“একটু মনোযোগ দাও”, “এতো অস্থির কেন?’’ “ইচ্ছে করলেই তো করতে পারো!’’ এমন কথা আমরা কেউ বলিনি বা শুনি নি, এমন মেলা ভার। বাচ্চারা স্বভাবতই চঞ্চলপ্রিয়। দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি, দূরন্তপনা; ক্ষেত্রবিশেষ অমনোযোগী ভাব তাদের মধ্যে থাকবেই। কিন্তু যদি সেই অমনোযোগ, অস্থিরতার পেছনে অলসতা নয়, বরং মস্তিষ্কের কাজ করার ভিন্ন একটি ধরন দায়ী থাকে, তখন তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বটে। আর এই সবকিছুই এডিএইচডি’র লক্ষণ হিসেবে সনাক্ত হতে পারে। কি এই এডিএইচডি? তা নিয়েই আজ আমরা জানবো।
এডিএইচডি’র পূর্ণরুপ অ্যাটেনশান-ডেফিসিট ডিসঅর্ডার বা মনোযোগ ঘাটতি ব্যাধি। এটি একটি আচরণগত ব্যাধি, যা সাধারণত অসাবধানতা, আবেগপ্রবণতা এবং কিছু ক্ষেত্রে হাইপার এক্টিভিটি দ্বারা শৈশবেই প্রথম নির্ণয় করা যায়। এই উপসর্গগুলো কখনো একসাথে ঘটে আবার কখনোবা একটি অন্যগুলো ছাড়াও দৃশ্যমান হতে পারে। একটি এস্টিমেন্টে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪% থেকে ১২% শিশুর এই এডিএইচডি আছে। মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের হাইপার এক্টিভিটি বা সম্মিলিত এডিএইচডি হওয়ার সম্ভাবনা ২-৩ গুন বেশি। হাইপার এক্টিভিটির লক্ষণগুলো অনেক সময় সন্তানের ৭ বছর বয়সের মধ্যে স্পষ্ট হয় এবং খুব অল্প বয়সী প্রিস্কুলারদের মধ্যে উপস্থিত হতে পারে। একটি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত এই মনোযোগ ঘাটতি স্পষ্ট নাও হতে পারে।
এই এডিএইচডি তিন ধরনের হতে পারে। কম্বাইন্ড বা সম্মিলিত প্রকার। এটি সবচেয়ে কমন। আবেগপ্রবণ এবং অতিসক্রিয় আচরণের পাশাপাশি অসাবধানতা ও বিভ্রান্তি দ্বারা একে চিহ্নিত করা হয়। আরেকটি ধরন হলো হাইপার এক্টিভ বা অতি সক্রিয় প্রকার। অসাবধানতা ও বিভ্রান্তি ছাড়াই আবেগপ্রবণ ও অতিসক্রিয় আচরণ দ্বারা এটি চিহ্নিত। শেষ ধরনটি হল অমনোযোগী ও বিভ্রান্তিকর প্রকার। এতে হাইপার এক্টিভিটি দেখা যায়না। শুধুমাত্র অসাবধানতা এবং বিভ্রান্তি দ্বারা একে চিহ্নিত করা হয়।
এই ব্যাধির কারণ ও লক্ষণ: এডিএইচডি হলো শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে গবেষণা করা ক্ষেত্রেগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু এর হওয়ার পেছনে সঠিক কারণ এখনও অজানা। তবে পাওয়া উপাত্ত দ্বারা এটা নির্দেশিত হয় যে এডিএইচডি জেনেটিক। এটি একটি মস্তিষ্ক-ভিত্তিক জৈবিক ব্যাধি। নিম্ন স্তরের ডোপামিন (একটি মস্তিষ্কের রাসায়নিক), যা একটি নিউরোট্রান্সমিটার, এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পাওয়া যায়। ব্রেইন ইমেজিং স্টাডিজ দেখায় যে, এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্কের বিপাক ক্রিয়া কম থাকে যা মনোযোগ, সোশ্যাল জাজমেন্ট এবং মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রন করে।
এর উপসর্গগুলো কি হতে পারে? যদিও প্রতিটি শিশুই ভিন্নভাবে উপসর্গগুলো অনুভব করে। তবে এর উল্লেখিত তিন প্রকারের মধ্যে এগুলো অন্তভূক্ত থাকে-
অমনোযোগী
-মনোযোগ টিকিয়ে রাখতে অসুবিধা
-অন্যের কথা শুনতে অসুবিধা
-সহজেই বিভ্রান্ত
-বিস্মৃতি
-দূর্বল সাংগঠনিক দক্ষতা
-দূর্বল অধ্যয়ন দক্ষতা
আবেগপ্রবণতা
-প্রায়শই অন্যদের বাঁধা দেয়া
-ঘনঘন ঝুঁকি নেয়া এবং কোন কিছু চিন্তা না করেই যেকোন কাজ করে ফেলা
হাইপার এক্টিভিটি
-অত্যধিক চঞ্চলতা
-অতিরিক্ত কথা বলা
-বারবার এবং প্রায়ই জিনিস হারিয়ে ফেলা বা ভূলে যাওয়া
-কাজে থাকার অক্ষমতা, কোন কাজ শেষ না করেই এক কাজ থেকে অন্য কাজে চলে যাওয়া
প্রতিকারের উপায়
এডিএইচডি সাধারণভাবেই শৈশবেই নির্ণয় করা যায়। একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনরোগ বিশেষজ্ঞ শিশুদের মধ্যে এটি শনাক্ত করতে পারেন। পিতামাতা এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে শিশুর আচরণের বিশদ ইতিহাস, আচরণের পর্যবক্ষণ এবং মনোশিক্ষামূলক পরীক্ষা এডিএইচডি নির্ণয় করতে অবদান রাখে। তবে এই শিশুদের ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য থাকে তাদের চঞ্চলতা কমানো। চঞ্চলতা কমাতে পারলেই তাদেরকে উদ্দিষ্ট কাজে মনোনিবেশ করা সহজ হবে। পাশাপাশি আরও যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়-
-বাচ্চার খাবারের প্রতি নজর দেয়া দরকার। স্কুলে যাওয়ার আগে বা কোন কাজ শুরু করার আগে তার খাবারের দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। কারন ক্ষুধাবোধ চঞ্চলতা বাড়ায়। তাই তার ভরপেটে সকালের নাস্তা খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
-মনোযোগ বৃদ্ধিতে মেডিটেশন বা ডিপ ব্রিদিং অনেক কাজে দেয়। বাচ্চাকে এইসব রিলাক্সেশন টেকনিক খেলারছলে শেখানো যায়। আর না হয় কোন দক্ষ ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে কিভাবে শেখানো যায় তা ঠিক করতে হবে।
-এরা সাধারণত এক্টিভ থাকতে পছন্দ করে। তাই তাদের জন্য একটি দৈনন্দিন রুটিন প্রণয়ন করে রাখলে ভালো হয়। এতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
-কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফট বা শান্ত টাইপের মিউজিক অনেক কাজে দেয়। ঘুম পাড়ানোর সময় বা খাবারের সময় তার চাঞ্চল্য কমানোর জন্য এই ধরনের মিউজিক ছেড়ে দিয়ে দেখা যেতে পারে।
-খাবারের তালিকার পরিবর্তন করা। তারা যদি নিয়মিত হাই আয়রনযুক্ত খাবার খায় তা হলে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে এই সমস্যা। সেক্ষেত্রে খাবারের পাতে থাকতে হবে রকমারি শাক সবজি। বিশেষ করে ব্রোকোলি, পালং শাক, ফুলকপি ইত্যাদি।
-মাছে থাকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। কিন্তু বাচ্চারা অনেক সময় মাছ খেতে চায়না। সেইরকম হলে তাদের রকমারী বাদাম দেয়া যেতে পারে। বাদামে প্রচুর মাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড আছে যা এডিএইচডি নিয়ন্ত্রণে খুবই কার্যকরী।
-সর্বোপরি নিজে শান্ত থাকা। তাদের সাথে অস্থির বা রাগ বা হতাশ আচরন করা ঠিক না। এতে তাদের হাইপার এক্টিভিটি আচরনে এর প্রভাব পড়তে পারে। যদি নিজেকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে তবে দ্রুত অন্য রুমে যেয়ে নিজেকে শান্ত করার সময় দিন।
এডিএইচডি কোন চরিত্রের দূর্বলতা নয়, খারাপ অভ্যাসও নয়। এটি একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা , যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের মধ্যেই থাকতে পারে। অনেক সময় শিশুকালের লক্ষণ বড় হওয়ার পরেও থেকে যায়, শুধু প্রকাশের ধরন বদলে যায়। হয়তো সে অমনোযোগী নয়, সে লড়াই করছে এমন এক অদৃশ্য লড়াইয়ের সঙ্গে যা বাহির থেকে দেখা যায়না। তাই কাউকে দ্রুত বিচার করার আগে একটু থামি। সহানুভূতি, সচেতনতা আর সহযোগিতাই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখা- শায়লা জাহান