সকালবেলার নরম আলো। কাঁধে ছোট এক ব্যাকপ্যাক, হাতে টিকেট আর মনের ভেতর? একরাশ অজানা এক রোমাঞ্চ। স্টেশনের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, এই যাত্রায় সঙ্গী আজ আর কেউ নয়, শুধুই আমার আমি। পরিচিত মুখ, চেনা গন্ডী আর প্রতিদিনকার ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে শুরু হলো নতুন এক পথচলার।
একা ভ্রমণের কথা এলেই মনের মাঝে এক অদ্ভূত সুর তুলে। একা শব্দটি একদিকে যেমন স্বাধীনতার কথা বলে, অন্যদিকে প্রথমবারের জন্য তা কিছুটা ভয়েরও। জীবনের ব্যস্ত রুটিনে কখনো কখনো ক্লান্তি এসে জেঁকে বসে। এই শহর, প্রতিদিনকার বাঁধাধরা নিয়ম থেকে ছুটি নিয়ে কিছুটা সময় নিজের মতো করে বাঁচতে ইচ্ছে করে। আর ঠিক তখনই আপনাকে জীবনের ভিন্ন এক স্বাদ দিতে পারে এই সলো ট্যুর। একাকী ভ্রমণ কেবল এক জায়গা থেকে অন্য যায়গায় ঘুরে বেড়ানো নয়, এটি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার একটি অনন্য সফর।
একসময় ভ্রমণ মানেই ছিলো পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সলো ট্যুর বা একা ভ্রমণ। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, কর্মজীবী মানুষ এমনকি মধ্যবয়সীরাও নিজেদের মত করে পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে বেছে নিচ্ছেন এই অভিজ্ঞতা। সলো ট্যুরের মূলমন্ত্র হলো সম্পূর্ন স্বাধীনতা, যেখানে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে পরিকল্পনা করেন, যাতায়াত করেন এবং ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সম্পুর্ণ থাকে নিজের।
বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা “কুইন’’ যেন সলো ট্যুরের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। সিনেমাটিতে রানি নামের এক সাধারণ তরুণীর গল্প বলা হয়, যার বিয়ের আগমুহূর্তে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত রানি পরবর্তীতে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় আগে থেকে পরিকল্পনা করা হানিমুনে সে একাই প্যারিস যাবে।
অচেনা শহর, নতুন সংস্কৃতি, অপরিচিত সব মুখের ভিড়ে শুরুতে ভয় ও অস্বস্তি কাজ করলেও ধীরে ধীরে সে বদলাতে থাকে। একা পথ চলতে চলতে সে তার মাঝে সাহস, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়। যে মেয়েটি একটা সময় নিজে চলতে পারতোনা, অন্যের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল ছিলো, সেই মেয়েই নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয়। এটা শুধু একটি সিনেমার গল্প নয়, এটি মনে করিয়ে দেয় কখনো কখনো একা পথ চলাই মানুষকে নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী রুপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
কেনো করবেন সলো ট্যুর?
বর্তমানে কর্মব্যস্ত জীবনে সবার সময় একসঙ্গে মেলানো কঠিন। তাই অনেকেই অন্যের জন্য অপেক্ষা না করে নিজের সময় ও ইচ্ছামতো ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। একা ভ্রমণ মানে অন্য কারো পছন্দ বা সময়সূচীর সাথে আপোস না করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া। একা ভ্রমণ মানে অন্যের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা, নিজের প্রকৃত সত্তা ছাড়া আর কেউ না হওয়া। কোথাও কোন কম্প্রোমাইজ নেই, কোনো তাড়া নেই। নিজের মতো করে সময় কাটানোর থাকে অফুরন্ত সুযোগ।
নিজের উপর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। অজানা জায়গায় একা পথ চলা, নিজের বাজেট সামলানো, যেকোন পরিস্থিতিতে একা ফেস করা আপনার ভেতর থেকে এক অনন্য আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিবে।
নতুন পরিবেশে নতুন সংস্কৃতি ও জীবনধারা কাছ থেকে জানার অভিজ্ঞতা হয়। নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সহজেই আশেপাশের মানুষের সাথে কানেক্ট করা যায়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে এতে মানসিক উপকারিতাও পাওয়া যায়। কর্মব্যস্ততায় নিজেদের জন্য খুব কম সময়ই বের করা যায়। নিজের সাথে থাকলে নিজেকে নতুনভাবে চেনা যায়, নতুন এক আমি কে আবিষ্কার করা যায়। কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির মাঝে একা কিছুক্ষণ বসলে এলোমেলো চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নেওয়া যায়। নিজের চিন্তাভাবনার সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে সাহায্য করে। চলার পথে আপনি ভূল করবেন, জীবনের বড় শিক্ষা লাভ করবেন, অপ্রত্যাশিত অভিযানে যাবেন এবং উপলব্ধি করতে পারবেন যে, যতটা ভেবেছিলেন আপনি তার চেয়েও বেশি সাহসী ও সক্ষম।
যাওয়ার আগে করণীয়
সলো ট্যুর কি, তার বেনেফিট কি- তার সবই তো জানলাম। কিন্তু এই ভ্রমণের পরিকল্পনা কি দিয়ে শুরু করবেন বা কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন তা ভেবে কিছুটা উদ্বিগ্ন বোধ করছেন? মন চেয়েছে আর বাক্স- পেটরা বেঁধে রওয়ানা হলাম, তা কিন্তু নয়। সবকিছু সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে হওয়ার পূর্বশর্ত হলো পরিকল্পনা করা।
বাজেট নির্ধারণ করুন
যেকোন ভ্রমণের পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে বাজেট ঠিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এই পারপাসে আপনার কাছে কতো টাকা আছে বা কতোটা ম্যানেজ করতে পারবেন তা আগেভাগে নির্ধারণ করে নেয়াই ভালো। একবার বাজেট আপনার সেট হয়ে গেলে আপনি পরবর্তী ধাপে যাওয়ার ব্যাপারে সঠিক নির্দেশনা পাবেন। কোথায় যেতে চান, কতোদিন থাকবেন, যাওয়া-আসার মাধ্যম কি হবে সবকিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
গন্তব্য নির্বাচন
আপনার বাজেট, হাতে থাকা সময় সবকিছু বিবেচনা করে যেসব জায়গায় যেতে চান সেসবের ব্যাপারে খোঁজখবর নিন। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, সব জায়গা এক ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই বিষয়টি মাথায় রেখে, বাজেটের সাথে সংগতি রেখে মানানসই একটি গন্তব্য নির্বাচন করুন। প্রথম ভ্রমণের জন্য দূর্গম এলাকা এড়িয়ে এমন স্থান নির্বাচন করুন যেখানে পর্যটকদের যাতায়াত বেশি এবং নিরাপত্তা ভালো।
স্থানটির ব্যাপারে জানা
পছন্দের ডেস্টিনেশন নির্বাচন করার পরে, সে স্থানটির ব্যাপারে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে রাখতে পারেন। সেখানকার দর্শনীয় স্থান, উল্লেখযোগ্য খাবার, সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন ব্যাপারে সেই রিলেটেড ব্লগ পড়া বা ভ্লগ দেখার মাধ্যমে তথ্যগুলো জেনে নিন। এই সবকিছু আপনাকে স্থানটির ব্যাপারে একটি স্বচ্ছ ধারণা পেতে সাহায্য করবে।
ব্যাগ প্যাকিং
সলো ট্যুরে সবসময় চেষ্টা করবেন কম জিনিসপত্র বা হালকা ব্যাগ নিয়ে যাওয়া। অহেতুক কাপড় বোঝাই ব্যাগ ক্যারি করা কম ঝক্কির কাজ নয়। ব্যাগ প্যাকিং বা ভ্রমণের জন্য কি কি প্রয়োজন তা নির্ভর করবে আপনি কোথায় যাচ্ছেন এবং কতদিনের জন্য যাচ্ছেন তার ওপর। আবহাওয়া, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কেমন সবকিছু জেনে নিয়ে সেই হিসেবে কাপড় নির্বাচন করুন।
এছাড়াও, স্থানটি কেমন তার ওপর ভিত্তি করেই আপনাকে উপযুক্ত পোশাক নিতে হবে। সমুদ্র সৈকতে যান আর পাহাড় ট্র্যাকিং এ বের হোন, পোশাকে সেই হিসেবে ভিন্নতা আসবেই। তাই ভ্রমণে বের হওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, কি কি সাথে নেওয়া উচিৎ, সেই হিসেবে লিস্ট করে গুছিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখুন
জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট (প্রয়োজনে), টিকেট, জরুরী ফোন নাম্বার, মোবাইল চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় ঔষধ, শুকনা খাবার, এক্সট্রা ক্যাশ ও ব্যাংক কার্ড, ছোট একটা ফার্স্ট এইড কিট।
পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে রাখুন
আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় থাকবেন, কখন ফিরবেন এসব তথ্য পরিবারের সদস্যদের বা বিশ্বস্ত কাউকে জানিয়ে রাখুন।
নারীদের জন্য কতটা নিরাপদ?
একসময় একা বের হওয়া শুধু পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই ট্যাবু ভেঙ্গেছে। আমাদের দেশেও অনেক নারী এখন কাজের খাতিরেই বলুন বা অবকাশ যাপন কিংবা নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের জন্য সলো ট্যুরে যাচ্ছেন। তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ভ্রমণের আগে স্থানটির ব্যাপারে ভালোভাবে জেনে নিবেন। হোটেল বা রিসোর্ট যেখানে থাকবেন তা আগে থেকে বুকিং করে রাখবেন এবং এক্ষেত্রে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান বেছে নিবেন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র সবসময় সাথে রাখবেন।
ভ্রমণের সময় রাতে নির্জন এলাকা এড়িয়ে চলুন। অপরিচিত কারো কাছ থেকে কোন কিছু খাবার খাওয়া বা কিছু নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। সাথে করে অনেক বেশি ক্যাশ না নিয়ে কার্ড ব্যবহার করুন।
যদি কোন ধরনের হয়রানি বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখা দেয়, কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ ট্যুরিস্ট পুলিশ বা স্থানীয় পুলিশের সহায়তা নিন। ট্যুরিস্ট পুলিশ পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কাজ করে। এছাড়াও জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯ এও যোগাযোগ করা যেতে পারে।
সলো ট্যুরের বড় শক্তি হলো আত্মবিশ্বাস আর বড় সঙ্গী হল সচেতনতা। নিরাপত্তাবিধি মেনে চললে একা ভ্রমণও হতে পারে জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক , নিরাপদ এবং স্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের নির্জনতা হোক কিংবা সমুদ্রের বিশালতা , আজই প্ল্যান করে ফেলুন আপনার প্রথম সলো ট্যুর। হ্যাপি ট্রাভেলিং।
ছবি: সংগৃহীত
*শায়লা জাহান