প্রতিদিন সকালের নাস্তায় ডিম খেলে শরীরে যা ঘটে

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬

প্রতিদিন সকালের নাস্তায় ডিম খেলে শরীরে যা ঘটে

শায়লা জাহান:


ব্যস্ত নগরী, ব্যস্ত জীবন। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে জীবন। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী কিংবা গৃহিণী—সবারই কাজের ফাঁকে নিজের জন্য দুদণ্ড সময় বের করা কঠিন। তাই শরীর ভালো রাখতে এবং ফিট থাকতে সকালে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাবার, যা আপনাকে সারাদিন সতেজ ও কর্মক্ষম রাখবে।


সময় বাঁচাতে অনেকেই সকালের নাস্তায় মাখনযুক্ত টোস্ট, ব্রেড ও কফি খেয়ে থাকেন। অথচ দিনের শুরুটা কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সকালের নাস্তার ওপর। তাই সাধারণ টোস্ট ও কফির পরিবর্তে ডিম হতে পারে আদর্শ একটি খাবার। এতে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের চমৎকার সমন্বয়। বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রতিদিনের নাস্তায় একটি ডিম হতে পারে সহজ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর অভ্যাস। পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিনের সকালের নাস্তায় একটি ডিম রাখার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।


দিনের শুরুতে শক্তির জোগান

একটি ডিমে প্রায় ৬ গ্রাম সম্পূর্ণ (Complete) প্রোটিন থাকে, যা শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। ডিমের প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের শক্তির মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এতে দীর্ঘক্ষণ ক্লান্তি কম অনুভূত হয় এবং শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায়। পাশাপাশি নারীদের পেশি গঠন, চুল ও ত্বকের সুস্থতার জন্যও এই উচ্চমানের প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ।


ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

ডিমে কার্বোহাইড্রেট কম এবং প্রোটিন বেশি। এর উচ্চমানের প্রোটিন দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সকালের নাস্তায় ডিম খান, তাঁদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে সকালের নাস্তায় ডিম রাখা ভালো।


হরমোনের ভারসাম্য ও ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে

ডিমে থাকা ভিটামিন বি৫ ও বি৬ হরমোন তৈরিতে এবং এর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া ভিটামিন বি১২ ও আয়রন ক্লান্তি কমাতে ভূমিকা রাখে। সকালে ডিম খেলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় এবং কর্মক্ষমতাও বাড়তে পারে।


মাসিকের সময় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের জন্য উপকারী। ডিমে থাকা ভিটামিন ই কিছু নারীর ক্ষেত্রে মাসিকজনিত অস্বস্তি ও মুডের ওঠানামা কমাতে সহায়ক হতে পারে।


কোলেস্টেরল নিয়ে ভয় কতটা যৌক্তিক?

অনেকেই কোলেস্টেরলের ভয়ে ডিম এড়িয়ে চলেন। সত্যি বলতে, ডিমে কোলেস্টেরল রয়েছে। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্য থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল রক্তের কোলেস্টেরলের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তাই বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি ডিম খাওয়া নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে যাঁদের বিশেষ স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে বা চিকিৎসকের নির্দিষ্ট পরামর্শ আছে, তাঁরা অবশ্যই সেই পরামর্শ মেনে চলবেন।


মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক

ব্যস্ত জীবনে নারীদের শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক চাপও কম নয়। ডিমে রয়েছে কোলিন, যা মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে।


চোখের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে

ডিমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন নামের দুটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাশাপাশি এতে রয়েছে ভিটামিন এ। একজন নারীর প্রতিদিন প্রায় ৭০০ মাইক্রোগ্রাম এবং একজন পুরুষের প্রায় ৯০০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ প্রয়োজন। একটি ডিম থেকে প্রায় ৭৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ পাওয়া যায়।


হাড় ও দাঁতের জন্য উপকারী

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ডিমে থাকা ভিটামিন ডি হাড় ও দাঁত মজবুত রাখতে সাহায্য করে। এটি ক্যালসিয়াম শোষণ এবং রক্তে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৬০০ আন্তর্জাতিক ইউনিট (IU) ভিটামিন ডি প্রয়োজন, যার একটি অংশ ডিম থেকেও পাওয়া যায়।


গর্ভধারণের আগে ও পরে গুরুত্বপূর্ণ

গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভাবস্থায় ডিম একটি উপকারী খাবার। ডিমে থাকা কোলিন ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে। এছাড়া ফোলেট (ফলিক অ্যাসিড) নিউরাল টিউবের জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


পিসিওএসে উপকারী হতে পারে

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস)-এ আক্রান্ত অনেক নারীর ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকে। ডিমের প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে।


ছোট একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত থাকার সহজ উপায়গুলোর মধ্যে প্রতিদিনের নাস্তায় একটি ডিম রাখা অন্যতম। সেদ্ধ, পোচ বা অমলেট—যেভাবেই খান না কেন, অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাই ভালো। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে প্রতিদিন একটি ডিম শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করতে পারে।


ছবি: সংগৃহীত

sidebar ad