বিয়ে কি নারী-পুরুষের জন্য সমানভাবে সুখ বয়ে আনে? নাকি বৈবাহিক জীবনের সুবিধা-অসুবিধার ভার দুজনের ওপর সমানভাবে পড়ে না? সাম্প্রতিক ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোর এক গবেষণাকে ঘিরে এমনই প্রশ্ন সামনে এসেছে। গবেষণার ফলাফলের দাবি অনুযায়ী, সিঙ্গেল নারীরা অনেক ক্ষেত্রে সিঙ্গেল পুরুষদের তুলনায় বেশি সন্তুষ্ট ও সুখী। অন্যদিকে বিবাহিত পুরুষদের জীবনযাপনে সন্তুষ্টির মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় ছয় হাজার মানুষের
তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলাফল অনুযায়ী, সুখের বিভিন্ন সূচকে অবিবাহিত
নারীরা অবিবাহিত পুরুষদের তুলনায় এগিয়ে। তারা একা থাকাকে বেশি উপভোগ করেন। নিজেদের জীবন নিয়ে তুলনামূলকভাবে
সন্তুষ্ট থাকেন।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, ৩০ বছরের বেশি বয়সী
সিঙ্গেল নারীদের মধ্যে রিলেশিনশীপে
থাকার ইচ্ছা সিঙ্গেল পুরষদের চেয়েও বেশ কম বলে গবেষণায়
উঠে এসেছে। অর্থাৎ, একা থাকাকে তারা অনেক সময় সমস্যার পরিবর্তে একটি স্বস্তিদায়ক জীবনধারা
হিসেবেই দেখেন।
গবেষণায় আরোও জানলে অবাক করা বিষয় হলো সিঙ্গেল
মহিলা ও বিবাহিত পুরুষ সবচেয়ে সুখী মানুষ!
তাহলে বিবাহিত
নারীরা?
এখানেই ছবিটা বদলে যায়।
বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে সংসারের দৈনন্দিন
কাজ, সন্তান পালনের দায়িত্ব, ঘরের ব্যবস্থাপনা এবং পরিবারের সদস্যদের আবেগগত যত্ন- এসব দায়িত্বের বড় অংশ এখনো নারীদের ওপর
পড়ে। ফলে বিয়ের পর তাদের ওপর দায়িত্ব ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, বিবাহিত পুরুষরা অনেক ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব ও আবেগগত সহায়তা পান। রান্না, ঘর গোছানো, পারিবারিক ব্যবস্থাপনা কিংবা সম্পর্ক রক্ষার মতো কাজের বড় অংশ যদি সঙ্গী সামলে নেন, তাহলে পুরুষের জীবন তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক হয়ে ওঠে। এ কারণেই বিয়ের সুফল নারী ও পুরুষের জন্য সমান নয়—এমন প্রশ্নও উঠছে।
সিঙ্গেল নারীরা কেন বেশি সন্তুষ্ট?
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে তাদের
সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা।
অনেক অবিবাহিত নারী বন্ধু, পরিবার এবং
অন্যান্য নারীর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। ফলে তাদের সামাজিক
সহায়তার পরিধি বিস্তৃত থাকে। বিপরীতে, অনেক পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক বিয়ের পর আরও বেশি
করে জীবনসঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আর্থিক স্বাধীনতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখতে পারে। একজন নারী যখন নিজের আয় ও সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তখন
একা থাকাকে তিনি অনিবার্যতা নয়, বরং নিজের পছন্দ হিসেবে দেখতে পারেন।
বিয়ে তাহলে কার
জন্য বেশি লাভজনক?
গবেষণার ফলাফলকে সরলভাবে ‘বিয়ে পুরুষের
জন্য ভালো, নারীর জন্য খারাপ’—এভাবে
ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং এটি দেখায়, বৈবাহিক জীবনের সুবিধা অনেকটাই নির্ভর
করে সম্পর্কের ভেতরে কাজ, দায়িত্ব ও যত্ন কীভাবে ভাগ করা হচ্ছে তার ওপর।
যেখানে দুজন সঙ্গী ঘরের কাজ, সন্তান পালন,
অর্থনৈতিক দায়িত্ব এবং আবেগগত শ্রম সমানভাবে ভাগ করে নেন, সেখানে বিয়ে উভয়ের জীবনেই
ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু একজন সঙ্গী যদি সম্পর্ক থেকে নিয়মিত সুবিধা পান
এবং অন্যজনকে সেই সুবিধার বিনিময়ে অতিরিক্ত শ্রম দিতে হয়, তাহলে বৈবাহিক সম্পর্কের
লাভ-ক্ষতির হিসাব আর সমান থাকে না।
তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কে বেশি সুখী—বিবাহিত না অবিবাহিত?’ নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্ন হলো—বিয়ের পর
কে কতটা কাজ করছেন, কে কতটা যত্ন দিচ্ছেন এবং সেই শ্রমের স্বীকৃতি কতটা পাচ্ছেন?
সম্ভবত এখানেই নারী ও পুরুষের বৈবাহিক সুখের পার্থক্যের আসল সূত্রটি লুকিয়ে আছে।