শুরুটা হোক শৈশবের এক চেনা স্মৃতি দিয়ে। ছোটবেলায় মিনা কার্টুনের সেই জাদুর কুপির দৈত্যটার কথা কি মনে আছে? কুপি থেকে বের হয়ে সে মিনার ইচ্ছার কথা জানতে চায়। মিনা কি ধন দৌলত চায় নাকি সিনেমার নায়িকা হতে চায়? দৈত্যের কথা শুনে মিনা জানায়,সে আরও ভালো কিছু চায়। সে চায় সবাই যেনো সাবান দিয়ে হাত ধোয়। খুবই সাধারণ এবং ছোট্ট একটি চাওয়া, কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও মিনার সেই ছোট্ট ইচ্ছাটাই আজও আমাদের জন্য অনেক বড় এক স্বাস্থ্যবার্তা হয়ে রয়ে গেছে।
সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকতে চান? সবচেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে একটি হলো হাত ধোয়া। কথাটি শুনতে বা বলতে মনে হচ্ছে এ আর এমন কি! কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এটা যে কতোটা গুরুত্বপূর্ন, তা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা। আমরা খালি চোখে যা দেখি, তা সবসময় পরিষ্কার নাও থাকতে পারে। প্রতিদিনই এই দু হাত দিয়ে কতো অসংখ্য জিনিস স্পর্শ করছি। মোবাইল ফোন, দরজার হাতল, টাকা, লিফটের বাটন কিংবা গনপরিবহনের আসন। এসব জায়গায় থাকা অদৃশ্য জীবাণু খুব সহজেই আমাদের হাতে লেগে যায়। পরবর্তিতে সেই হাত পরিষ্কার না করে আমরা যদি চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করি; তখন জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে নানা ধরনের রোগের কারণ হতে পারে। তাই শুধু হাত ধোয়াই যথেষ্ট নয়, সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার সম্পর্কে সকলে জানা জরুরী।
কেন হাত ধোবেন
- আমাদের এই হাত, জীবাণুকে নিজ শরীরে প্রবেশ করাতে বা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করে। সঠিক নিয়মে সাবান পানি দিয়ে হাত ধুলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস ও আমাশয়ের মতো পেটের রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। হাত ধোয়া বিষয়ক সচেতনতা বা শিক্ষার ফলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২৩-৪০% পর্যন্ত কমে। এছাড়া নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং সাধারন ঠান্ডা-কাশির মতো শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণও ১৬-২১% কমিয়ে দেয়। যার ফলে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হারও হ্রাস পায়।
- নিজের শরীরে জীবাণু সংক্রমণ রোধ করে। আমরা প্রায়শই অজান্তেই নিজের চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করে ফেলি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাণু আমাদের হাতকে তার বাহন হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু এই সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার মাধ্যমে এই জীবাণুগুলোকে শরীরের শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে প্রবেশ করা এবং আপনাকে অসুস্থ করে তোলা থেকে বিরত রাখা যায়।
- শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই অভ্যাস অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে কম থাকে। তারা বাইরে থেকে আসলে কিংবা ঘরের ভেতর খেলাধুলা করার পর সঠিক নিয়মে হাত পরিষ্কার করে দেয়া উচিৎ। শুধু তাই নয়, আপনি বাইরে থেকে জীবাণু ঘরে নিয়ে এলে তারা সহজেই তা থেকে আক্রান্ত হতে পারে। তাই নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে হাত ধোয়ার কোন বিকল্প নেই।
কখন হাত ধোয়া উচিৎ
কিছু নির্দিষ্ট সময়ে হাত ধোয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- খাওয়ার আগে ও পরে, রান্না করার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুকে খাওয়ানোর আগে এবং তাদের পরিষ্কার করার পর, বাইরে থেকে বাসায় ফিরে, হাঁচি-কাশি দেয়ার পরে, অসুস্থ ব্যক্তিকে সেবা দেয়ার আগে ও পরে, গৃহপালিত পশু পাখি বা তাদের খাবার স্পর্শ করার পর।
হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম
শুধুমাত্র পানি দিয়ে হাত ধোয়া যথেষ্ট নয়। সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুলে অধিকাংশ ক্ষতিকর জীবাণু দূর হয়ে যায়। শুধু পানি দিয়ে হাত ধুলে দৃশ্যমান ময়লা সরে গেলেও অনেক জীবাণু থেকে যেতে পারে। তাই গেলাম আর হাত ধুয়ে আসলাম এভাবে না করে সঠিক ধাপ অনুসরণ করে হাত পরিষ্কার করতে হবে-
- পরিষ্কার ও রানিং বা চলমান পানি দিয়ে হাত পুরোপুরি ভিজিয়ে নিতে হবে।
- পর্যাপ্ত পরিমানে সাবান বা লিকুইড সোপ নিয়ে দুই হাতের তালু কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ঘষে ফেনা সৃষ্টি করুন।
- শুধু দু হাতের তালু নয়, প্রতিটি হাতের উল্টো পিঠ, আঙ্গুলের ফাঁক এবং নখের নিচের অংশ ধুতে ভুলবেন না।
- সবশেষে কবজি পর্যন্ত ভালো করে ঘষে হাত ধুয়ে নিন।
- চলমান পানির নিচে আপনার হাত ততক্ষন পর্যন্ত ভালোভাবে ধুতে হবে, যতক্ষন না সমস্ত সাবান চলে যায়। ভালোভাবে ধুলে আপনার হাত থেকে সব জীবাণু, রাসায়নিক এবং ময়লা দূর হয়ে যায়।
- ধোয়া শেষে পরিষ্কার শুকনো তোয়ালে বা পেপার টাওয়েল দিয়ে হাত মুছে নিন। মনে রাখবেন, শুকনো হাতের তুলনায় ভেজা হাতে জীবাণু সহজে ছড়ায়।
এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, অনেক সময় বাহিরে থাকা অবস্থায় যদি পানি ও সাবান হাতের কাছে না থাকে তবে কি করা যাবে? এমতাবস্থায় পানি ও সাবান না থাকলে কমপক্ষে ৬০% অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড রাব বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
হাত ধোয়া ছোট্ট একটি অভ্যাস, কিন্তু এর উপকারিতা অনেক। প্রতিদিন মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় ব্যয় করে আমরা নিজেদের, পরিবারের এবং আশেপাশে মানুষকে নানা সংক্রমকের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। এর সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশ্বজুড়ে সব বয়সী মানুষের মাঝে প্রতিদিন হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৫ অক্টোবর “বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’’ পালন করা হয়। হাত ধোয়া দিনের রুটিন নয়, বরং হোক জীবনের অংশ।
লেখা- শায়লা জাহান