মা যখন সুপার ওমেন

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬

মা যখন সুপার ওমেন

একজন কর্মজীবী মায়ের জীবন মানেই এক ধরনের নীরব যুদ্ধ।যেখানে সকাল শুরু হয় ঘড়ির কাঁটার আগে,আর রাত শেষ হয় সবার ঘুমের পরে।এই যুদ্ধটা কোনো অস্ত্রের নয়,এটা সময়,ভালোবাসা, দায়িত্ব আর ক্লান্তির এক অবিরাম সমন্বয়।


একজন কর্মজীবী মায়ের জীবন মানেই এক ধরনের নীরব যুদ্ধ।যেখানে সকাল শুরু হয় ঘড়ির কাঁটার আগে,আর রাত শেষ হয় সবার ঘুমের পরে।এই যুদ্ধটা কোনো অস্ত্রের নয়, এটা সময়,দায়িত্ব, ভালোবাসা আর ক্লান্তির এক অবিরাম সমন্বয়।


ভোরের শুরু: নিজের আগে সবার চিন্তা ভোর ৫টা বা ৫:৩০টা।শহর তখনও আধো ঘুমে।কিন্তু একজন কর্মজীবী মায়ের দিন শুরু হয়ে যায়।চোখে এখনো ঘুম লেগে থাকে, তবুও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে হয়।চুলা জ্বলে ওঠে,সাথে শুরু হয় দিনের পরিকল্পনা।আজ কী রান্না হবে,কার টিফিন যাবে কীভাবে,অফিসের কোনো জরুরি কাজ আছে কি না।

এই সময়টা সবচেয়ে নীরব হলেও সবচেয়ে চাপের। কারণ একসাথে মাথায় ঘুরতে থাকে অনেকগুলো চিন্তা।সন্তানের স্কুল,স্বামীর অফিস,নিজের অফিসের ডেডলাইন,আর ঘরের ছোট ছোট দায়িত্ব।

তবুও মুখে থাকে এক ধরনের অভ্যাস করা শান্ত হাসি।কারণ এই হাসিটাই পরিবারের শক্তি।


সন্তানকে তৈরি করা: সবচেয়ে আবেগের মুহূর্ত

সন্তানকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা একজন মায়ের জন্য শুধু কাজ নয়,এটা আবেগের একটি অধ্যায়। কখনো বাচ্চা জেদ করে, কখনো দেরি করে,কখনো নাস্তা খেতে চায় না।

এই সময় মায়ের ধৈর্যই আসল পরীক্ষা।হয়তো ভেতরে ক্লান্তি থাকে,কিন্তু বাইরে থাকে নরম কণ্ঠ চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।

বাচ্চার ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া,জামা ঠিক করা, চুল বেঁধে দেওয়া।এই ছোট ছোট কাজগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক বিশাল ভালোবাসা।

স্কুলের গেটে যখন সন্তানকে বিদায় জানানো হয়,তখন অনেক মায়ের বুকের ভেতর একটা টান অনুভব হয়।কিন্তু সেই টানকে চেপে রেখে তাকে আবার এগিয়ে যেতে হয় নিজের কর্মস্থলের দিকে।


কর্মস্থলের বাস্তবতা: প্রফেশনাল মুখোশ

অফিসে ঢুকলেই শুরু হয় আরেক জীবন।এখানে সে শুধু মা নয়,একজন কর্মী, একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী।মিটিং, রিপোর্ট, কল, ডেডলাইন।সবকিছু সামলাতে হয় সমান দক্ষতায়।কিন্তু ভেতরে ভেতরে কখনো কখনো চিন্তা চলে যায়।বাচ্চা ঠিক আছে তো?স্কুল থেকে ফিরেছে তো সময়মতো?

এই দ্বৈত মানসিক চাপই একজন কর্মজীবী মায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অনেক সময় অফিসে হাসিমুখে থাকতে হয়, অথচ ভেতরে ক্লান্তি জমে থাকে পাহাড়ের মতো। তবুও কাজ থেমে থাকে না। কারণ দায়িত্ব তাকে থামতে দেয় না।


দুপুরের নীরবতা: ক্লান্তির মাঝেও শ্বাস নেওয়া

দুপুরের সময়টা কিছুটা শান্ত।এই সময়েই অনেক মা একটু নিজের জন্য সময় পান।হয়তো দ্রুত লাঞ্চ,হয়তো ফোনে সন্তানের খবর নেওয়া,বা একটু চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম।এই সময়টা খুব ছোট,কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সামান্য বিশ্রামই বিকেলের দ্বিতীয় দফা লড়াইয়ের শক্তি দেয়।


বিকেলের দৌড়: আবারও দায়িত্বের ঘূর্ণিঅফিস শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয় আরেক দুশ্চিন্তা।বাচ্চা স্কুল থেকে ফিরেছে তো? টিউশন হয়েছে কি?বাসায় কেউ আছে তো?

অফিস শেষ করে দ্রুত বাসার দিকে ছোটা।এ যেন প্রতিদিনের রুটিন।

বাড়িতে ফিরেই আবার নতুন কাজ:রান্না,সন্তানের পড়াশোনা দেখা,পরের দিনের প্রস্তুতি,ঘরের কাজ।

এখানে বিশ্রাম বলে প্রায় কিছুই থাকে না।


সন্ধ্যার সময়:সন্তানের সাথে বাস্তব সংযোগ

সন্ধ্যার সময় একজন কর্মজীবী মায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দিনের সব ক্লান্তি পাশে রেখে সন্তানের পাশে বসতে হয়।

আজ স্কুলে কী শিখলে? “কোন বন্ধু ভালো?” “কোনটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে?”

এই প্রশ্নগুলো শুধু কথা নয়, লএগুলো সন্তানের সাথে সম্পর্ক গড়ার সেতু।

অনেক সময় মা নিজেই ক্লান্ত,কিন্তু সন্তানের মুখের দিকে তাকালে সব ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।


রাতের নীরবতা: নিজের সাথে দেখা সবাই ঘুমিয়ে গেলে শুরু হয় মায়ের শেষ অধ্যায়।কাপড় গুছানো, পরের দিনের পরিকল্পনা, রান্নাঘর গুছানো।সব শেষ করে যখন বিছানায় বসে, তখন চারপাশে নীরবতা নেমে আসে।এই নীরবতার ভেতরেই আসে এক ধরনের প্রশ্ন।আমি কি ঠিকভাবে সব সামলাতে পারছি?আমি কি যথেষ্ট ভালো মা?কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর হয় তার পরের দিনের আবার শুরু হওয়া জীবন।কারণ সে থেমে থাকে না।


বাস্তবতা: নিখুঁত হওয়া নয়, যথেষ্ট হওয়াই বড় শক্তি

একজন কর্মজীবী মায়ের জীবন নিখুঁত নয়,আর হওয়াও সম্ভব না।এখানে ক্লান্তি আছে,দেরি আছে, ভুল আছে,আবার অগাধ ভালোবাসাও আছে।

সবকিছু ঠিকভাবে করা নয়,বরং চেষ্টা করে যাওয়া।এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।

সন্তান সবসময় মনে রাখে না কতটা পরিষ্কার ঘর ছিল বা কতটা নিখুঁত রান্না হয়েছিল।সে মনে রাখে,মা তার পাশে ছিল কিনা।


শেষ কথা: একজন মায়ের নীরব বিজয় একজন কর্মজীবী মা প্রতিদিন নিজের সীমা অতিক্রম করে।সে নিজের স্বপ্ন, ক্লান্তি,আর ইচ্ছাকে অনেক সময় পিছনে রেখে পরিবারের জন্য এগিয়ে যায়।তার জীবন হয়তো সহজ নয়,কিন্তু তার ভেতরের শক্তি অসাধারণ।

কারণ সে শুধু একজন কর্মী নয়,শুধু একজন মা নয়।সে একটি পরিবারের হৃদস্পন্দন।আর সেই হৃদস্পন্দনই প্রতিদিন নতুন করে জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যায়।

লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা 

sidebar ad