দেবীর প্রতিমায় পতিতালয়ের মাটি: শতাব্দীর লোকবিশ্বাস, নাকি সমাজের দ্বিচারিতার আয়না?

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রচলিত রীতি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। যে সমাজ যৌনকর্মীদের অবজ্ঞার চোখে দেখে, সেই সমাজেরই দেবী দুর্গার প্রতিমায় তাঁদের বসতির মাটির বিশেষ তাৎপর্য কেন?



ইতিহাস কী বলে?

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। তবে ঠিক কবে থেকে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের রীতি শুরু হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এটি মূলত প্রচলিত লোকাচার: সব অঞ্চলে বা সব প্রতিমা নির্মাণে এই রীতি অনুসরণ করা হয় না।


প্রচলিত গল্পের একটি উদাহরণ:

একটি জনপ্রিয় লোককাহিনি অনুসারে, একদিন কয়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে এক অসহায় কুষ্ঠরোগীকে সাহায্য করেন। কথিত আছে, ওই ব্যক্তি ছিলেন স্বয়ং শিব। তাঁদের মানবিক আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি বর দিতে চাইলে নারীরা নিজেদের উঠোনের মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির বর চান।


শিব তাঁদের সেই বর দেন এমনটাই গল্পটির একটি সংস্করণে বলা হয়। আরেকটি বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যায় বলা হয়, সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্র’ পুরুষেরা যৌনপল্লিতে গিয়ে নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে আসেন। ফলে সেই মাটি পুণ্যময় হয়ে ওঠে। তবে এই ব্যাখ্যারও নিশ্চিত শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত নয়।


লোকবিশ্বাসের আড়ালে বড় প্রশ্ন:

এই প্রথার মধ্যে অনেকে সমাজের দ্বিচারিতার প্রতীক খুঁজে পান। যে নারীদের সমাজ দূরে সরিয়ে রাখে, তাঁদের অস্তিত্বকেই আবার ধর্মীয় আচারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু প্রতিমায় তাঁদের বসতির মাটি ব্যবহার করলেই কি তাঁদের প্রতি সামাজিক অবজ্ঞা দূর হয়?


দেবী দুর্গা নারীশক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে: প্রতিরোধের প্রতীক। অথচ বাস্তবের নারীকে তাঁর পেশা, অতীত কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে অসম্মান করা হলে নারীশক্তির আরাধনা কতটা অর্থবহ থাকে?


পতিতালয়ের মাটি নিয়ে প্রচলিত গল্পগুলো প্রমাণিত ইতিহাস না হলেও, এগুলো আমাদের সমাজের মূল্যবোধ নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়।ধর্মীয় আচার শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়,তা মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও আয়না হতে পারে। দেবীর প্রতিমায় কোন মাটি ব্যবহার হলো, তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন যে নারীকে সমাজ অবহেলা করে, তাঁকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে সেই সমাজ কতটা প্রস্তুত?

sidebar ad