মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কোন দেশ কী করছে? বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের শেখার সময় কী এসেছে?

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

একসময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা ছিল লজ্জার বিষয়। আজ সেই ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা বুঝতে শুরু করেছে—শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ মানুষ দিয়ে একটি দেশ এগিয়ে যেতে পারে না; প্রয়োজন মানসিকভাবেও সুস্থ নাগরিক।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালে নতুন নীতিগত নির্দেশনায় বলেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা হিসেবে নয়; বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে। 


প্রশ্ন হলো—বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কী করছে? আর বাংলাদেশ কী শিখতে পারে?



হাসপাতাল নয়, কমিউনিটিকেই গুরুত্ব


অনেক উন্নত দেশ এখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে বড় মানসিক হাসপাতালের বাইরে এনে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পরিবার এবং কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত করছে।


এর ফলে মানুষ দ্রুত সহায়তা পাচ্ছে, চিকিৎসা নিতে ভয় কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যাও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।


অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) বলছে, অধিকাংশ সদস্য দেশ এখন প্রতিরোধমূলক ও কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। 



স্কুলে শেখানো হচ্ছে মানসিক সুস্থতা


আগে বিদ্যালয়ে শুধু পড়াশোনা শেখানো হতো।


এখন অনেক দেশে শিশুদের শেখানো হচ্ছে—


আবেগ নিয়ন্ত্রণ


চাপ মোকাবিলা


সহমর্মিতা


সহপাঠীর পাশে দাঁড়ানো


প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতে শেখা


কারণ গবেষণা বলছে, মানসিক সমস্যার অনেক লক্ষণ কৈশোরেই শুরু হয়। তাই যত দ্রুত সহায়তা, তত ভালো ফল।


কর্মক্ষেত্রেও বদল এসেছে


আজ অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে উৎপাদনশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।


কিছু প্রতিষ্ঠানে রয়েছে—


গোপন কাউন্সেলিং সেবা


মানসিক স্বাস্থ্য দিবস


বার্নআউট প্রতিরোধ কর্মসূচি


ব্যবস্থাপকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ


জার্মানির সাম্প্রতিক বিতর্কও দেখিয়েছে, শুধু অসুস্থতার ছুটির নিয়ম কঠোর করলেই সমাধান হয় না; কর্মপরিবেশ, অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক ক্লান্তির মতো মূল কারণগুলো সমাধান করাও জরুরি। 


প্রযুক্তিও যুক্ত হচ্ছে


কিছু দেশে টেলি-পরামর্শ, মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন মনোসামাজিক সহায়তা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।


তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট বা ডিজিটাল সরঞ্জাম চিকিৎসকের বিকল্প নয়; এগুলো কেবল সহায়ক হতে পারে। 


সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—লজ্জা ভাঙার চেষ্টা


অনেক দেশ বুঝেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুললেও মানুষ যদি লজ্জায় চিকিৎসা না নেয়, তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর হবে না।


তাই গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে—


“মানসিক অসুস্থতা দুর্বলতা নয়; এটি চিকিৎসাযোগ্য একটি স্বাস্থ্য সমস্যা।”


বাংলাদেশ কোথায়?


বাংলাদেশেও পরিবর্তনের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে।


মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিছু হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাউন্সেলিং সেবা দিচ্ছে।


তবে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—


মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীর ঘাটতি


গ্রামীণ এলাকায় সেবার সীমাবদ্ধতা


সামাজিক কুসংস্কার


পরিবারে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়া


কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সীমিত গুরুত্ব


বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?


শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না। বাংলাদেশ চাইলে কয়েকটি পদক্ষেপে বড় পরিবর্তন আনতে পারে—


প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য যুক্ত করা।


প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেবা ধীরে ধীরে চালু করা।


সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা নীতি প্রণয়ন করা।


গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো।


পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলাপের সংস্কৃতি তৈরি করা।


উল্লেখ্য,  একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, রাস্তা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের মন যদি ভেঙে পড়ে, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।


বিশ্ব আজ মানসিক স্বাস্থ্যকে অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মানবাধিকারের অংশ হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশের জন্যও এটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ব্যবসা এবং রাষ্ট্র—সবার যৌথ দায়িত্ব।


হয়তো এখন সময় এসেছে আমরা প্রশ্ন করি—আমরা কী শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, নাকি মানসিকভাবেও একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা করছি?


sidebar ad