পুরুষের বন্ধ্যাত্বের প্রধান কারণগুলো কী?

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সন্তান না হলে শুধু নারীকে দায়ী করার দিন শেষ। পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যাও হতে পারে এর অন্যতম কারণ। 


সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সুখবর আসছে না? এমন পরিস্থিতিতে অনেক দম্পতির উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরিবারের চাপও শুরু হয়। আর আমাদের সমাজে এখনো একটি প্রচলিত ধারণাসন্তান না হওয়ার কারণ নিশ্চয়ই নারীর কোনো সমস্যা।


এই ধারণা শুধু ভুল নয়, অনেক সময় চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি করায়।


সন্তান ধারণের প্রক্রিয়ায় নারী ও পুরুষদুজনেরই ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে শুধু নারীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।


পুরুষের বন্ধ্যাত্বের পেছনে থাকতে পারে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, শুক্রাণুর চলনক্ষমতা বা গঠনে সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অণ্ডকোষের কিছু সমস্যা, সংক্রমণ, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপানসহ নানা কারণ।

 

শুক্রাণুর সমস্যাসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি

 

পুরুষের প্রজননক্ষমতার সঙ্গে শুক্রাণুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু শুক্রাণু আছে কি না, সেটিই শেষ কথা নয়। শুক্রাণুর সংখ্যা, চলনক্ষমতা এবং গঠনতিনটিই গুরুত্বপূর্ণ।


আরোও পড়ুন: পুরুষের যৌনজীবন: যে ৭টি প্রশ্ন কাউকে জিজ্ঞেসকরতে পারেন না তিনি


শুক্রাণুর সংখ্যা কম হলে ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। আবার শুক্রাণুর সংখ্যা স্বাভাবিক হলেও যদি সেগুলোর চলনক্ষমতা কম থাকে, তাহলেও নিষেক বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গঠনেও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।




এ ধরনের সমস্যা বোঝার জন্য বীর্য পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষা। তবে একটি পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে পরীক্ষা পুনরায় করা বা আরও কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে।

 

১. অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া: 

 

অণ্ডথলির ভেতরের শিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়াকে ভ্যারিকোসিল বলা হয়। অনেক সময় এতে কোনো উপসর্গ থাকে না। আবার কারও অণ্ডথলিতে ভারী লাগা, অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে।


কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে ভ্যারিকোসিল অণ্ডকোষের কার্যকারিতা ও শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অণ্ডথলিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা দীর্ঘদিনের ব্যথা থাকলে ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।


২. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: 

 

পুরুষের প্রজননক্ষমতা শুধু যৌনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের বিভিন্ন হরমোনের সঠিক ভারসাম্য প্রয়োজন। টেস্টোস্টেরনসহ প্রজননের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের ভারসাম্যে সমস্যা হলে শুক্রাণু উৎপাদন কমে যেতে পারে।




এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকারনিজের ইচ্ছায় টেস্টোস্টেরন বা হরমোন গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে শরীরের পেশি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কিছু হরমোন বা স্টেরয়েড শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।


৩. অতিরিক্ত ওজন ও অনিয়মিত জীবনযাপন: 


অতিরিক্ত ওজন শুধু হৃদ্‌যন্ত্র বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় না; পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। শারীরিক পরিশ্রম না করা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অপর্যাপ্ত ঘুম, অনিয়মিত খাবার এবং দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয়।


তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পরিমিত ওজন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবারের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।


৪. ধূমপান, অ্যালকোহল ও মাদক: 


ধূমপান পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং কিছু মাদকও শুক্রাণুর সংখ্যা ও মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ধূমপান ও মাদক থেকে দূরে থাকা এবং অ্যালকোহল গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ।




এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সন্তান নেওয়া নয়দীর্ঘমেয়াদে নিজের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা।

 

৫. অতিরিক্ত তাপের প্রভাব: 


শুক্রাণু তৈরির জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের ভেতরের তাপমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। তাই দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকা কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণু তৈরির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।


তবে দৈনন্দিন জীবনের কোনো একটি তাপের উৎসকে সরাসরি বন্ধ্যাত্বের কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিষয়টি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

 

৬. সংক্রমণ ও যৌনবাহিত সংক্রমণ: 

 

কিছু সংক্রমণ পুরুষের প্রজনন অঙ্গে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা না করা কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণ পরবর্তীতে প্রজনন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণ হতে পারে।

 

যৌনাঙ্গে ঘা, অস্বাভাবিক স্রাব, প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথার মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা নয়, সচেতনতাই গুরুত্বপূর্ণ।

 

৭. জন্মগত বা শারীরিক সমস্যা: 

 

কিছু পুরুষের জন্মগতভাবেই প্রজনন অঙ্গ বা শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকতে পারে। আবার জীবনের কোনো পর্যায়ে অণ্ডকোষে আঘাত, অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেও প্রজননক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।

 

কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণু তৈরি হলেও তা স্বাভাবিক পথে বের হতে সমস্যা হয়।

 

তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোযৌনক্ষমতা স্বাভাবিক থাকা মানেই প্রজননক্ষমতাও স্বাভাবিকএমন নয়।


আরোও পড়ুন: রোমান্স, সেক্স ও পুরুষের মনস্তত্ত্ব

 

৮. কিছু ওষুধ ও চিকিৎসার প্রভাব: 

 

কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ এবং ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপি পুরুষের প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

 

তবে এ কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে বন্ধ করা যাবে না। সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা নিয়ে পরামর্শ দিতে পারেন।

 

৯. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ: 

 

মানসিক চাপকে পুরুষের বন্ধ্যাত্বের একমাত্র কারণ বলা ঠিক নয়। তবে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, অতিরিক্ত চাপ ও ঘুমের সমস্যা যৌনইচ্ছা, যৌনক্ষমতা এবং জীবনযাপনে প্রভাব ফেলতে পারে।

 

সন্তান নেওয়ার চেষ্টা যখন দীর্ঘ হয়, তখন দম্পতির ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই এই সময়ে একে অপরকে দোষারোপ না করে সহযোগিতা করা জরুরি।

 

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

 

নিয়মিত অসুরক্ষিত দাম্পত্য সম্পর্কের পরও এক বছর চেষ্টা করে গর্ভধারণ না হলে সাধারণত দম্পতির দুজনেরই প্রজননস্বাস্থ্য মূল্যায়নের কথা ভাবা উচিত। তবে নারীর বয়স বা আগে থেকে জানা কোনো প্রজনন-সংক্রান্ত সমস্যার মতো বিষয় থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।

 

পুরুষের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বীর্য পরীক্ষা, শারীরিক পরীক্ষা, হরমোন পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা দিতে পারেন।




 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোকারণ জানা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

 

কারও একার নয়, দুজনের গল্প

 

সন্তান না হওয়ার বিষয়টিকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে দেখার সময় শেষ। পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়েও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।

 

পুরুষের বন্ধ্যাত্ব মানেই পুরুষত্বের সমস্যা নয়। যৌনক্ষমতা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও প্রজনন-সংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে। আবার অনেক কারণই চিকিৎসাযোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

 

তাই সন্তান নেওয়ার পথে দোষারোপ নয়প্রয়োজন দুজনের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া, প্রয়োজনে পরীক্ষা করা এবং সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।

 

কারণ সন্তান চাওয়ার পথটি একজনের নয়এটি দুজনের একসঙ্গে এগিয়ে চলার গল্প।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad