বাথরুমে ঢোকার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা টয়লেটে মলত্যাগের সময় স্ট্রোকের ঘটনা এমন খবর প্রায়ই মানুষের মনে ভয় তৈরি করে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করা, মাথায় প্রথমে পানি ঢালা কিংবা মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়াকে অনেকে স্ট্রোকের কারণ মনে করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলে?
চিকিৎসকদের মতে, বাথরুমে গেলেই স্ট্রোক হয় না। তবে কিছু পরিস্থিতিতে আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির স্ট্রোক বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক তথ্য ও সতর্কতা।
বাথরুমে স্ট্রোকের সম্ভাব্য কারণ
১. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া: কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে জোরে চাপ দিলে শরীরের ভেতরের চাপ ও রক্তচাপ সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপের সঙ্গে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে না।
২. অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
৩. অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পানির প্রভাব: হঠাৎ খুব ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত গরম পানিতে রক্তচাপ কমে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলেই স্ট্রোক হয় এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
৪. ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ দাঁড়ানো: কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শোয়া অবস্থা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে মাথা ঘুরতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৫. আগে থেকে থাকা রোগ: হৃদ্রোগ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মস্তিষ্কের রক্তনালির অস্বাভাবিকতা, ধূমপান ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বিষয় স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কী করবেন:
নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে পর্যাপ্ত পানি ও আঁশযুক্ত খাবার খান।
গোসলের সময় আরামদায়ক কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।
ঘুম থেকে উঠে ধীরে ধীরে বসুন, তারপর দাঁড়ান।
মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা থাকলে একা গোসল করবেন না।
চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করুন।
কী করবেন না:
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত জোরে চাপ দেবেন না।
হঠাৎ খুব ঠান্ডা বা অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল শুরু করবেন না।
মাথা ঘুরলে জোর করে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করবেন না।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসা করে সময় নষ্ট করবেন না।
কখন গোসল করা সবচেয়ে ভালো:
গোসলের জন্য সকাল, দুপুর বা বিকেলের মধ্যে কোনো একটি সময়কে সবার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে প্রমাণ করা হয়নি।
আপনি যে সময় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সে সময়ই গোসল করতে পারেন।
তবে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো করে গোসল না করাই ভালো, বিশেষ করে মাথা ঘোরা বা রক্তচাপের সমস্যা থাকলে।
শরীর স্বাভাবিক হতে কিছুক্ষণ সময় দিন। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পানি এড়িয়ে আরামদায়ক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন। বয়স্ক বা ভারসাম্যজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের বাথরুমে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলে কী করবেন:
হঠাৎ মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টির সমস্যা অথবা আকস্মিক তীব্র মাথাব্যথা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন। লক্ষণ কয়েক মিনিট পর সেরে গেলেও অবহেলা করবেন না। নিজে থেকে অ্যাসপিরিন খাওয়াবেন না, কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলেও স্ট্রোকের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
বাথরুমে স্ট্রোকের ভয় থেকে স্বাভাবিক গোসল বা টয়লেটের অভ্যাস বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ, নিরাপদে গোসল এবং স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে।