ভ্রমণে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ডেড জোনিং’

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬

ডেড জোন বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে আরও গভীর করে। ছবি: সংগৃহীত
ডেড জোন বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে আরও গভীর করে। ছবি: সংগৃহীত

ছুটি মানেই কি শুধু নতুন কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া? নাকি ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ আর সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখার অভ্যাস থেকে কিছুদিনের জন্য সত্যিই দূরে সরে যাওয়া? ২০২৬ সালে ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে দ্বিতীয় প্রবণতাটিই ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ডিজিটাল ডিটক্সের জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় এবার সামনে এসেছে আরও চরম এক ধরনের ভ্রমণপ্রবণতা—‘ডেড জোনিং’ ।


ভ্রমণবিষয়ক নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষভাগে এটি বড় ধরনের ট্রাভেল ট্রেন্ড হয়ে উঠতে পারে। এর অর্থ হলো—এমন প্রত্যন্ত ও প্রযুক্তি-সংযোগহীন জায়গাকে ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া, যেখানে ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতার কারণে অনলাইনে থাকা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ফোন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে না; জায়গাটিই আপনাকে স্বাভাবিকভাবে অফলাইনে থাকতে বাধ্য করবে।


Priceline-এর ২০২৬ সালের ট্রাভেল ট্রেন্ডস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ ভ্রমণকারী ছুটির সময় কাজের সঙ্গে আরও শক্ত সীমারেখা তৈরি করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা এমন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন, যেখানে অনলাইন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সহজ এবং স্বাভাবিক।


‘ডেড জোনিং’ কেন আলাদা?


সাধারণ ডিজিটাল ডিটক্সে মানুষ নিজের সিদ্ধান্তে ফোন দূরে রাখেন, নোটিফিকেশন বন্ধ করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে বিরতি নেন। কিন্তু ‘ডেড জোনিং’-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও ভিন্ন। এখানে এমন একটি জায়গায় যাওয়া হয়, যেখানে দুর্বল ইন্টারনেট, কম মোবাইল সংযোগ, কম রাস্তা এবং চারপাশের প্রকৃতি নিজেই আপনাকে ডিজিটাল দুনিয়া থেকে দূরে রাখে। ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনেসকো স্বীকৃত বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভগুলো এ ধরনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ হতে পারে।


বিলাসী ‘ডেড জোনিং’-এর সেরা গন্তব্য মালদ্বীপের বা আতোল


Travelbag-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘ডেড জোনিং’-এর জন্য বিশ্বের অন্যতম সেরা গন্তব্য হলো মালদ্বীপের বা আতোল (Baa Atoll)। মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ, আলোকদূষণ, সড়কের ঘনত্ব এবং আশপাশের বিলাসবহুল হোটেলের সংখ্যা—বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।


বা আতোলে ইন্টারনেটের গতি প্রায় ৬০ Mbps। ফলে প্রয়োজনীয় কিছু বার্তা পৌঁছাতে পারে, কিন্তু অনায়াসে ভিডিও স্ট্রিমিং বা দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকার মতো শক্তিশালী সংযোগ নেই। এতে অনলাইন দুনিয়া থেকে দূরে থাকা অনেক সহজ হয়ে যায়।


শুধু ইন্টারনেট নয়, এখানকার পরিবেশও যেন বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে আরও গভীর করে। অঞ্চলটির চারপাশে গাড়ি, রাস্তা ও শহুরে কোলাহলের পরিবর্তে প্রকৃতির আধিপত্যই বেশি।


তবে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার অর্থ এখানে বিলাসিতা থেকে দূরে থাকা নয়। আশপাশে রয়েছে ১২টি Michelin Key হোটেল, ফলে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যের পাশাপাশি বিলাসবহুল অবকাশযাপনের সুযোগও থাকছে।


আতোলের সমুদ্রজগৎও অসাধারণ। ইউনেসকো বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে রয়েছে বিপুল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। প্রায় ১,৬০০টি রিফ মান্তা, তিমি হাঙর ও সামুদ্রিক কচ্ছপসহ নানা প্রাণীর দেখা মেলে এখানে।


Travelbag-এর মালদ্বীপবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শেরিল ড্রেনের মতে, প্রচলিত ডিজিটাল ডিটক্সে মানুষ ফোন দূরে রেখে অ্যানালগ ঘড়ি কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরার মতো পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু বা আতোলের মতো ‘ডেড জোনে’ যাওয়ার অভিজ্ঞতা আরও ভিন্ন—মনে হতে পারে যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করেছেন।


প্রকৃতির শব্দে ঘুম ভাঙা, খোলা জায়গায় হাঁটা, সাঁতার কাটা আর দীর্ঘ সময় নীরবতায় থাকা—সব মিলিয়ে এমন একটি ছুটি, যেখানে অনলাইন থাকার চেয়ে বাস্তব পৃথিবীতে উপস্থিত থাকাটাই হয়ে ওঠে মূল অভিজ্ঞতা।


তালিকায় আরও যেসব গন্তব্য


‘ডেড জোনিং’-এর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইথিওপিয়ার কাফা ফরেস্ট। প্রায় ২,১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত আফ্রোমন্টেন ক্লাউড ফরেস্ট ও গভীর উপত্যকার এই অঞ্চলকে বুনো আরাবিকা কফির জেনেটিক উৎসভূমি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।


তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়াটারবার্গ বুশভেল্ড। প্রায় ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি বেলেপাথরের পাহাড়, সাভানা, গভীর গিরিখাত ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এখানকার কিছু শিলাস্তরের বয়স কয়েক কোটি বছর। দক্ষিণ আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সান রক আর্ট এলাকার সঙ্গেও অঞ্চলটির সম্পর্ক রয়েছে।


তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের এঙ্গাডিন ভ্যালি এবং স্পেনের মেনোরকা। তবে বিলাসিতার দিক থেকে এঙ্গাডিন ভ্যালিই এগিয়ে। আশপাশে রয়েছে ১৪টি Michelin Key হোটেল, যা মালদ্বীপের বা আতোলের চেয়েও বেশি।


ভ্রমণের নতুন সংজ্ঞা


প্রযুক্তি আমাদের ভ্রমণকে সহজ করেছে—গন্তব্য খোঁজা, পথনির্দেশ, ছবি তোলা কিংবা মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই অনেক সময় ভ্রমণের প্রকৃত আনন্দ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়। ছুটিতেও ই-মেইল, অফিসের মেসেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর নোটিফিকেশন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।


সেই বাস্তবতায় ‘ডেড জোনিং’ হয়তো শুধু একটি নতুন ট্রাভেল ট্রেন্ড নয়; বরং নিজের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর একটি নতুন উপায়। যেখানে ফোনের স্ক্রিন নয়, চারপাশের প্রকৃতিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।


সূত্র: ফোর্বস

sidebar ad