেসে ওঠে, সেটি একজন বাবার।
একজন ভাইয়ের নীরব উপস্থিতি
অনেক ভাই কখনো বড় বড় বক্তৃতা দেন না। কিন্তু বোন রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে কি না, সে খবর নেন। নতুন শহরে পড়তে গেলে পাশে গিয়ে দাঁড়ান। কঠিন সময়ে বলেন, ‘ভয় পেও না, আমরা আছি।’
এই ‘আমরা আছি’ কথাটি অনেক বড় শক্তি। একজন নারী যখন জানেন, বিপদের সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মানুষ আছে, তখন তিনি জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে আরও সাহসী হন। তবে একজন ভাইয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বোনের জীবন নিয়ন্ত্রণ করা নয়। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তাঁকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করা।
একজন রান্নাঘরে ঢুকলেন। আরেকজন টেলিভিশনের সামনে বসে গেলেন। এই দৃশ্য এখনও আমাদের সমাজে খুব পরিচিত।
তবে আরেকটি দৃশ্যও এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে। অফিস থেকে ফিরে একজন স্বামী বলছেন, ‘তুমি একটু বিশ্রাম নাও, আমি ভাতটা বসিয়ে দিচ্ছি।’ অথবা, ‘আজ আমি ছেলেটার পড়া দেখি।’ এই দৃশ্যগুলো হয়তো খুব সাধারণ।
কিন্তু এই সাধারণ ঘটনাগুলোই একজন নারীর জীবনে অসাধারণ প্রভাব ফেলে। কারণ, একজন নারী তখন বুঝতে পারেন, সংসার শুধু তাঁর একার দায়িত্ব নয়।
সংসার দুজনের। আর দায়িত্বও দুজনের। একজন পুরুষের ভালোবাসা সব সময় বড় বড় ঘোষণায় প্রকাশ পায় না। অনেক সময় তা প্রকাশ পায় খুব সাধারণ কিছু কাজে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে সন্তানের নাশতা তৈরি করে দেওয়া। স্ত্রী অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় যাবেন বলে শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া।
বাজার থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করা, ‘আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?’
এই ছোট ছোট কাজগুলোকে অনেকেই তুচ্ছ মনে করেন। কিন্তু একজন কর্মজীবী নারী জানেন, এগুলো তাঁর জন্য কত বড় স্বস্তি।
কারণ, প্রতিদিনের ক্লান্তির মধ্যেও তিনি বুঝতে পারেন, তিনি একা নন।
যে পুরুষ স্বপ্নকে সম্মান করেন
একজন নারী যখন নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে চান, তখন তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় বিশ্বাসের। সব মানুষ অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন না। কিন্তু উৎসাহ দেওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন হয় না। অনেক নারী উদ্যোক্তা তাঁদের প্রথম ব্যবসা শুরু করেছেন ঘরের একটি ছোট্ট কোণ থেকে। প্রথম দিকে লাভ ছিল না, ছিল অনিশ্চয়তা। তবু তাঁরা টিকে ছিলেন, কারণ বাড়িতে অন্তত একজন মানুষ বলেছিলেন, ‘চেষ্টা করো। একদিন না একদিন তুমি সফল হবেই।’
এই একটি বাক্য অনেক সময় ব্যাংকের ঋণের চেয়েও বড় শক্তি হয়ে ওঠে। কারণ, মানুষ প্রথমে অর্থের অভাবে ভেঙে পড়ে না; ভেঙে পড়ে বিশ্বাসের অভাবে।
সম্মানও এক ধরনের ভালোবাসা
ভালোবাসা শুধু ফুল দেওয়া নয়। ভালোবাসা শুধু বিশেষ দিনে উপহার দেওয়াও নয়। ভালোবাসা হলো একজন মানুষের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া। একজন স্ত্রী যখন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন তাঁকে ‘তোমার কাজেরও মূল্য আছে’—এই অনুভূতিটুকু দেওয়াও ভালোবাসা। একজন বাবা যখন মেয়ের মতামত মন দিয়ে শোনেন, সেটিও সম্মান।
একজন ভাই যখন বোনের সিদ্ধান্তকে নিজের সিদ্ধান্তের মতো গুরুত্ব দেন, সেটিও সম্মান। একজন স্বামী যখন ‘উনি আমার স্ত্রী’ বলার পাশাপাশি তাঁর পেশাগত পরিচয়ও গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন, সেটিও সম্মান। সম্মান ছাড়া কোনো সম্পর্ক দীর্ঘদিন সুন্দর থাকে না।
সমাজ বদলায় ঘরের ভেতর থেকেই
আমরা প্রায়ই বলি, সমাজ বদলাতে হবে। কিন্তু সমাজ তো আলাদা কোনো জায়গা নয়। সমাজ শুরু হয় একটি পরিবার থেকে। একটি ছেলে যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে, তাঁর বাবা মায়ের প্রতি সম্মান দেখান, সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেন, তাহলে বড় হয়ে সেও সেটাই স্বাভাবিক বলে মনে করবে।
একটি মেয়ে যদি দেখে, তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাহলে সেও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হয়ে বড় হবে। এভাবেই একটি পরিবারের আচরণ ধীরে ধীরে একটি সমাজের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
একজন সফল নারী মানে একটি সফল পরিবার
একজন নারী যখন নিজের স্বপ্ন পূরণ করেন, তখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন হয় না। তিনি পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। সন্তানদের সামনে উদাহরণ তৈরি করেন। পরবর্তী প্রজন্মকে শেখান—স্বপ্নের কোনো লিঙ্গ নেই। তাই একজন নারীর এগিয়ে যাওয়া মানে শুধু একজন মানুষের এগিয়ে যাওয়া নয়। এটি একটি পরিবারের এগিয়ে যাওয়া। একটি সমাজের এগিয়ে যাওয়া। একটি দেশের এগিয়ে যাওয়া।
পরিশেষে
আজকের এই লেখাটি কোনো পুরুষকে কৃতিত্ব দেওয়ার জন্য নয়। আবার কোনো নারীর সংগ্রামকে ছোট করার জন্যও নয়। এই লেখাটি শুধু একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চায়। একজন নারীর সাফল্য তাঁর নিজের। কিন্তু সেই পথকে আরও সুন্দর, আরও নিরাপদ এবং আরও সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারেন তাঁর জীবনের কিছু মানুষ। একজন বাবা, যিনি মেয়েকে থামিয়ে দেননি।
একজন ভাই, যিনি ভয়ের বদলে সাহস দিয়েছেন। একজন স্বামী, যিনি সংসারকে দুজনের দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করেছেন। একজন সহকর্মী, যিনি একজন নারীর যোগ্যতাকে সম্মান করেছেন। এই মানুষগুলো হয়তো কোনো পুরস্কার পান না। কেউ তাঁদের নিয়ে সংবাদ লেখে না। কিন্তু একজন নারীর জীবনের গল্পে তাঁদের অবদান নীরবে থেকে যায়।
হয়তো পৃথিবী বদলে দেওয়ার জন্য সব সময় বড় কোনো বিপ্লবের প্রয়োজন হয় না। ছোট ছোট সহযোগিতায় কখনও কখনও একটি পরিবার বদলে যায়, কারণ একজন বাবা তাঁর মেয়েকে পড়তে দিয়েছিলেন।
একটি সংসার বদলে যায়, কারণ একজন স্বামী বলেছিলেন, ‘তোমার স্বপ্নও আমাদের পরিবারের স্বপ্ন।’
একটি সমাজ বদলে যায়, কারণ কিছু পুরুষ বুঝতে শেখেন—একজন নারীর সাফল্য তাঁদের অবস্থানকে ছোট করে না; বরং সেই সাফল্য তাঁদের পরিবার, তাঁদের সন্তান এবং তাঁদের ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করে। আর একজন পুরুষ যদি আজ এই লেখাটি পড়ে নিজের জীবনের কোনো নারীকে শুধু একটি কথাও বলেন,
‘তোমার স্বপ্নকে আমি সম্মান করি। এগিয়ে যাও।’ তাহলে হয়তো সেখান থেকেই শুরু হবে আরেকটি সাফল্যের গল্প।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক
রোদসী
ঢাকা/এসই/আরএস