পরিবেশ সচেতনতা নাকি নতুন ব্যবসায়িক কৌশল—তর্ক থামছেই না
দেশের অন্যতম
জনপ্রিয় হস্ত ও কারুশিল্পভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Aarong একবার ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং কমাতে ২০২৫ সালের ১
সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকদের বিনামূল্যে ব্যাগ দেওয়া বন্ধ করে। শুরু থেকেই
সিদ্ধান্তটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। কেউ এটিকে
পরিবেশ রক্ষার সাহসী উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়
চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে।
এবার সেই উদ্যোগের
আর্থিক প্রভাবও সামনে এলো। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে রবিবার (১০ মে) আয়োজিত এক
সংবাদ সম্মেলনে আড়ং জানায়, ২০২৫
সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সাত মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৩
লাখ ১২ হাজার পেপার ব্যাগ বিক্রি করেছে। এসব ব্যাগ বিক্রি থেকে তাদের আয় হয়েছে ২
কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ৮১২ টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে
তুলে ধরা তথ্যে দেখা যায়, আগের
বছরের একই সময়ে আড়ং বিনামূল্যে প্রায় ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ব্যাগ বিতরণ করেছিল। সেই
তুলনায় এবার প্রায় ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ব্যাগের ব্যবহার কমেছে। আড়ংয়ের দাবি, এই পরিমাণ ব্যাগ কম ব্যবহারের ফলে প্রায় ছয়
হাজার গাছ রক্ষার সমপরিমাণ পরিবেশগত সুবিধা পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির
পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যাগ
বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয়
করা হবে। এর আওতায় ব্র্যাকের অতিদরিদ্র উত্তরণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৪০০ অতিদরিদ্র
নারীর মধ্যে ৮০০টি মেহগনি ও ফলজ গাছের চারা বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি বরেন্দ্র
অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার ও বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণে ৫০ লাখ টাকা
সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া জাপানি ‘মিয়াওয়াকি’ পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র বনাঞ্চল তৈরির
উদ্যোগ ‘মিশন গ্রিন’-এও আরও ৫০ লাখ টাকা সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আড়ংয়ের
ব্যবস্থাপনা পরিচালক Tamara Hasan Abed সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “কাগজের
ব্যাগ পচনশীল হলেও এগুলো তৈরিতে বিপুল পরিমাণ গাছ কাটতে হয়। আমরা চাই মানুষ আবার
নিজেদের ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে আসার সংস্কৃতিতে ফিরে আসুক।” তিনি আরও বলেন, আগে বিনামূল্যে ব্যাগ দেওয়ার কারণে অনেকেই
প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যাগ নিতেন, ফলে অপচয় বাড়ত। বর্তমানে গ্রাহকরা ব্যাগ না নিলে বিলের সঙ্গে ১৫ টাকা
ক্যাশব্যাক দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে আড়ংয়ের এই
পদক্ষেপ ঘিরে বিতর্ক এখনো থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন
তুলছেন—পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ যদি মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে ব্যাগ বিক্রি থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় কেন?
আবার অন্য একটি অংশ মনে করছে, দীর্ঘদিনের ‘ফ্রি ব্যাগ’ সংস্কৃতি থেকে
বেরিয়ে আসতে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে,
এই উদ্যোগ বাংলাদেশের খুচরা বাজারে
ভোক্তা আচরণ পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে
দিয়েছে, পরিবেশ সচেতনতা,
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং
ব্যবসায়িক কৌশল—এই তিনটি বিষয় এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তঃসম্পর্কিত।