বাবা মায়ের বিচ্ছেদ: ক্ষত বহন করে সন্তান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬

বাবা মায়ের বিচ্ছেদ: ক্ষত বহন করে সন্তান

দুজনের বিচ্ছেদ,আর ক্ষতটা বহন করে সন্তান: কথাটা পুরোপুরি সব ক্ষেত্রে এক না হলেও বাস্তব জীবনের অনেক ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।কারণ একটা সম্পর্ক ভাঙে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে,কিন্তু তার প্রভাব গিয়ে পড়ে সেই ছোট মানুষটার মনে,যে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।শুধু পরিবর্তনটা অনুভব করে।অনেক সময় বাবা-মা নিজেদের কষ্ট, রাগ,অভিমান সামলে নিতে পারেন।নতুন জীবন শুরু করেন,কাজে ব্যস্ত হয়ে যান,আবার হাসতেও শিখে ফেলেন।


কিন্তু সন্তান?

সে প্রায়ই বুঝতে পারে না কেন হঠাৎ বাবা আর একসাথে থাকে না,কেন আগের মতো সবাই মিলে খাওয়া হয় না,কেন একটা ফোনকলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।একটা শিশুর কাছে পরিবার মানে নিরাপত্তা।যখন সেই জায়গাটাই নড়ে যায়,তখন তার ভিতরেও অস্থিরতা তৈরি হয়।কেউ চুপচাপ হয়ে যায়,কেউ রাগী হয়ে যায়,কেউ পড়াশোনায় মন হারায়,আবার কেউ নিজের দোষ খুঁজতে থাকে।

আমার জন্য কি মা-বাবা আলাদা হলো?সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো,অনেক বাবা-মা বুঝতেই পারেন না সন্তান তাদের ঝগড়া, তিক্ততা বা দূরত্ব কত গভীরভাবে অনুভব করে। শিশুরা সবসময় ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু তারা পরিবেশ খুব তীব্রভাবে অনুভব করে।


কথাটা কতটা যুক্তিসংগত :

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও আছে,সব বিচ্ছেদ সন্তানের জন্য ক্ষতিকর নয়।কখনো কখনো প্রতিদিনের অপমান,বিষাক্ত ঝগড়া, মানসিক নির্যাতনের মধ্যে বড় হওয়ার চেয়ে শান্ত আলাদা পরিবেশ সন্তানের জন্য ভালো হতে পারে। যদি বাবা-মা আলাদা হয়েও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব,সম্মান আর মানসিক উপস্থিতি বজায় রাখেন,তাহলে সন্তান ধীরে ধীরে সুস্থভাবেও বড় হতে পারে।তাই কথাটা যুক্তিসঙ্গত,কারণ সন্তান সত্যিই প্রভাব বহন করে।

কিন্তু সেই ক্ষত কত গভীর হবে,সেটা অনেকটাই নির্ভর করে বাবা-মা বিচ্ছেদের পর কীভাবে সন্তানের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তার উপর।


বাচ্চার মানুসিক অবস্থা খারাপ কিভাবে বুঝবো?


সন্তানের মানসিক অবস্থা খারাপ হলে সেটা সবসময় মুখে বলে বোঝায় না। বেশিরভাগ সময় আচরণ, অভ্যাস আর ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।বিশেষ করে পরিবারে অশান্তি,বিচ্ছেদ,চাপ বা বড় পরিবর্তনের সময় বাচ্চারা ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু জমিয়ে রাখে।কিছু লক্ষণ খেয়াল করতে পারেন,


#হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে যাওয়া।

#আগে হাসিখুশি থাকলেও এখন একা থাকতে চাওয়া, কথা কম বলা।

#অকারণে রাগ বা জেদ বেড়ে যাওয়া।

#ছোট বিষয়েও চিৎকার করা,কান্না করা বা মারমুখী আচরণ।

#ঘুমের সমস্যা

দুঃস্বপ্ন দেখা,মাঝরাতে উঠে যাওয়া,একা ঘুমাতে ভয় পাওয়া।

#পড়াশোনায় মন না বসা

ফোকাস কমে যাওয়া, স্কুলে যেতে না চাওয়া, ফলাফল খারাপ হওয়া।

#আগের পছন্দের জিনিসে আগ্রহ হারানো।

খেলা, বন্ধু, কার্টুন কিছুতেই আনন্দ না পাওয়া।

#নিজেকে দোষ দেওয়া

সব আমার জন্য হয়েছে, আমি খারাপ,এমন কথা বলা।

#অতিরিক্ত ভয় বা আঁকড়ে থাকা।মা-বাবা একটু দূরে গেলেও অস্থির হয়ে যাওয়া।

#হঠাৎ শারীরিক সমস্যা

পেট ব্যথা,মাথা ব্যথা,কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষায় বড় কারণ না পাওয়া।অনেক সময় মানসিক চাপ শরীরে প্রকাশ পায়।

#ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে

আবার বিছানা ভেজানো, আঙুল চোষা,বেবির মতো আচরণ করা,এগুলোও মানসিক অস্থিরতার ইঙ্গিত হতে পারে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,

বাচ্চারা সবসময় আমি কষ্টে আছি,বলবে না।তারা আচরণ দিয়ে সাহায্য চাইতে পারে।তাই বকা দেওয়ার আগে বোঝার চেষ্টা জরুরি,

সে কি আসলে খারাপ ব্যবহার করছে,নাকি ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছে?সন্তানের পাশে থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো তাকে নিরাপদ অনুভব করানো।তার কথা মন দিয়ে শোনা,বিচার না করা,এবং এটা বুঝানো

যাই হোক, তুমি একা না।


কি করবেন? 

যখন বুঝবেন সন্তানের মানসিক অবস্থা খারাপ যাচ্ছে,তখন সবচেয়ে জরুরি হলো তাকে ঠিক করে ফেলা নয়, বরং তাকে নিরাপদ অনুভব করানো। কারণ বাচ্চারা প্রথমে সমাধান না,আশ্রয় খোঁজে।

কি করতে পারেন,


#শান্তভাবে পাশে থাকুন

সবসময় প্রশ্নের চাপ দেবেন না,কি হয়েছে?, কেন এমন করছ?

বরং স্বাভাবিকভাবে সময় দিন। অনেক সময় বাচ্চা কথা বলার আগে নিরাপত্তা অনুভব করতে চায়।

তার অনুভূতিকে ছোট করবেন না।


#এতটুকু ব্যাপারে কাঁদছ?

এসব কিছু না।এ ধরনের কথা তার কষ্টকে আরও ভেতরে ঠেলে দেয়।তার অনুভূতি তার বয়স অনুযায়ী সত্যি।শুনুন, সঙ্গে সঙ্গে বিচার নয়।

সে যদি রাগ,ভয় বা কষ্টের কথা বলে,সাথে সাথে উপদেশ না দিয়ে আগে শুনুন।


#কখনো কখনো আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি,এই বাক্যটাই অনেক বড় ওষুধ।মা-বাবার ঝগড়া থেকে দূরে রাখুন

বড়দের তর্ক,দোষারোপ, কাঁদাকাঁদি, এগুলো শিশুর মনে গভীর ভয় তৈরি করে। বিশেষ করে তাকে কোনো পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করবেন না।


#রুটিন ঠিক রাখুন

খাওয়া,ঘুম,স্কুল,খেলাধুলানিয়মিত থাকলে বাচ্চারা মানসিকভাবে কিছুটা স্থিরতা পায়।ভালোবাসা প্রকাশ করুন।

অনেক বাবা-মা মনে করেন সন্তান জানেই যে তাকে ভালোবাসা হয়।কিন্তু কঠিন সময়ে সেটা মুখে বলা জরুরি।আমি তোমার পাশে আছি।তুমি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।তার সাথে ছোট ছোট সময় কাটান একসাথে হাঁটা,গল্প করা, ছবি আঁকা, রান্না এসব ছোট মুহূর্ত বাচ্চার ভেতরের চাপ কমায়।


#আচরণের পেছনের কারণ বুঝুন।সব খারাপ ব্যবহার দুষ্টুমি না। কখনো সেটা সাহায্যের সংকেতও হতে পারে।প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন

যদি দীর্ঘদিন ধরে সে খুব চুপচাপ থাকে,নিজেকে আঘাতের কথা বলে, অতিরিক্ত ভয় পায় বা স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়,তাহলে শিশু মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।সবশেষে একটা বিষয় খুব সত্যি,

সন্তান নিখুঁত বাবা-মা চায় না।সে চায় এমন মানুষ, যারা ভুল করলেও তাকে নিরাপদ ভালোবাসা দিতে জানে।


বিচ্ছেদের পরে বাবা মায়ের করনীয়:

বিচ্ছেদের পরে বাবা-মায়ের দায়িত্বটা আরও সংবেদনশীল হয়ে যায়, কারণ সম্পর্ক শেষ হলেও সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না।বরং তখনই তার সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা দরকার হয়।


*সন্তানকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক বজায় রাখা

বিচ্ছেদ হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে,বাবা-মা হিসেবে দায়িত্ব একই থাকে।

সন্তানের জন্য দুইজনকেই উপস্থিত থাকতে হবে,আবেগিকভাবে ও বাস্তবভাবে।


*সন্তানকে কোনো পক্ষ নিতে বাধ্য না করা

মা ভালো না বাবা ভালো,এই চাপ শিশুর মানসিকতা ভেঙে দেয়।

সে দুইজনকেই ভালোবাসতে পারে,এটা তাকে স্বাধীনভাবে থাকতে দিতে হবে।


*একে অপরের প্রতি অপমান না করা (সন্তানের সামনে)একজন আরেকজনকে খারাপ বলা মানে সন্তানের ভেতরের নিরাপত্তা নষ্ট করা।

সে তখন নিজের অর্ধেক পরিচয় নিয়েও দ্বিধায় পড়ে যায়।


*নিয়মিত যোগাযোগ রাখা (যার সাথে সন্তান থাকে না)

যে বাবা বা মা একসাথে থাকে না, তার নিয়মিত যোগাযোগ থাকা দরকার—ফোন, দেখা করা,ছোট সময় কাটানো।


*স্থিতিশীল রুটিন বজায় রাখা।স্কুল, ঘুম, খাবার, পড়াশোনা,সব যতটা সম্ভব আগের মতো রাখা।হঠাৎ বড় পরিবর্তন শিশুর উদ্বেগ বাড়ায়।


*ভালোবাসা নিশ্চিত করা

সন্তানকে বারবার বোঝাতে হবে আমরা আলাদা থাকলেও তুমি আমাদের দুইজনের কাছেই সমান গুরুত্বপূর্ণ।


*আবেগ শোনার জায়গা তৈরি করা সে কষ্ট পাবে, প্রশ্ন করবে,রাগ করবে,এসব স্বাভাবিক।

তার কথা মন দিয়ে শোনা জরুরি,চাপিয়ে দেওয়া নয়।


*আর্থিক ও দায়িত্ব ভাগ পরিষ্কার রাখা।কে কী দায়িত্ব নেবে,পড়াশোনা, খরচ,চিকিৎসা,এগুলো পরিষ্কার থাকলে ঝামেলা কমে।


*নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্কতা।নতুন জীবন শুরু করা যেতে পারে,কিন্তু সন্তানকে হঠাৎ নতুন পরিস্থিতিতে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না।ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।


*প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং নেওয়া

সন্তান যদি খুব ভেঙে পড়ে, ভয় পায় বা আচরণ বদলে যায়,তাহলে প্রফেশনাল সাহায্য খুব কার্যকর।


সবশেষে বাস্তব সত্য হলো,

বিচ্ছেদ সন্তানের জীবন নষ্ট করে না,যদি বাবা-মা দায়িত্বশীল থাকে।কিন্তু দায়িত্বহীন আচরণই সবচেয়ে বেশি ক্ষত তৈরি করে।


লেখাঃ ইশরাত জাহান ইনা 

sidebar ad