ইরানে নারীর হিজাব নিয়ে নতুন রাজনৈতিক লড়াই

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধের ক্ষত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের উত্তেজনা যখন চরমে, তখন ইরানের রাস্তায় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। সরকারের সমর্থনে আয়োজিত বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে এমন নারীদেরও দেখা যায়, যাদের মাথায় বাধ্যতামূলক হিজাব নেই। শুধু রাস্তায় নয়, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রচারিত ছবিতেও উঠে আসে হিজাবহীন নারীদের উপস্থিতি। যুদ্ধের সেই সময়ে যেন রাষ্ট্রের কাছে পোশাকের বিধিনিষেধের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল জাতীয় ঐক্যের বার্তা। 


সাম্প্রতিক মাসগুলোর ঘটনাপ্রবাহে ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতির একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে। সংঘাতের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে সরকারপন্থী সমাবেশে হিজাবহীন নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও তাদের উপস্থিতি প্রচার করেছে।


ইরানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম Iran International বলছে, সেই সময়ের দৃশ্যকে বাধ্যতামূলক হিজাবনীতি থেকে স্থায়ী সরে আসা হিসেবে দেখার চেয়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। জাতীয় ঐক্য ও ব্যাপক জনসমর্থনের ছবি তুলে ধরতে তখন পোশাকের প্রশ্নে তুলনামূলক নমনীয়তা দেখা গিয়েছিল।


কিন্তু যুদ্ধের আবহ কিছুটা কমতেই রক্ষণশীল মহলের চাপ বেড়েছে। জুলাইয়ে শুক্রবারের নামাজের খুতবায় কয়েকজন ধর্মীয় নেতা প্রকাশ্যে হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানান। এরপর তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়।


ক্যাফে থেকে পোশাকের দোকান—কঠোর হচ্ছে অভিযান


সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, পোশাকের দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 


তেহরানের প্রসিকিউটর আলী সালেহি ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও পোশাকের দোকানে ‘জনশালীনতার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড’ এবং অপ্রচলিত পোশাক বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু ব্যক্তিগতভাবে হিজাব না পরা নারীদের নয়, তাদের সেবা দেওয়া বা এমন পোশাকের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এখন প্রশাসনের নজরে। সাম্প্রতিক সময়ে ১৫টির বেশি শহরে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার খবর এসেছে।


তেহরানেই কয়েকটি ক্যাফে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও অভিযোগ ছিল, কর্মী বা ক্রেতারা হিজাববিধি মানছেন না; কোথাও আবার ‘ইসলামি মূল্যবোধ’ লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এমনকি নারীদের মোটরসাইকেল চালানো নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংস্কারপন্থী দৈনিক Shargh প্রশ্ন তুলেছে, নারীদের মোটরসাইকেল লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আপত্তির আসল কারণ সড়ক নিরাপত্তা নয়, বরং তারা মোটরসাইকেলে কী পোশাক পরবেন—সেটিই কি মূল বিষয়?


ইরানের রক্ষণশীল রাজনীতিকদের কাছে বাধ্যতামূলক হিজাব কেবল নারীর পোশাকের প্রশ্ন নয়। এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শ ও সামাজিক কাঠামোর অংশ। কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-তাকি নকদালি সম্প্রতি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, হিজাব আইন বাস্তবায়ন না করার কারণে সমাজে ‘অশালীনতা’ ছড়িয়ে পড়ছে। রক্ষণশীল মহলের একটি অংশ এমনও মনে করছে, হিজাবের শিথিলতা ইরানের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির চেয়েও বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।


কাইহান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারিও হিজাবকে রাষ্ট্রের আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে বিষয়টি এখন কেবল নারী-পুরুষের পোশাকের স্বাধীনতার বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্র, ধর্ম ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।


এই বিতর্কে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক। তিনি মানুষের আচরণ আইন দিয়ে জোর করে পরিবর্তন করার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং হিজাব আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।


তবে এর অর্থ এই নয় যে পেজেশকিয়ান বাধ্যতামূলক হিজাবের আইন বাতিল করেছেন। বরং ২০২৪ সালে অনুমোদিত কঠোর ‘হিজাব ও সতীত্ব আইন’-এর বাস্তবায়ন স্থগিত রয়েছে। 


এর মধ্যেই ইরানের বড় শহরগুলোর রাস্তায় ক্রমশ বেশি সংখ্যক নারী হিজাব ছাড়া চলাফেরা করছেন। তেহরান, শিরাজসহ বিভিন্ন শহরে তরুণীদের স্কুটার বা মোটরসাইকেল চালানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই মাথায় হেলমেট পরছেন, কিন্তু হিজাব পরছেন না।


রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও তেহরানের রাস্তায় হিজাব ছাড়া নারীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান হওয়ার কথা উঠে এসেছে।


এই পরিবর্তন ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের পর থেকে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। আইন পুরোপুরি উঠে না গেলেও বহু নারী বাস্তবে তা অমান্য করে চলেছেন।


ইরানের মিডিয়া ও মিডিয়াকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক পরিসরে হিজাব বিতর্কের দুটি বিপরীত বয়ান স্পষ্ট।


রক্ষণশীল বয়ান


হিজাবকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পরিচয় ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পক্ষের যুক্তি—রাষ্ট্র যদি হিজাব আইন প্রয়োগে পিছিয়ে যায়, তাহলে তা শুধু পোশাকের স্বাধীনতা নয়; বরং সমাজের ‘নৈতিক অবক্ষয়’ ও রাষ্ট্রের আদর্শগত দুর্বলতার পথ খুলে দেবে। Kayhan ও কট্টরপন্থী অনলাইন প্রচারে এই অবস্থান সবচেয়ে জোরালো।


সংস্কারপন্থী ও সমালোচনামূলক বয়ান


অন্যদিকে Shargh-এর মতো সংস্কারপন্থী সংবাদমাধ্যম ও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—আইন করে মানুষের পোশাক ও ব্যক্তিগত আচরণ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? নারীদের মোটরসাইকেল চালানো থেকে ক্যাফে বন্ধ—এসব পদক্ষেপকে অনেকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখছেন। 


Iran International-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর আইন প্রয়োগের চেষ্টা উল্টো আরও বেশি নারীকে আইন অমান্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা রক্ষণশীল মহলের ভেতরেও কেউ কেউ প্রকাশ করেছেন।


ইরানের সামনে এখন একটি কঠিন সমীকরণ। একদিকে রক্ষণশীলরা হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ মানতে চাইছে না। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও কঠোর প্রয়োগের সামাজিক পরিণতি নিয়ে সতর্ক। আর রাষ্ট্রের সামনেই রয়েছে ২০২২ সালের বিক্ষোভের স্মৃতি।


তাই যুদ্ধের সময় হিজাবহীন নারীদের রাষ্ট্রীয় মিছিলে উপস্থিতি হয়তো কোনো স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত ছিল না। বরং তা ছিল সেই মুহূর্তের রাজনৈতিক প্রয়োজন। কিন্তু রাস্তায় নারীদের বদলে যাওয়া আচরণও আর সাময়িক কোনো ঘটনা নয়।


ইরানের হিজাব বিতর্ক তাই এখন একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—রাষ্ট্র কি আবার আইন দিয়ে নারীদের পোশাক নিয়ন্ত্রণের পুরোনো মডেলে ফিরবে, নাকি বাস্তব সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে কোনো নতুন সমঝোতার পথ খুঁজবে?


উত্তরটি শুধু ইরানের নারীদের ভবিষ্যৎ নয়, দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের আগামী রাজনৈতিক গতিপথও অনেকটা নির্ধারণ করতে পারে।

sidebar ad