লেখা: ইশরাত জাহান ইনা
গর্ভধারণের আগে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, কারণ সন্তান জন্মের পর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে।ঘুম, সময়, দায়িত্ব সবকিছু বদলে যায়। দম্পতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও ধৈর্য থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সম্পর্কের অশান্তি থাকলে তা মা ও গর্ভস্থ শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বাবা-মা হওয়ার দায়িত্ব, আর্থিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা আগে থেকেই করা দরকার।
প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়াও উপকারী।সন্তান পৃথিবীতে আনার আগে শুধু শরীর নয়, মন, সম্পর্ক এবং পরিবার সবকিছুর প্রস্তুতি জরুরি।
একজন মানসিকভাবে সুস্থ ও প্রস্তুত মা-বাবা সন্তানের জন্য আরও নিরাপদ, ভালোবাসাপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারেন।
গল্পের মাধ্যমে যেনে নিন গর্ভ ধারনের আগে যে ১০টি সাস্থ পরীক্ষা করা জরুরি:
এশা আর দুর্বারের বিয়ে হয়েছে মাত্র এক বছর। চারপাশের মানুষ প্রায়ই জিজ্ঞেস করে,সুখবর কবে শুনব?
প্রথম দিকে এশা শুধু হেসে উত্তর দিত। কিন্তু একদিন সে দুর্বারকে বলল,
সবাই শুধু জানতে চায় আমরা কবে বাবা-মা হব। কিন্তু কেউ কি জিজ্ঞেস করে, আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা?
দুর্বার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,সত্যিই তো। সন্তান শুধু পৃথিবীতে আনলেই তো দায়িত্ব শেষ নয়। তাকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর সুস্থ একটি পরিবেশ দেওয়াটাও আমাদের দায়িত্ব।
সেদিন তারা দুজন সিদ্ধান্ত নিল, তাড়াহুড়ো করে নয় প্রস্তুতি নিয়ে নতুন জীবনের পথে হাঁটবে।তারা নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে শুরু করল। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করল, আর্থিক সঞ্চয় গুছিয়ে নিল, কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। পাশাপাশি একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাল এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুরু করল।
কয়েক মাস পরে এক সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে এশা বলল,
আজ আমার মনে হচ্ছে, আমরা শুধু সন্তান নেওয়ার জন্য নয়, একজন মানুষ গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।
দুর্বার মুচকি হেসে উত্তর দিল, আমাদের সন্তান যেন শুধু একটি পরিবারে জন্ম না নেয়, সে যেন ভালোবাসা, সম্মান আর মানসিক শান্তিতে ভরা একটি পৃথিবীতে আসে।
সেদিন তারা বুঝেছিল, বাবা-মা হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয় গর্ভধারণের দিন থেকে নয় বরং তারও অনেক আগে, যখন দুজন মানুষ একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা নিজেদের আরও দায়িত্বশীল, আরও ধৈর্যশীল এবং আরও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
কারণ, একটি সুস্থ পরিবারই একটি শিশুর জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে সুন্দর বিদ্যালয়।
ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিল যেভাবে-
ডাক্তার তাদের হাসিমুখে স্বাগত জানালেন। সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বললেন,আপনারা সন্তান নেওয়ার আগে পরামর্শ নিতে এসেছেন, এটা খুবই ভালো সিদ্ধান্ত। গর্ভধারণের প্রস্তুতি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক, পুষ্টিগত এবং চিকিৎসাগত সব দিক থেকেই হওয়া উচিত।এশা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
ডাক্তার, আমাদের কী কী পরীক্ষা করানো দরকার?
ডাক্তার একটি কাগজে লিখে দিলেন—
সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (CBC)
রক্তের গ্রুপ ও Rh টাইপ
রক্তে শর্করা পরীক্ষা (Fasting Blood Sugar বা HbA1c)
থাইরয়েড পরীক্ষা (TSH)
প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা
হেপাটাইটিস বি ও সি
এইচআইভি (HIV)
সিফিলিস (VDRL/RPR)
রুবেলা প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা
প্রয়োজনে ভিটামিন ডি, ফেরিটিন এবং থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং
এরপর তিনি বললেন, এশা, গর্ভধারণের অন্তত তিন মাস আগে থেকে প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড শুরু করবেন। সুষম খাবার খাবেন, নিয়মিত হাঁটবেন, পর্যাপ্ত ঘুমাবেন এবং মানসিক চাপ যতটা সম্ভব কম রাখবেন।
দুর্বার জিজ্ঞেস করল, ডাক্তার, আমারও কি কোনো ভূমিকা আছে?
ডাক্তার হেসে বললেন, অবশ্যই। সুস্থ সন্তান শুধু মায়ের একার দায়িত্ব নয়। বাবারও স্বাস্থ্য ভালো থাকা, ধূমপান বা মাদক থেকে দূরে থাকা, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং স্ত্রীকে মানসিকভাবে সমর্থন করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা—দুজনের সুস্থতা মিলেই একটি সুস্থ শিশুর ভিত্তি তৈরি হয়।
ডাক্তারের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এশা আর দুর্বারের মনে এক ধরনের স্বস্তি এলো। তারা বুঝতে পারল, বাবা-মা হওয়ার যাত্রা শুরু হয় সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার দিয়ে।
জেনে রাখা ভালো-
গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার আগে কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো খুবই উপকারী। তবে সবার জন্য একই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। বয়স, পূর্বের রোগ, পারিবারিক ইতিহাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তালিকা বদলাতে পারে।