ট্রল থেকে ট্রেন্ডিং, ট্রেন্ডিং থেকে ব্লকবাস্টার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একসময় অ্যানিমেশন মানেই ছিল রঙিন কিছু কার্টুন চরিত্র আর শিশুদের জন্য বানানো গল্প। সময় বদলেছে। অ্যানিমেশন সিনেমার জগৎ এখন এমন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি ভালো গল্পের পাশাপাশি থাকা চাই দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল, নিখুঁত অ্যানিমেশন, অসাধারণ সাউন্ড ডিজাইন আর এমন নির্মাণশৈলী, যা দেখে মনে হবে; এটা সিনেমা নয়, যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে কোনো স্বপ্নের পৃথিবী।


প্রতিটি চরিত্রের চোখের পলক থেকে শুরু করে বাতাসে দুলতে থাকা চুল কিংবা পানির ঢেউ; সকল খুঁটিনাটি এত নিখুঁত ও জীবন্ত করে তোলা হয় যে, পর্দায় কোথায় বাস্তব আর কোথায় অ্যানিমেশন, সেই পার্থক্য করাই কঠিন হয়ে পড়ে।


এই যখন অ্যানিমেশন দুনিয়ার বর্তমান হালচিত্র, তখন চীনে ঘটে গেল ঠিক তার উল্টো এক ঘটনা। স্রোতের বিপরীতে যেয়ে মুক্তি পেলো এমন একটি অ্যানিমেশন সিনেমা, যার ভিজ্যুয়াল দেখে চোখ ধাঁধায়নি, বরং কপালে উঠেছে—মুগ্ধতায় নয়, বিস্ময়ে! গল্পে ডুবে যাওয়ার বদলে দর্শক খুঁজেছেন তার যুক্তি, আর প্রশংসার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভেসেছে ট্রল আর মিমে।


সিনেমাটির নাম 'নিউ লাই (niu lai)'


যার শিরোনামের মোটামুটি অনুবাদ করলে দাঁড়ায় 'ষাঁড় আসছে'।  ৮৬ মিনিটের এই ফিচারটি মূলত একটি ভীরু বাছুর- নিউ লাই এর গল্প। পরিবার ও দলের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এই ভীতু প্রাণীটি একসময় প্রবেশ করে এক অদ্ভুত স্বপ্নের জগতে। সেখানে তার দেখা হয় এক  স্কাইলার্ক এর সঙ্গে। বাছুরটির সঙ্গে স্বপ্নময় ভ্রমণে সঙ্গী হয় ইউঙ্কুই নামের সেই স্কাইলার্ক এবং বাওলা নামের এক চিতা। শুরু হয় বন্ধুত্ব, বিপদ, ভয় আর বিচ্ছেদের এক যাত্রা। সেই যাত্রাপথেই নিউ লাই ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে; সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়, বরং ভয়কে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়া। 


মা ও ছেলের এক জুটি টানা পাঁচ বছর ধরে পরিকল্পনা করে এই প্রকল্পটি তৈরি করেছেন।


শিন ইউমেং এবং তার মা সান লিফাং, দুজন মিলে পুরো চলচ্চিত্রটি তৈরি করেন। প্রাক্তন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার শিন- এর চলচ্চিত্র বিষয়ক নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তিনি নিজেই এটি পরিচালনা, থ্রিডি মডেলিং, অ্যানিমেশন এবং সম্পাদনা করেছেন, এমনকি পুরুষ চরিত্রগুলোর কণ্ঠ দিয়েছেন। সান সাউন্ডট্র্যাক রচনা করেন এবং থিম সং-এ কণ্ঠ দেন। অ্যানিমেশন সফটওয়্যার হিসেবে স্কেচআপ নামক একটি আর্কিটেকচারাল মডেলিং প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো বহিরাগত বিনিয়োগকারী ছাড়াই এই ছবিটি তাদের পারিবারিক জমানো টাকা ও নিজেদের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তৈরি হয়েছে। 


চলচ্চিত্রটির নির্মাণ ব্যয় ছিল মাত্র কয়েক হাজার ইউয়ান; সঠিক সংখ্যাটি জানা না গেলেও, মার্কিন ডলারে রূপান্তর করলে এর নির্মাণ বাজেট সম্ভবত এক হাজারেরও কম ছিল। চলচ্চিত্র আয় পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মাও ইয়ান-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে মুক্তি পাওয়ার পর প্রথম ১০ দিনে এটি মাত্র ৭,৭০৫ ইউয়ান (১,১৪০ ডলার; ৮৪৩ পাউন্ড) আয় করে। 


তিয়ানজিন ইয়ামাজাকি ফিল্ম কর্তৃক ৫ই আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটির একটিমাত্র পোস্টার ডিজাইন ছাড়া, ছিল না কোনো ধরনের প্রচারণা। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল এটি নীরবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে।


তবে নিউ লাই- এর সবচেয়ে বড় চমক গল্পে নয়, তার অ্যানিমেশনে। যেখানে আধুনিক অ্যানিমেশন সিনেমায় চরিত্রের প্রতিটি নড়াচড়া, মুখের অভিব্যক্তি আর পরিবেশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়, সেখানে এটি যেন কয়েক দশক পিছিয়ে থাকা কোনো থ্রিডি গেমের জগৎ থেকে উঠে এসেছে। চরিত্রগুলোর চলাফেরায় স্বাভাবিকতার বদলে রয়েছে একধরনের কাঠখোট্টা, পুতুলের মতো ভঙ্গি; কোথাও শরীর মাটিতে হাঁটার বদলে যেন ভেসে বা সরে যাচ্ছে। একই গাছ, পাথর কিংবা ঘাসের দৃশ্যও বারবার ফিরে আসে। মুখের অভিব্যক্তিও এতটাই সীমিত যে ভয়, আনন্দ কিংবা দুঃখ— পৃথক ভাবে নয়, সবকিছুই কখনো কখনো একই রকম অদ্ভুত দেখায়। 


প্রথম দিকে “নিউ লাই” প্রথাগত অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতোই ব্যর্থ হয়েছিল। গরুর স্বপ্নদৃশ্য নিয়ে নির্মিত স্বল্প বাজেটের এই অ্যানিমেশন মুভিটির বিভ্রান্তিকর কাহিনী এবং জঘন্য গ্রাফিক্সের জন্য চারদিকে হাসি ঠাট্টায় পরিণত হয় এই সিনেমা। সেই হাসি ঠাট্টা থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় সিনেমার বিভিন্ন ক্লিপস ও মিম। ভাইরাল হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সিনেমাটির জন্য সকলের মধ্যে একধরনের কৌতুহল তৈরি হয়। মানুষ সিনেমাটি দেখতে শুরু করে অনেকটা “এত খারাপ নাকি?”—এই কৌতূহল নিয়ে। আর সেই কিউরিসিটিই বক্স অফিসে ঝড় ওঠায়।


সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নেতিবাচক পাবলিসিটিও কখনো কখনো সিনেমার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়। এর অ্যালগরিদম কিন্তু নেতিবাচক বা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া চেনে না; চেনে কেবল অ্যাঙ্গেজমেন্ট। নেটপাড়ায় 'নিউ লাই' কে নিয়ে যত বেশি কটাক্ষ তৈরি হয়েছে, ছবিটির হ্যাশট্যাগ এবং নাম তত দ্রুত ট্রেন্ডিং তালিকায় উঠে এসেছে। 


আর যখন কোন কিছু সমালোচনায় ভরে যায়, ঠিক তখনই 'রিভার্স সাইকোলজি' বা বিপরীত মনস্তত্ত্ব কাজ করতে শুরু করে। দর্শক কৌতূহলী হয়ে ওঠে ঠিক কী কারণে এটি নিয়ে এত হট্টগোল। হাসি-ঠাট্টার ছলেই হোক, নেতিবাচকতাকে মূলধনে পরিণত করার এমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আলোচিত চলচ্চিত্র 'নিউ লাই'।


সোশ্যাল মিডিয়ার সেই উন্মাদনা সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়ে সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারে। ছবিটিকে শুধুমাত্র  হেইট-ওয়াচ বা মজার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখতে গিয়েই হলে ভীড় জমান বিপুলসংখ্যক দর্শক। ফলে ট্রল হওয়া চরিত্র ও দৃশ্যগুলোই ছবির প্রধান আকর্ষণীয় উপাদানে পরিণত হয়। যেহেতু এর কোনো যথাযথ প্রচারমূলক পোস্টারও নেই, তাই দর্শকদের ছবিটি দেখতে আকৃষ্ট করার জন্য প্রেক্ষাগৃহের কর্মীরা নিজেরাই পোস্টার আঁকছেন। যেসব দর্শক ছবিটিকে বর্জন করার কথা ভাবছিলেন, কৌতূহলের বশে তারাই প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমাটিকে আর্থিক সাফল্য এনে দেন। ১৮ আগস্ট পর্যন্ত এর আয় ১৮ মিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে বলে জানা যায়। এর মানে হলো, এটি ‘দ্য ওডিসি’ এবং ‘স্পাইডার ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর মতো হলিউড ব্লকবাস্টারগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে।


আজকের সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল দিয়ে সহজেই চকচকে ছবি তৈরি করা যায়। এর বিপরীতে, “নিউ লাই” হলো মানুষের অসম্পূর্ণ পরিশ্রমের এক অনন্য বিজয়। তবে সবাই এই সাফল্যকে যে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তা নয়। বেইজিং নিউজ- এর একটি সম্পাদকীয়তে সিনেমার প্রদর্শনী সংখ্যা বাড়ানোর প্রসংগে সতর্ক করে বলেন যে, দর্শকের কৌতূহলকে কেন্দ্র করে নিম্নমানের সিনেমার প্রদর্শনী সংখ্যা ক্রমাগত বাড়াতে থাকলে প্রেক্ষাগৃহগুলোই একসময় দর্শকের বিশ্বাস হারাতে পারে। কারণ, সিনেমা হলের দায়িত্ব শুধু কোন ছবি বেশি মানুষ দেখতে চাইছে তা অনুসরণ করা নয়; দর্শকের সামনে কোন মানের সিনেমা তুলে ধরা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

sidebar ad