বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, এখানকার পুরুষকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—তাকে শক্ত হতে হবে। পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে, বিপদে ভেঙে পড়া চলবে না,। একজন পুরুষকে যেকোন মূল্যে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। ‘পুরুষ মানুষ কাঁদে না’, ‘সংসারের হাল পুরুষকেই ধরতে হয়’—এ ধরনের সামাজিক বার্তা খুব ছোট বয়স থেকেই তার আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
তাই জীবনের কোনো পর্যায়ে যখন একজন পুরুষ নিজেকে দুর্বল, ব্যর্থ, অনিশ্চিত কিংবা নির্ভরশীল মনে করেন, তখন সেই অনুভূতি প্রকাশ করা তার জন্য সহজ হয় না। বিশেষ করে স্ত্রী যখন তার চেয়ে বেশি আয় করেন, তখন বিষয়টি শুধু অর্থের হিসাব থাকে না; অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় আত্মসম্মান, সামাজিক পরিচয়, পুরুষত্বের প্রচলিত ধারণা এবং নিজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
বলা যায়, অবশ্যই সব পুরুষের অভিজ্ঞতা এক নয়। স্ত্রী বেশি আয় করলেই একজন পুরুষ মানসিকভাবে অস্বস্তিতে থাকবেন—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষ এখনো ‘পুরুষই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী’—এই সামাজিক ধারণাকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য স্ত্রীর বেশি আয় করা মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
আয় কম হলেই কী পুরুষ নিজেকে ছোট মনে করেন?
বাস্তব জীবনে একজন স্ত্রীর স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, পেশাগত দক্ষতা কিংবা ক্যারিয়ারের সুযোগের কারণে অনেক পরিবারেই স্ত্রী প্রধান উপার্জনকারী হতে পারেন। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন আয়ের পার্থক্যকে পুরুষ নিজের ব্যক্তিগত সক্ষমতার মাপকাঠি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
‘আমি কি যথেষ্ট সফল?’
‘আমি কি সংসারের জন্য যথেষ্ট করতে পারছি?’
‘আমার স্ত্রী যদি আমার চেয়ে বেশি আয় করে, তাহলে পরিবারে আমার গুরুত্ব কতটা?’
‘শ্বশুরবাড়ি বা আত্মীয়রা কী ভাবছে?’
‘বন্ধুরা জানলে কী বলবে?’
এই প্রশ্নগুলো মুখে উচ্চারিত না হলেও মনে ঘুরতে পারে।
বিশেষ করে যে সমাজে পুরুষের পরিচয়ের সঙ্গে ‘উপার্জনক্ষমতা’ ও ‘পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া’কে শক্তভাবে যুক্ত করা হয়, সেখানে এই চাপ আরও বেশি হতে পারে।
স্ত্রীর আয় বেশি হলে মানসিক চাপ কেন বাড়তে পারে?
২০১৯ সালে প্রকাশিত Joanna Syrda-এর গবেষণাটি বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। Personality and Social Psychology Bulletin-এ প্রকাশিত গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের Panel Study of Income Dynamics-এর ২০০১–২০১৫ সালের তথ্য ব্যবহার করে ৬,০৩৫টি পরিবারের ১৯,৬৮৮টি পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, স্বামীদের মানসিক চাপ সবচেয়ে কম ছিল যখন স্ত্রী পরিবারের মোট আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ উপার্জন করতেন; এরপর স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করলে মানসিক চাপ আবার বাড়তে থাকে। স্ত্রী যখন সম্পূর্ণভাবে স্বামীর ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল—সেই অবস্থাতেও মানসিক চাপ বেশি ছিল। গবেষক এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে পুরুষের ‘breadwinner’ বা প্রধান উপার্জনকারী হওয়ার সামাজিক প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ‘কে কত টাকা আয় করছেন’—এতটা সরল নয়। আয়ের পার্থক্য একজন পুরুষ নিজের সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে কীভাবে দেখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
‘আমি তো পরিবারের পুরুষ’
একজন পুরুষের মনে হয়তো এমন একটি ধারণা কাজ করতে পারে—‘আমার স্ত্রী আমার চেয়ে বেশি আয় করছে মানে আমি কি তাহলে পরিবারের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারছি না?’ এখানে অর্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে পরিচয়ের প্রশ্ন। যে পুরুষ মনে করেন সংসারের আর্থিক দায়িত্ব নেওয়াই তার পুরুষত্বের অন্যতম প্রমাণ, তার কাছে স্ত্রীর বেশি আয় করা নিজের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে বলে মনে হতে পারে।
অন্যদিকে, যে দম্পতি আয়কে ‘আমার টাকা বনাম তোমার টাকা’ হিসেবে না দেখে ‘আমাদের পরিবারের আয়’ হিসেবে দেখেন, তাদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
তাই স্ত্রীর বেশি আয় নিজে সমস্যা নয়; আয় নিয়ে তৈরি সামাজিক ধারণা ও দাম্পত্যের ভেতরের ক্ষমতার সম্পর্ক অনেক সময় সমস্যার কারণ হতে পারে।
বাইরে আত্মবিশ্বাসী, ভেতরে অস্বস্তি
পুরুষের একটি বড় সমস্যা হলো—সে নিজের অস্বস্তি সবসময় প্রকাশ করতে পারে না। স্ত্রীর পদোন্নতি হয়েছে। বেতন বেড়েছে। সে হয়তো সত্যিই খুশি। স্ত্রীকে অভিনন্দনও জানাচ্ছেন। কিন্তু একই সময়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা, পিছিয়ে পড়ার ভয় কিংবা নিজের উপার্জন নিয়ে অস্বস্তিও থাকতে পারে।
এই দুই অনুভূতি একই সঙ্গে থাকা সম্ভব। একজন পুরুষ স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারেন, তার সাফল্যে গর্বিতও হতে পারেন, আবার নিজের অবস্থান নিয়েও অনিরাপদ বোধ করতে পারেন। মানুষের অনুভূতি সবসময় একরঙা নয়। গবেষণা বলছে, বিষয়টি সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে
২০২৪ সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত জার্মান দম্পতিদের ওপর একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব সম্পর্কে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন, সেখানে পুরুষদের জীবন, কাজ ও স্বাস্থ্যের সন্তুষ্টি তুলনামূলক কম ছিল।
আরেকটি গবেষণাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পুরুষদের নিয়ে একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, বিবাহিত পুরুষের ওপর ‘পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী’ হওয়ার সামাজিক প্রত্যাশা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, পুরুষের আর্থিক সংকট, সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রচলিত পৌরুষের আদর্শের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চাপ বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এখানে চীনের চিত্র ভিন্ন, স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলে দাম্পত্য সন্তুষ্টি কমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এবং স্বামীর সন্তুষ্টির পরিবর্তন দম্পতির সামগ্রিক বৈবাহিক সন্তুষ্টির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
ঢাকা/আরএস