আমার চাকরি করার কারণগুলো কী সত্যিই এত অপ্রয়োজনীয়?

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬

আমার চাকরি করার কারণগুলো কী সত্যিই এত অপ্রয়োজনীয়?

আমি রুবিনা আক্তার (ছদ্মনাম), একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। সকালে রান্নাঘরের কাজ শেষ করে অফিসে যাওয়ার জন্য দ্রুত তৈরি হই—সবকিছুর মধ্যে সময় যেন ছুটতে থাকে। আমার স্বামী সরকারি চাকরি করেন, আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। দুজনেরই সকাল শুরু হয় প্রায় একই রকম ব্যস্ততায়। তিনি তাঁর অফিসের পথে বেরিয়ে যান, আমিও ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হই। আমাদের এখনো কোনো সন্তান নেই। আর এই একটি তথ্যই যেন আমার চাকরি করার অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।


পরিবারের কেউ বলেন, ‘তোমার তো এখনো সন্তান নেই। তুমি তো ঘরেই সময় দিতে পারো।’ কেউ বলেন, ‘স্বামী তো সরকারি চাকরি করে। তোমার আবার চাকরি করার দরকার কী?’


আমি বোঝাতে পারি না যে, আমি শুধু টাকার জন্য চাকরি করি না। কাজ করতে ভালো লাগে। নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে ভালো লাগে। মাস শেষে নিজের উপার্জনের টাকা হাতে পেলে ভালো লাগে। সবচেয়ে বড় কথা, চাকরির জায়গায় আমার একটি আলাদা পরিচয় আছে। সেখানে আমি শুধু কারও স্ত্রী নই, কারও পুত্রবধূ নই। আমি আমার কাজ দিয়ে পরিচিত একজন মানুষ।


এই পরিচয়টুকু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এত কিছু বোঝার পরেও কখনো কখনো হাঁপিয়ে উঠি। অপরাধবোধ হয়। মনে হয়, সত্যিই কি আমাকে আরও বেশি ঘরে থাকা উচিত? একজন ভালো স্ত্রী হওয়ার জন্য কি নিজের কাজ ছেড়ে দিতে হয়?


আমার স্বামীও তো চাকরি করেন। তিনিও সকালে বের হন, সারা দিন কাজ করেন, ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। আমি তাঁর কাজকে সম্মান করি। তাঁর ব্যস্ততা বুঝতে চেষ্টা করি। তাহলে আমার কাজের ক্ষেত্রেও কি একই বোঝাপড়া থাকা উচিত নয়?


সন্তান নেই বলে আমার সময় অফুরন্ত—এমনটা নয়। আমারও অফিস আছে, মিটিং আছে, কাজের চাপ আছে, ডেডলাইন আছে। কোনো কোনো দিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হয়, আজ শুধু একটু চুপচাপ বসে থাকি। কেউ যদি তখন জিজ্ঞেস করেন, ‘অনেক ক্লান্ত?’—সেই একটি প্রশ্নই হয়তো অনেক শান্তি দিতে পারে।


একদিন হয়তো আমাদের সন্তান হবে। তখন হয়তো প্রশ্ন বদলে যাবে—‘বাচ্চা রেখে চাকরি করবে কীভাবে?’ তখন নতুন করে দায়িত্ব ভাগ করতে হবে, নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু আমি চাই না, সন্তান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি।


আমি চাই, আমার সন্তান একদিন এমন একজন মাকে দেখুক, যিনি সংসারকে ভালোবাসেন, পরিবারকে ভালোবাসেন, আবার নিজের স্বপ্নকেও ভালোবাসেন। যিনি অন্যের যত্ন নেন, নিজের যত্নও নিতে জানেন। তাই কেউ যখন বলেন, ‘স্বামী তো চাকরি করে, তুমি আবার চাকরি করো কেন?’

আমি এখন মনে মনে উত্তর দিই—কারণ আমারও একটি জীবন আছে।

আমি চাকরি করি বলে আমার ঘরকে কম ভালোবাসি না। বরং আমি বিশ্বাস করি, একজন নারী তাঁর সংসার, স্বামী, ভবিষ্যতের সন্তান এবং নিজের স্বপ্ন—সবকিছুকেই ভালোবাসতে পারেন।

(নারীর ডায়েরি বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন আপনার সুখ-দুঃখের গল্প।)

sidebar ad