সংসদে যাচ্ছেন ৭ নারী: প্রত্যাশা, দায়িত্ব ও সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সংসদে যাচ্ছেন ৭ নারী: প্রত্যাশা, দায়িত্ব ও সময়ের দাবি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ। গণতন্ত্র তার নিয়মিত পথ ধরে নতুন প্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিবে। এই নির্বাচনে সরাসরি ভোটে জয়ী হয়ে সাতজন নারী সংসদে যাচ্ছেন এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংখ্যার আনন্দের পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে এই প্রতিনিধিত্ব কি নীতিতে, সিদ্ধান্তে, বাজেটে এবং বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে?


বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের একটি দীর্ঘ অধ্যায় ছিল। শীর্ষ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু সংসদের ভেতরে আইন প্রণয়ন, বাজেট বিতর্ক, কমিটি কার্যক্রম এসব জায়গায় নারীর কণ্ঠ কতটা প্রভাবশালী হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। ফলে নতুন করে নির্বাচিত এই সাত নারী সাংসদের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীরা।


প্রতীক থেকে প্রভাবের পথে

নারী সংসদ সদস্য হওয়া একটি অর্জন। কিন্তু এটি কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় অর্জন নয়; এটি সামাজিক প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। আমরা চাই না তারা কেবল ‘নারী মুখ’ হয়ে থাকুন। আমরা চাই তারা হয়ে উঠুন ‘নীতির কণ্ঠ’। সংসদে দাঁড়িয়ে যেন তারা এমন প্রশ্ন তোলেন, যা রাস্তায়, গ্রামে, কারখানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঘরে—সবখানে প্রতিধ্বনি তোলে।


নারী প্রতিনিধিত্ব তখনই অর্থবহ, যখন তা আইন ও নীতিতে প্রতিফলিত হয়। সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা, বাজেট আলোচনায় স্পষ্ট প্রস্তাব, জনস্বার্থে জোরালো বক্তব্য, এসবের মাধ্যমেই তারা নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।


নিরাপত্তা: প্রথম অগ্রাধিকার

দেশের নারীরা এখনও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা নিয়ে বাঁচেন। গণপরিবহনে হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সাইবার বুলিং, পারিবারিক সহিংসতা—এই তালিকা দীর্ঘ। তাই সংসদে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নিরাপত্তা ও মর্যাদা। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার, থানায় জেন্ডার-সংবেদনশীল সেবা, সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর আইন প্রয়োগ এসব বিষয়ে তারা দলীয় সীমারেখার বাইরে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারেন। সংসদে নারীদের একটি ক্রস-পার্টি ফোরাম গঠন করা যেতে পারে, যেখানে নারী ইস্যুতে দলনিরপেক্ষভাবে কাজ হবে। একজন নারী সংসদ সদস্য যখন নিরাপত্তা ইস্যুতে কথা বলেন, তখন সেটি শুধু বক্তব্য নয়, তা একটি নৈতিক অবস্থান।


অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: উন্নয়নের কেন্দ্র

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে এগিয়েছে। কিন্তু নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বেতন বৈষম্য, পদোন্নতিতে বাধা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অনিরাপদ কাজ এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।


স্বাস্থ্য ও মাতৃত্ব: মানবিক রাষ্ট্রের মানদণ্ড

একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা বোঝা যায় তার স্বাস্থ্যনীতিতে। বিশেষ করে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃত্বকালীন সেবা ও কিশোরী স্বাস্থ্য সুরক্ষায়। গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও মানসম্মত মাতৃত্বসেবা সীমিত। শহরে চিকিৎসা ব্যয় অনেকের নাগালের বাইরে। সংসদে এই বিষয়গুলো যেন প্রাধান্য পায়-


১. উপজেলা পর্যায়ে উন্নত মাতৃত্বসেবা

২.কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা

৩. কিশোরী স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি

৪. মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণ


ডিজিটাল ভবিষ্যৎ: পিছিয়ে না পড়ার লড়াই

বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু ডিজিটাল বৈষম্যও বাড়ছে। গ্রামীণ নারী, নিম্নআয়ের পরিবার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রযুক্তি সুবিধা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হন। এই প্রেক্ষাপটে সংসদে তাদের ভূমিকা হতে পারে—


১. মেয়েদের আইটি ও কোডিং শিক্ষা উৎসাহিত করা

২. সাইবার নিরাপত্তা আইন শক্তিশালী করা

৩. নারী উদ্যোক্তাদের ই-কমার্স সহায়তা

৪. ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী-বান্ধব ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র


রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংলাপ


সংসদ কেবল আইন পাসের জায়গা নয়; এটি বিতর্ক, মতভেদ ও সংলাপের স্থান। আমরা চাই এই সাত নারী সাংসদ রাজনৈতিক শালীনতা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের সংস্কৃতি জোরদার করবেন।

ভিন্নমতকে শত্রু নয়, অংশীদার হিসেবে দেখা—এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ নারীর নেতৃত্ব অনেক সময় সহনশীলতা ও সমন্বয়ের ভাষা নিয়ে আসে।


প্রতীকী নয়, কার্যকর ঐক্য

নারী ইস্যুতে দলীয় বিভাজন যেন বাধা না হয়। নারী সাংসদরা যদি একসঙ্গে কাজ করেন—নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ডিজিটাল ক্ষমতায়ন—তাহলে একটি শক্তিশালী নীতিগত চাপ তৈরি হবে। সংখ্যা কম হলেও ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও শক্তিশালী।


এই সাত নারী সাংসদের কাছে প্রত্যাশা যেমন-


১. সমান কাজে সমান মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি।


২. নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে তহবিল ও জামানতবিহীন ঋণ।


৩. গ্রামীণ নারীদের স্থানীয় কর্মসংস্থান।


৪. মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তন নীতি।


৫. নারীর আয় বাড়লে কেবল একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ উপকৃত হয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়—যা সামাজিক পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি।



আমরা তাদের কাছে নিখুঁত হওয়ার দাবি করছি না; আমরা দাবি করছি দায়বদ্ধ হওয়ার। প্রশ্ন তোলার সাহস, ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান, বাজেটে নারী-সংবেদনশীল প্রস্তাব—এসবই তাদের প্রকৃত পরিচয় গড়ে তুলবে। সংসদে সাত নারী যাচ্ছেন—এটি শুরু। এখন সময় প্রমাণের। কারণ ইতিহাস কেবল নির্বাচন ফল মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে কে কোন ইস্যুতে দাঁড়িয়েছিলেন, কে সাহসী প্রশ্ন তুলেছিলেন, কে পরিবর্তনের পথ খুলেছিলেন। আমাদের প্রত্যাশা বড়—কারণ দায়িত্বও বড়। এই সাত নারী যেন হয়ে ওঠেন প্রতীক নয়, প্রভাব। উপস্থিতি নয়, নেতৃত্ব। তাহলেই এই জয় কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় থাকবে না—এটি হয়ে উঠবে দেশের অগ্রগতির নতুন অধ্যায়।


-সাবিনা ইয়াসমীন, সম্পাদক- রোদসী

sidebar ad