মন ভেঙে দিয়ে যাওয়া মানুষটাই কেন জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ?

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

আমি জানি, সে আমার জন্য ভালো নয়। আমি জানি, সে আমার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। তবু দিনের শেষে কেন তার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? কেন মনে হয়, পৃথিবীতে সে-ই ছিল আমার একমাত্র ভালোবাসা?


এই প্রশ্নটি হয়তো আপনারও। হয়তো আপনার আশপাশের অসংখ্য মানুষেরও।


আমরা প্রায়ই ভাবি, ভালোবাসা মানেই সুখ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর কিছু ভালোবাসাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি কাঁদিয়েছে।


একজন মানুষ বছরের পর বছর অবহেলা করেছে, অসম্মান করেছে, প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে, বিশ্বাস নষ্ট করেছে। তবু তার একটি ফোনের অপেক্ষায় রাত জেগে থেকেছি।


একটি ‘কেমন আছ?’ শোনার জন্য হাজারো অপমান ভুলে গেছি।


কেন?


এই প্রশ্নের উত্তর শুধু হৃদয়ে নয়, মানুষের মস্তিষ্কেও লুকিয়ে আছে।


ভালোবাসা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়


একটি সম্পর্ক যত দীর্ঘ হয়, মানুষটি তত বেশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ঘুম থেকে ওঠা, কোনো সুখবর পাওয়া কিংবা কোনো কষ্টের মুহূর্ত—সবকিছুর সঙ্গে তার স্মৃতি জড়িয়ে যায়।


মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক শুধু মানুষকে নয়, মানুষকে ঘিরে তৈরি হওয়া অভ্যাসকেও ভালোবেসে ফেলে। তাই সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও সেই অভ্যাস শেষ হয় না। আপনি মানুষটিকে খুঁজছেন না; খুঁজছেন সেই পরিচিত অনুভূতিটাকে।


মাঝে মাঝে পাওয়া ভালোবাসা কেন এত শক্তিশালী?


অনেক সম্পর্কেই দেখা যায়, একদিন খুব যত্ন, তারপর কয়েক দিন অবহেলা। একদিন অনেক ভালোবাসা, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।


এই অনিয়মিত ভালোবাসা মানুষের মনে এক অদ্ভুত আসক্তি তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে Intermittent Reinforcement (ইন্টারমিটেন্ট রিইনফোর্সমেন্ট) বলা হয়।


যখন ভালোবাসা নিশ্চিত থাকে না, তখন মানুষ সেটি পাওয়ার জন্য আরও বেশি চেষ্টা করে। এ কারণেই বিষাক্ত সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসা অনেক সময় সুস্থ সম্পর্ক গড়ার চেয়েও কঠিন হয়ে যায়।


‘সে বদলে যাবে’—এই আশাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ


প্রায় প্রতিটি কষ্টের সম্পর্কেই একটি বাক্য থাকে—‘একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এই আশাটুকুই মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রাখে। আমরা বর্তমানকে নয়, ভবিষ্যতের কল্পনাকে ভালোবাসতে শুরু করি। আর সেই কল্পনা ভাঙতে ভাঙতেই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় চলে যায়।



আত্মসম্মান ভাঙতে ভাঙতে মানুষ নিজেকেই ভুলে যায়


যখন একজন মানুষ বারবার অপমানিত হয়, তখন সে শুধু কষ্টই পায় না; ধীরে ধীরে নিজের মূল্য নিয়েও সন্দেহ করতে শুরু করে।


সে ভাবে— ‘হয়তো আমিই যথেষ্ট ভালো নই।’ , ‘হয়তো আর একটু সহ্য করলে সব ঠিক হবে।’- এই ভাবনাগুলোই মানুষকে বিষাক্ত সম্পর্কের শিকল থেকে বের হতে দেয় না।


তাহলে কেন সে-ই একমাত্র ভালোবাসা মনে হয়?


কারণ, সে হয়তো আপনার জীবনের প্রথম বড় স্বপ্ন ছিল। হয়তো তার সঙ্গেই আপনি ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন। হয়তো তার জন্যই নিজের অনেক ইচ্ছা ছেড়ে দিয়েছিলেন।


তাই সম্পর্ক শেষ হলেও শুধু একজন মানুষকে হারান না; হারিয়ে ফেলেন নিজের কল্পিত ভবিষ্যৎকেও।


আর সেই শোক অনেক দীর্ঘ হয়।


মনোবিজ্ঞানীরা কী বলেন?


ব্রিটিশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন বোলবি (John Bowlby)-এর অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুযায়ী, মানুষ যাদের সঙ্গে গভীর আবেগগত বন্ধন তৈরি করে, তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অনেকটা নিজের একটি অংশ হারানোর মতো অনুভূতি তৈরি করতে পারে।


মনোবিজ্ঞানী সু জনসন (Sue Johnson) বলেন, মানুষ শুধু ভালোবাসা নয়, নিরাপদ আবেগগত সংযোগ খোঁজে। সেই সংযোগ ভেঙে গেলে মন অনেক সময় সেই মানুষটির কাছেই ফিরে যেতে চায়, যদিও সম্পর্কটি স্বাস্থ্যকর না-ও হতে পারে।


মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বেসেল ভ্যান ডার কোল্ক (Bessel van der Kolk) দেখিয়েছেন, দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত মানুষের মস্তিষ্কে এমন স্মৃতি তৈরি করতে পারে, যা যুক্তির চেয়ে অনুভূতিকে বেশি শক্তিশালী করে তোলে। তাই মানুষ জানে সম্পর্কটি ক্ষতিকর, তবু সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।


ভালোবাসা আর আত্মবিসর্জন এক নয়


অনেকেই মনে করেন, সবকিছু সহ্য করাই সত্যিকারের ভালোবাসা।


কিন্তু ভালোবাসা কখনোই নিজের সম্মান, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতা বিসর্জন দেওয়ার নাম নয়।


যে ভালোবাসা আপনাকে প্রতিদিন ছোট করে, আপনার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়, আপনার হাসি কেড়ে নেয়, আপনার স্বপ্ন ভেঙে দেয়—সেটি ভালোবাসা নয়।


সেটি এক ধরনের মানসিক বন্দিত্ব। যদি আপনি আজও তাকে ভুলতে না পারেন... তাহলে নিজেকে দোষ দেবেন না। মানুষকে ভুলতে সময় লাগে। কিন্তু একটি কথা মনে রাখবেন—


কাউকে ভুলতে না পারা মানেই তার কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি নয়।


অনেক সময় ভালোবাসার সবচেয়ে সাহসী রূপ হলো দূরে সরে যাওয়া।


পাঠকের জন্য কিছু প্রশ্ন


যে মানুষটিকে আপনি ভালোবাসেন, তিনি কি আপনার শান্তির কারণ, নাকি অশান্তির?


আপনি কি তাকে ভালোবাসেন, নাকি তাকে হারানোর ভয়কে?


আপনি কি সম্পর্কটি ধরে রেখেছেন ভালোবাসার জন্য, নাকি একাকীত্বের ভয়ে?


আপনার সন্তান বা প্রিয় মানুষ যদি এমন সম্পর্কে থাকত, আপনি কি তাকে একই পরামর্শ দিতেন?


এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো আপনাকে আপনার নিজের সত্যের কাছে নিয়ে যাবে।


রোদসীর কথা, হয়তো একদিন আপনি ফিরে তাকিয়ে বুঝবেন, যাকে আপনি জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ভেবেছিলেন, তিনি আসলে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিলেন।


ঢাকা/ইএসএ/আরএস

sidebar ad