পর্দায় আবু বকরের মতো স্বামী পেলে মন্দ হয় না—এমনটাই মনে করছেন পাকিস্তানি সিরিয়াল ‘দার-ই-নিজাত’-এর অনেক নারী দর্শক। পাকিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে চরিত্রটি। সঙ্গীর পছন্দ-অপছন্দ মনে রাখা, নিঃশব্দে ভালোবাসা এবং সব সময় পাশে থাকার মানসিকতা—সব মিলিয়ে অনেকের চোখে আবু বকর যেন আদর্শ জীবনসঙ্গী। তবে চরিত্রটির মধ্যে শুধু ভালো মানুষ হওয়ার গল্প নেই, রয়েছে অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজেকে উপেক্ষা করার প্রবণতাও।
এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন চরিত্রটির অজানা দিক।
একজন আদর্শ স্বামী কেমন হন? যিনি সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনেন, ছোটখাটো পছন্দ মনে রাখেন, বিপদে পাশে দাঁড়ান, নাকি যিনি ভালোবাসার কথা মুখে না বলেও আচরণে বুঝিয়ে দেন? পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’-এর আবু বকরকে দেখে দর্শকেরা যেন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। চরিত্রটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা। অনেক নারী দর্শক তাঁকে আদর্শ স্বামী হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ বাস্তব জীবনেও এমন জীবনসঙ্গী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন।
আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাকিস্তানি অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার। বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কের উপস্থাপক হারুন রশিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, দর্শকের কাছে আবু বকর যতটা নিখুঁত, তার ব্যক্তিত্বের ভেতরে রয়েছে কিছু দুর্বলতাও।
সবার পছন্দের মানুষ হতে চান আবু বকর
শেহরিয়ারের মতে, আবু বকরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সে সবাইকে খুশি রাখতে চায়। কাউকে ‘না’ বলতে তার অসুবিধা হয়। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের ইচ্ছা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে পারে না।
চরিত্রটির সঙ্গে নিজেরও মিল খুঁজে পান শেহরিয়ার। তাঁর কথায়, তিনিও অনেক সময় অন্যদের খুশি রাখতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেন।
আবু বকরের মধ্যে রয়েছে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’। অর্থাৎ, অন্যের সমস্যা সমাধান করা কিংবা সবাইকে বিপদ থেকে রক্ষা করার অতিরিক্ত প্রবণতা। সে যেন সব সময় অন্যদের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে চায়।
এই বৈশিষ্ট্যই চরিত্রটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে। কারণ, বাস্তব জীবনেও অনেক মানুষ অন্যের ভালো করতে গিয়ে নিজের ওপর অজান্তেই বাড়তি চাপ তৈরি করেন।
মায়ের শেখানো মূল্যবোধ, নাকি বাড়তি চাপ?
আবু বকরের ব্যক্তিত্ব গঠনে তার মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন শেহরিয়ার। ছোটবেলা থেকেই মা তাকে নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধ শিখিয়েছেন। কোনটি ঠিক, কোনটি ভুল—সেসব বিষয়ে সব সময় সচেতন করেছেন।
ফলে বড় হওয়ার পরও সব সময় সঠিক কাজটি করার একটা চাপ তার মধ্যে কাজ করে। কাউকে কষ্ট দেওয়া কিংবা অন্যের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়া তার কাছে সহজ নয়।
শেহরিয়ারের ভাষায়, ‘একবার ভাবুন, এই মানুষকে কতটা চাপ নিয়ে বাঁচতে হয়।’
অর্থাৎ, আবু বকরের অতিরিক্ত ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে যেমন পারিবারিক শিক্ষার ভূমিকা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নিজের ওপর তৈরি করা একধরনের মানসিক চাপ।
জারিয়াবকে ভালোবাসতেন, কিন্তু বলতেন না
আবু বকরকে নিয়ে দর্শকের আগ্রহের বড় কারণ জারিয়াবের প্রতি তার ভালোবাসা। শেহরিয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জারিয়াবের প্রতি আবু বকরের ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। মায়ের সঙ্গে জারিয়াবের বাড়িতে যাতায়াতের সময় থেকেই মেয়েটির প্রতি আকর্ষণ জন্মায় তার।
কিন্তু নিজের অনুভূতির কথা কখনো সরাসরি প্রকাশ করেনি আবু বকর। বরং আড়াল থেকে জারিয়াবকে দেখত। জারিয়াব ও আবু বকরের ব্যক্তিত্বেও রয়েছে বেশ পার্থক্য। বিপরীত স্বভাবের এই দুই মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আবু বকর নিজেও ছিল দ্বিধায়। মন যা চাইছে, বাস্তবতা হয়তো সে পথে এগোতে দেবে না—এমন ভাবনাও কাজ করত তার মধ্যে।
পাস্তার পছন্দেই লুকিয়ে ছিল ভালোবাসা
আবু বকরের ভালো লাগার বিষয়টি দর্শকের কাছে স্পষ্ট করতে অভিনয়ের মধ্যেও নানা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রেখেছিলেন শেহরিয়ার। এর মধ্যে একটি দৃশ্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
একবার দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে আবু বকর জারিয়াবকে বলেছিল, ‘তুমি পাস্তা পছন্দ করো, তা-ই না?’
জারিয়াব জানতে চেয়েছিল, সে কীভাবে জানল। আবু বকর উত্তর দিয়েছিল, ‘কিশওয়ার খালা একবার বলেছিলেন।’
শেহরিয়ারের মতে, কাউকে ভালো না লাগলে তার পছন্দের খাবারের কথা এভাবে মনে রাখার কথা নয়। ভালোবাসার মানুষ সম্পর্কে ছোটখাটো তথ্য মনে রাখার মধ্য দিয়েও অনুভূতি প্রকাশ পায়।
অভিনেতার ভাষায়, ‘আমি এমন অনেক ইঙ্গিত ছড়িয়ে দিয়েছি।’
এই দৃশ্যের মতো ছোট ছোট মুহূর্তই আবু বকরকে দর্শকের কাছে আলাদা করে তুলেছে। বড় কোনো প্রেমের ঘোষণা নয়, বরং প্রিয় মানুষের পছন্দ মনে রাখা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা—এসবের মধ্যেই চরিত্রটির ভালোবাসার প্রকাশ।
অতিরিক্ত ভালো মানুষ, নাকি বাস্তবেরই প্রতিচ্ছবি?
আবু বকরকে নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। তার অতিরিক্ত ভালোমানুষি অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হয়েছে। বাস্তব জীবনে কি সত্যিই এমন মানুষ পাওয়া যায়, যে সব সময় অন্যের কথা ভাববে, নিজের ইচ্ছাকে পেছনে রাখবে?
তবে অভিনেত্রী নাদিয়া আফগান চরিত্রটির পক্ষেই কথা বলেছেন। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর স্বামীর মধ্যেও আবু বকরের মতো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই চরিত্রটির আচরণ তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়নি।
আবু বকরের জনপ্রিয়তার পেছনে সম্ভবত কাজ করছে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের কিছু সহজ প্রত্যাশা। সবাই চান এমন একজন সঙ্গী, যিনি তাঁর কথা শুনবেন, পছন্দ-অপছন্দ মনে রাখবেন এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকবেন।
তবে সব সময় সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা যে আদর্শ সম্পর্কের একমাত্র শর্ত নয়, সেটিও চরিত্রটির মধ্য দিয়ে বোঝা যায়। নিজের অনুভূতি, ইচ্ছা ও সীমারেখাকে গুরুত্ব দেওয়াও একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য জরুরি।
সব মিলিয়ে আবু বকরকে ঘিরে দর্শকের উচ্ছ্বাসের কারণ শুধু তার ভালোবাসার ধরন নয়; বরং ভালোবাসার ছোট ছোট প্রকাশ, দায়িত্ববোধ ও যত্নশীলতা। পর্দার এই চরিত্রটি হয়তো নিখুঁত নয়, কিন্তু তার আচরণের কিছু বৈশিষ্ট্য দর্শকের মনে বাস্তব জীবনের একটি কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের ছবি এঁকে দিয়েছে। আর সে কারণেই পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শকের কাছেও আবু বকর হয়ে উঠেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।