সংসার, সাফল্য, দায়িত্বের ভিড়ে পুরুষের বন্ধুরা হারিয়ে যায় কোথায়?

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একসময় বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য বিশেষ কোনো উপলক্ষ লাগত না। অফিস শেষে চায়ের দোকানে আড্ডা, হঠাৎ কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা, গভীর রাতে ফোন করে মনের কথা বলা কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই একসঙ্গে হাসাহাসি—এসবই ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ।


তারপর ধীরে ধীরে জীবন বদলে গেল। চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে, সন্তান, বাড়ির ঋণ, পরিবারের দায়িত্ব—সবকিছুর ভিড়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময় কমে এল। ফোনে কথা বলার ব্যবধান বাড়ল। কারও সঙ্গে মাসের পর মাস যোগাযোগ হয় না, কারও সঙ্গে দেখা হয় শুধু ঈদে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে।


একসময় যাঁরা জীবনের অনেকটা জুড়ে ছিলেন, তাঁরা এখন যেন দূরের মানুষ। এটি কি বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিণতি? নাকি দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে পুরুষেরা অজান্তেই নিজেদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে ফেলেন?


দায়িত্ব বাড়ে, নিজের জন্য সময় কমে


আমাদের সমাজে একজন পুরুষের জীবনের সাফল্য বলতে সাধারণত তাঁর পেশাগত উন্নতি, আর্থিক সচ্ছলতা, বাড়ি-গাড়ি কিংবা সন্তানের প্রতিষ্ঠাকে বোঝানো হয়। নিজের পরিবারকে ভালো রাখা, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য তাঁকে নিরন্তর চেষ্টা করতে হয়। এই চেষ্টার মধ্যে ব্যক্তিগত আনন্দের অনেক কিছুই পিছিয়ে যায়। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা বাতিল হয়, পুরোনো শখের জন্য সময় পাওয়া যায় না, নিজের পছন্দের কাজগুলোও একসময় অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে।


প্রথমদিকে মনে হয়, এখন ব্যস্ত সময় যাচ্ছে; পরে সময় পাওয়া যাবে। সন্তান একটু বড় হলে, ব্যবসা স্থিতিশীল হলে কিংবা অবসরের পর আবার বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো যাবে।


কিন্তু জীবন সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। দায়িত্বের একটি পর্যায় শেষ হলে আরেকটি দায়িত্ব এসে দাঁড়ায়। সন্তান বড় হয়, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা শুরু হয়। কর্মজীবনে অভিজ্ঞতা বাড়ে, কিন্তু দায়িত্বও বাড়তে থাকে।


এভাবে একসময় দেখা যায়, পরিবারের জন্য সবকিছু করতে গিয়ে নিজের সামাজিক জীবনটুকু প্রায় হারিয়ে গেছে।


পুরুষ কি বন্ধুর কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেন?


বন্ধুত্ব শুধু আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সম্পর্ক নয়। জীবনের কঠিন সময়েও একজন মানুষ যেন নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারেন, সেটিও বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু অনেক পুরুষের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা সহজ নয়। ব্যবসায় ক্ষতি হলে, চাকরি হারানোর ভয় তৈরি হলে, দাম্পত্যে সমস্যা দেখা দিলে কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তাঁরা অনেক সময় এসব কথা চেপে রাখেন।


কারও মনে হতে পারে, নিজের সমস্যার কথা বললে বন্ধুরা তাঁকে দুর্বল ভাববে। কেউ আবার ভাবেন, প্রত্যেকেই নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত; অন্যকে বিরক্ত করে লাভ কী?- ফলে যোগাযোগ কমতে কমতে একসময় বন্ধুত্বের সম্পর্কটিও আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়ে।


অথচ বন্ধুর কাছে নিজের সমস্যার কথা বলা মানেই সমাধান চাওয়া নয়। কখনো শুধু এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হয়, যিনি বিচার না করে কথাগুলো শুনবেন। যাঁর সামনে নিজের সাফল্যের গল্প সাজিয়ে বলতে হবে না, ব্যর্থতা লুকাতে হবে না কিংবা সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে হবে না। এমন সম্পর্ক মানুষের জীবনে মানসিক সমর্থনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।


সংসার ও বন্ধুত্ব—একটিকে বেছে নিতে হবে কেন?


বিয়ের পর বন্ধুত্বের গুরুত্ব কমে যাওয়া অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। পরিবারকে সময় দিতে হবে, জীবনসঙ্গীর প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে, সন্তানদের বড় করতে হবে—এসবই বাস্তব প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া আর বন্ধুত্বকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া এক বিষয় নয়।


একজন পুরুষের জীবনসঙ্গী তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ হতে পারেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁর অন্য কোনো বন্ধুত্বের প্রয়োজন নেই। মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ধরন ভিন্ন হতে পারে। কারও কাছে বন্ধু মানে পুরোনো সহপাঠী, কারও কাছে সহকর্মী, আবার কারও কাছে এমন একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।


সুস্থ বন্ধুত্ব বজায় রাখতে পরিবারের দায়িত্ব অবহেলা করতে হয় না। বরং নিজের জন্য কিছু সময় রাখা এবং সামাজিক সম্পর্কের যত্ন নেওয়া ব্যক্তিগত জীবনে ভারসাম্য আনতে পারে।


একইভাবে জীবনসঙ্গীর বন্ধুত্ব, ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সামাজিক যোগাযোগকেও সম্মান করা জরুরি। পারস্পরিক আস্থা থাকলে দুজনেরই নিজস্ব সম্পর্কের পরিসর থাকতে পারে।


বন্ধুত্ব কি শুধু পুরোনো স্মৃতির জন্য?


অনেক সময় পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে কথাবার্তা সীমাবদ্ধ থাকে অতীতের স্মৃতিতে। কে কোথায় পড়তেন, কার জীবনে কী ঘটেছিল, কোন শিক্ষক কেমন ছিলেন—এসব আলোচনা আনন্দ দেয়। কিন্তু বর্তমান জীবনের কথাগুলো আর বলা হয় না। অথচ বন্ধুত্বকে জীবন্ত রাখতে বর্তমানের মানুষটিকেও জানতে হয়।


একজন বন্ধু এখন কী নিয়ে চিন্তিত, কী নিয়ে আনন্দিত, তাঁর জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে—এসব বিষয়ে আগ্রহ দেখানো সম্পর্ককে নতুন করে গভীর করতে পারে। সব বন্ধুত্ব আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকবে না। জীবনের পথ বদলালে মানুষের আগ্রহ, মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকারও বদলায়। কিছু সম্পর্ক দূরে সরে যাবে, কিছু সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে উঠবে। এটি স্বাভাবিক।


তবে যে সম্পর্কগুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও রয়েছে। শুধু অন্যজন ফোন করবেন বলে অপেক্ষা না করে নিজে থেকে খোঁজ নেওয়া, দেখা করার উদ্যোগ নেওয়া কিংবা ব্যস্ত বন্ধুকে ছোট্ট একটি বার্তা পাঠানো দিয়েও যোগাযোগ ধরে রাখা যায়। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন আন্তরিকতা এবং যোগাযোগ বজায় রাখার ইচ্ছা।


নিজের জীবনে বন্ধুত্বের জায়গা ফিরিয়ে আনুন


আপনার বয়স চল্লিশ, পঞ্চাশ কিংবা ষাট—যাই হোক, বন্ধুত্বের জন্য নতুন করে সময় বের করা অসম্ভব নয়। হয়তো আগের মতো হঠাৎ করে বেরিয়ে পড়া সম্ভব হবে না। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন অভ্যাস তৈরি করা যায়। মাসে একদিন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। পুরোনো কোনো বন্ধুকে ফোন করে তাঁর খোঁজ নেওয়া যায়। একই আগ্রহের মানুষের সঙ্গে বই, খেলাধুলা, ভ্রমণ, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক কাজের সূত্রে পরিচিত হওয়া যায়। বন্ধুত্বের পরিসর বড় করতেই হবে, এমন নয়। অল্প কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কও মূল্যবান হতে পারে।


তবে বন্ধুত্ব যেন পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসের জায়গা হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। যে সম্পর্ক নিয়মিত অপমান, ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা কিংবা মানসিক চাপ তৈরি করে, তা শুধু পুরোনো পরিচয়ের কারণে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই।


নিজের সামাজিক জীবনের যত্ন নেওয়া মানে নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং পরিবার, কাজ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া। একজন পুরুষের জীবন শুধু তাঁর পেশাগত পরিচয়, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা সামাজিক সাফল্যের হিসাব নয়। তিনি একজন মানুষ, যাঁর হাসি, আনন্দ, আগ্রহ, স্মৃতি এবং নিজের মতো করে কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে।


বয়স বাড়ার সঙ্গে জীবনের অনেক কিছু বদলে যায়। সময়ের অভাবে কিছু বন্ধুত্ব দূরে সরে যায়, কিছু সম্পর্কের ধরন পাল্টে যায়। কিন্তু বন্ধুত্বের প্রয়োজন যে ফুরিয়ে যায়, তা নয়।


কখনো হয়তো বহুদিন যোগাযোগ না থাকা বন্ধুটিকে ফোন করার জন্য বিশেষ কোনো কারণের প্রয়োজন নেই। শুধু বলা যায়, ‘কী খবর? অনেক দিন কথা হয় না।’


এই সামান্য উদ্যোগেই হয়তো আবার শুরু হতে পারে এমন একটি সম্পর্ক, যার জন্য জীবনের ব্যস্ত দিনগুলোতে অনেক দিন ধরেই মন অপেক্ষা করছিল।

sidebar ad