ইতালীয়দের আবেগকে যদি কোনো একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি উসকে দিয়ে থাকে, তবে তা হলো সৌন্দর্যের অনুসন্ধান। তবে এই সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতালীয়দের কাছে সৌন্দর্য মানে পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য, নিজস্বতাকে প্রকাশ করার ক্ষমতা এবং জীবনকে উপভোগ করার এক বিশেষ শিল্প। এর সঙ্গে মিশে আছে খানিকটা নাটকীয়তা, আত্ম-রসিকতা এবং নিজের অসম্পূর্ণতাকেও ভালোবাসার মানসিকতা।
ক্যালাব্রিয়া থেকে আল্পস—ইতালির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সৌন্দর্যের সন্ধান যেন জীবনেরই একটি অংশ। হয়তো এটাই ইতালীয়দের অন্যতম বড় শক্তি—তারা সবকিছুর মধ্যেই, এমনকি জীবনের মধ্যেও, সুন্দর দিকটি খুঁজে নিতে জানেন।
ইতালীয় রেনেসাঁয় চুল নিয়ে উন্মাদনা
আপনি কি ভাবতেন, স্বর্ণালি চুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ শুরু হয়েছিল হলিউডের হাত ধরে? আসলে গল্পটা আরও পুরোনো।
রেনেসাঁ যুগে ভেনিসের অভিজাত নারীদের মধ্যে চুলকে সোনালি করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। গ্র্যান্ড ক্যানালের দিকে তাকিয়ে থাকা রাজকীয় প্রাসাদের ছাদে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ পোহাতেন। মাথায় থাকত বিশেষ ধরনের একটি টুপি, যার ওপরের অংশ খোলা থাকত। এর নাম ছিল ‘সোলানা’। রোদে চুলের রং হালকা করার আগে তারা চুলে ব্যবহার করতেন লাই ও লেবু দিয়ে তৈরি নানা ধরনের অদ্ভুত মিশ্রণ।
সেই সময় সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট মানদণ্ডই অনেকটা নির্ধারণ করত একজন মানুষের পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান। ত্বক হতে হবে দুধসাদা বা মার্বেলের মতো ফর্সা। এমনকি এই কাঙ্ক্ষিত ফর্সাভাব পেতে কখনো কখনো বিষাক্ত সিসাযুক্ত প্রসাধনীও ব্যবহার করা হতো। শরীরের গড়ন হওয়া চাই নরম, কোমল ও ভরাট। আর কপাল? যত উঁচু, তত ভালো। এমনকি কপালকে আরও উঁচু দেখাতে নারীরা কপালের সামনের চুল কামিয়ে ফেলতেন।
‘লা দোলচে ভিতা’র ১৯৬০-এর দশক
এরপর কেটে গেছে বারোক যুগের বিশাল উইগ আর উনিশ শতকের আঁটসাঁট করসেটের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এসে ইতালীয় সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় তৈরি হলো নতুন এক আদর্শ—‘মাজোরাতা’।
সোফিয়া লরেন, জিনা লোলোব্রিজিদা ও সিলভানা মাঙ্গানো তখন মানুষের কল্পনায় সৌন্দর্যের নতুন প্রতীক। আকর্ষণীয়, আবেদনময়, ভরাট, আত্মবিশ্বাসী এবং একই সঙ্গে স্বাভাবিক—তাদের মধ্যে যেন ধরা পড়েছিল ভূমধ্যসাগরীয় সৌন্দর্যের পূর্ণ প্রকাশ।
চোখে থাকত গাঢ় কালো আইলাইনার, যা বাইরের দিকে ছড়িয়ে তৈরি করত বিড়ালের চোখের মতো আকৃতি। ঠোঁটে কখনো উজ্জ্বল লাল, কখনো আবার ন্যুড রং, তবে ঠোঁটের আকৃতি স্পষ্ট করে আঁকা থাকত। চুলে থাকত প্রচুর ভলিউম, যা ধরে রাখতে ব্যবহার করা হতো উদার হাতে হেয়ারস্প্রে। সঙ্গে থাকত হেডব্যান্ড কিংবা অন্যান্য চুলের সাজ।
এই সৌন্দর্যে ছিল উষ্ণতা ও প্রাণ। যেন ইতালির রোদ, রোববারের টমেটো সসের সঙ্গে পাস্তা আর সহজাত আভিজাত্য—সব মিলেমিশে একাকার।
মিলান ও সুপারমডেলদের যুগ
১৯৮০-এর দশকে সৌন্দর্যের কেন্দ্র হয়ে উঠল মিলান। তখনকার ইতালীয় ‘ইট গার্ল’ ছিলেন এমন এক সফল নারী, যিনি পরিবার ও ক্যারিয়ার—দুটোকেই সামলে চলতে পারতেন। আর হয়তো সুযোগ পেলে আরমানি কিংবা ভার্সাচের র্যাম্পেও হেঁটে আসতেন।
এই দশকে সবকিছুই যেন ছিল একটু বেশি। গালের ব্লাশ উঠে যেত কানের কাছাকাছি, চোখে থাকত উজ্জ্বল আইশ্যাডো, ভ্রু হতো ঘন ও স্বাভাবিক, আর পার্ম করা চুলে থাকত সর্বোচ্চ ভলিউম। একটু বেশি আলাদা বা ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠা যেন প্রায় সামাজিক দায়িত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে নব্বইয়ের দশকে এসে সৌন্দর্যের ভাষা বদলাতে শুরু করল।
এটি ছিল সুপারমডেলদের সময়। মনিকা বেলুচ্চির মতো অসাধারণ সুন্দর মডেলরা হয়ে উঠলেন সৌন্দর্যের প্রতীক। তাদের মধ্যে ছিল ভূমধ্যসাগরীয় আবেদন ও আন্তর্জাতিক আকর্ষণের মিশেল।
মেকআপে প্রাধান্য পেল বাদামি ও মাটির কাছাকাছি রং। ঠোঁটের চারপাশে ব্যবহার করা হতো গাঢ় লিপ পেন্সিল। আর ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে শুরু করল একটি ধারণা—‘Less is more’, অর্থাৎ কম সাজেই বেশি সৌন্দর্য।
লিপগ্লস, ট্যান আর পপতারকার প্রভাব
নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে ইতালীয় সৌন্দর্যে আটলান্টিকের ওপারের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল। বাণিজ্যিক টেলিভিশনের বিস্তার, এমটিভির জনপ্রিয়তা এবং পপতারকাদের আকর্ষণ সেই সময়ের সৌন্দর্যবোধকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সারা বছর গাঢ় ট্যান, ঠোঁটে ঝকঝকে লিপগ্লস, শরীরে গ্লিটার আর অতিরিক্ত পাতলা ভ্রু—সবই তখন ট্রেন্ড। যদিও পরবর্তী সময়ে সেই অতিরিক্ত পাতলা ভ্রুই অনেকের কাছে হয়ে উঠেছিল বড় আফসোসের কারণ।
চুলে ছিল ক্রিম্পড স্টাইল ও চোখে পড়ার মতো হাইলাইট। নানান ট্রেন্ডের মিশেলে সময়টি ছিল নান্দনিকভাবে কিছুটা বিশৃঙ্খল, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল দারুণ মজার ও স্মরণীয়। আর তাই আজও ‘Y2K’ সৌন্দর্যধারার প্রতি নস্টালজিয়া এতটা প্রবল।
এআইয়ের যুগে ইতালীয় সৌন্দর্য
আর আজ?
আজকের ইতালীয় সৌন্দর্য যেন দুটি ভিন্ন স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে স্বাভাবিক ও সহজ সৌন্দর্যের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা, অন্যদিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে ডিজিটাল বিপ্লব।
বর্তমানে ‘Italian-girl aesthetic’ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। এর মূল কথা হলো এমন একটি সাজ, যা দেখে মনে হবে খুব একটা চেষ্টা করা হয়নি—কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি বিষয়ই অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ঠিক করা। উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর ত্বক, স্বাভাবিক চুল, ‘Italian bob’-এর মতো সহজ চুলের কাট আর সামান্য মাসকারা—সব মিলিয়ে মিনিমালিস্ট সৌন্দর্য। তবে এই স্বাভাবিকতার পাশাপাশি সৌন্দর্যের জগতে প্রবেশ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
আমরা হয়তো বুঝতেও পারছি না, কিন্তু এআই ধীরে ধীরে সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাগুলো বদলে দিচ্ছে। অ্যালগরিদম তৈরি করছে এক ধরনের ‘সার্বজনীন সৌন্দর্যের মানদণ্ড’, যেখানে মানুষের মুখের আলাদা বৈশিষ্ট্যগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে পারে।
নিখুঁত ভার্চুয়াল মডেল তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে—যারা কখনো বয়স বাড়ায় না, কখনো ক্লান্ত হয় না এবং সবসময় একই রকম নিখুঁত থাকে। তরুণীদের সৌন্দর্য সম্পর্কে ধারণা তৈরির ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠছে।
আজকের আসল চ্যালেঞ্জ
ইতালীয় সৌন্দর্য ইতিহাসজুড়ে মানুষকে আকৃষ্ট করেছে নিখুঁত মুখাবয়বের কারণে নয়। বরং এর আবেদন ছিল মুখের অভিব্যক্তি, আকর্ষণীয় অসম্পূর্ণতা এবং নিজের স্বাতন্ত্র্যকে সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করার ক্ষমতায়। একটি হাসির রেখা, মুখের বিশেষ কোনো ভঙ্গি, চুলে একটি-দুটি পাকা রুপালি চুল কিংবা সামান্য এলোমেলো চুল—এসবই একজন মানুষকে আলাদা করে তোলে। আর সেই আলাদা হয়ে ওঠার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার ব্যক্তিত্ব।
যদি অ্যালগরিদম আমাদের সবাইকে একই রকম করে তুলতে চায়, তাহলে ইতালীয় সৌন্দর্যের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হবে অসম্পূর্ণতার মূল্যকে আবারও আবিষ্কার করা।
কারণ মানুষের সৌন্দর্য কেবল নিখুঁত ত্বক, সমান ভ্রু কিংবা আদর্শ মুখের গড়নে তৈরি হয় না। সৌন্দর্য তৈরি হয় অভিব্যক্তিতে, আত্মবিশ্বাসে, স্বাভাবিকতায় এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সাহসে।
সবকিছু এআই দিয়ে তৈরি করা যায় না। বিশেষ করে মানুষের সেই গর্বিত, আত্মবিশ্বাসী, প্রাণবন্ত ও একটু বেপরোয়া সৌন্দর্য—যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে তার নিজস্ব গল্প, তা কোনো অ্যালগরিদম পুরোপুরি তৈরি করতে পারে না।
সূত্র: দ্য ভোগ