নারীর আসল বাড়ি কোথায়?

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬

নারীর আসল বাড়ি কোথায়?

আমার মেয়ে প্রশ্ন করে মা পরের বাড়ি কি? আমার বাড়ি তাহলে কোনটা? আমি উত্তর খুজে পাইনা তখন কি বলবো? আমি তখন বলি, পরের বাড়ি বলে কিছু নেই, মা।এই ঘর যেমন তোমার, তেমনি ভবিষ্যতে তুমি যেখানে থাকবে, সেই ঘরও তোমারই হবে। একজন মানুষ কখনো পর হয়ে যায় না। তুমি আজ আমার আর বাবার ঘরের আলো। বড় হয়ে যদি বিয়ে করে নিজের ইচ্ছায় নতুন একটি পরিবার গড়ো, তাহলেও এই বাড়ি সবসময় তোমারই থাকবে। এই ঘরের দরজা, আমাদের ভালোবাসা আর আমাদের বুক, কখনো তোমার জন্য বন্ধ হবে না।


তাই কেউ যদি বলে মেয়েরা পরের বাড়ির, তুমি মনে রাখবে,তুমি কারও পর নও। তুমি আমাদের সন্তান, আমাদের গর্ব, আর এই পৃথিবীতে তোমার নিজেরও একটি ঠিকানা আছে।মেয়ে বুঝবে যে বিয়ে মানে নিজের বাবা-মায়ের ঘর হারিয়ে ফেলা নয়। বরং সে সবসময় এই পরিবারেরই একজন প্রিয় সদস্য ছিল ও থাকবে। এই উত্তর তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।


পরের বাড়ি যাবে এই একটি বাক্যেই কত মেয়ের শৈশব, স্বপ্ন আর আত্মমর্যাদা হারিয়ে যায়,তা জানে কয়জনা।


মেয়ে মানুষের এত আহ্লাদের দরকার নেই, পরের বাড়িই তো যাবে আমাদের সমাজে বহু মেয়ের কানে ছোটবেলা থেকেই বারবার ভেসে আসে এই কথাটি। হয়তো এটি অনেকেই অভ্যাসবশত বলেন, কিন্তু এই একটি বাক্যই অজান্তে একটি শিশুর মনে গেঁথে দেয় সে যেন এই ঘরের পুরোপুরি আপন নয়, তুচ্ছ কিছু সে। তার ইচ্ছা, স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া কিংবা অনুভূতির মূল্য যেন একটু কম।


কিন্তু প্রশ্ন হলো একজন মেয়ের জন্ম কি শুধুই একদিন অন্যের বাড়ি যাওয়ার জন্য? নাকি সে এই পরিবারেরও সমান আদরের, সমান অধিকারী, সমান স্বপ্ন দেখার মানুষ?কেন এই একটি বাক্য কখনো কখনো একটি মেয়ের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, আবার একটি বাক্যই সারাজীবনের ক্ষত হয়ে থাকে। 


তাই সময় এসেছে এই পুরোনো মানসিকতাকে প্রশ্ন করার কারণ মেয়েরা পরের নয়, তারা প্রতিটি পরিবারের বর্তমান, গর্ব এবং ভবিষ্যৎ।তাদের জীবনের একটি অনবদ্য অংশ। এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হলে শুধু আইন বা শিক্ষা নয়, পরিবার থেকেই পরিবর্তনের শুরু করতে হবে।যেমন কথার পরিবর্তন করুন।পরের বাড়ি যাবে না বলে বলুন, তুমি সবসময় আমাদের চোখের মনি।ছেলে-মেয়েকে সমান গুরুত্ব দিন। ভালোবাসা, শিক্ষা, সুযোগ ও সম্পত্তির অধিকার সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য কমান।


মেয়ের মতামতকে সম্মান করুন। ছোটবেলা থেকেই তাকে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিন।


বিয়েকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানাবেন না। একজন মেয়ের পরিচয় শুধু কারও স্ত্রী হওয়া নয় সে নিজেও একজন স্বতন্ত্র মানুষ।


দৈনন্দিন ভাষা বদলান। কারণ বারবার বলা কথাই একসময় বিশ্বাসে পরিণত হয়। ক্ষত নয় বাস্তবতা শেখান।


সবচেয়ে বড় কথা, একজন মেয়েকে এমনভাবে বড় করুন যেন সে কখনো মনে না করে এই বাড়িতে সে অতিথি।জন্ম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত বাবা-মায়ের ঘর তারও ঘর।এটাই তার প্রথম বাড়ি।


যেদিন আমরা পরের বাড়ির মেয়ে নয়, আমাদের সন্তান' বলতে শিখব, সেদিনই এই আদিম মানসিকতার সত্যিকারের পরিবর্তন শুরু হবে।


একবিংশ শতাব্দীতে নারী আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা, খেলাধুলা কোনো ক্ষেত্রই আজ নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণ নয়। তবুও বিস্ময় জাগে, এত অগ্রগতির পরও কেন কিছু মানুষের মনে এখনো সেই পুরোনো ধারণা রয়ে গেছে,মেয়ে তো পরের বাড়ি যাবে?


এর কারণ প্রযুক্তির উন্নতি হলেও, সবার মানসিকতার উন্নতি ওই একই গতিতে হয়নি। শত বছরের সামাজিক রীতি, পারিবারিক শিক্ষা, প্রচলিত বিশ্বাস এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কিছু ধারা এখনো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। ফলে অনেকেই না ভেবেই সেই পুরোনো কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করেন।


কিন্তু সময় বদলেছে। আজ একজন মেয়ের পরিচয় শুধু কারও কন্যা, স্ত্রী বা মা হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন স্বতন্ত্র মানুষ,নিজের স্বপ্ন, যোগ্যতা, অধিকার এবং পরিচয় নিয়ে।তার নিজের আলাদা একটা পরিচয় আছে।সেও মানুষ। 


তাই এখন প্রশ্ন করার সময় এসেছে যখন নারীর শক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, তখন তার পরিচয়কে কেন এখনো পরের বাড়ির মানুষ বলে ছোট করা হবে?


পরিবর্তন শুরু হোক আমাদের চিন্তায়, আমাদের ভাষায়, আর আমাদের সন্তানদের বড় করে তোলার পদ্ধতিতে।আমাদের ঘর থেকেই।


আপনার কন্যাসন্তানকে এমন মানসিকতা নিয়ে বড় করুন, যাতে সে কখনো নিজেকে কারও বোঝা বা পরের মানুষ মনে না করে।


তাকে শুধু ভালো শিক্ষাই নয়, আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তিও দিন। তাকে শেখান তার পরিচয় শুধু কারও মেয়ে, স্ত্রী বা মা হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার স্বপ্ন দেখার, নিজের পথ বেছে নেওয়ার এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সমান অধিকার আছে।


আজ আপনি যে আত্মবিশ্বাস তার মধ্যে গড়ে তুলবেন,সেটাই আগামী দিনের একজন শক্তিশালী নারী, একজন সচেতন মা এবং একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি হয়ে উঠবে।


লেখা- ইশরাত জাহান ইনা 

sidebar ad