কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো সময় ব্যর্থতার মুখোমুখি হন। কারও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্ট প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, কেউ পদোন্নতির দৌড়ে পিছিয়ে পড়েন, কেউ আবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পান। কখনো সহকর্মীদের সামনে সমালোচনা, অপমান কিংবা একটি ভুল সিদ্ধান্তও মনে গভীর দাগ কেটে যায়। সময়ের সঙ্গে সেই ঘটনার তীব্রতা কমে এলেও তার স্মৃতি অনেক সময় আচরণের ভেতরে থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে একই ধরনের সুযোগ সামনে এলে মানুষটি আর আগের মতো এগিয়ে যেতে পারেন না। মনে প্রশ্ন জাগে, আবার যদি ব্যর্থ হই? আবার যদি সবাই আমাকে অযোগ্য ভাবে? আবার যদি আগের মতো অপমানিত হতে হয়?
এভাবেই অতীতের একটি ব্যর্থতা কখনো কখনো বর্তমানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। যে মানুষটি একসময় নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী ছিলেন, তিনিই হয়তো পরে ঝুঁকি এড়িয়ে চলেন। যে কর্মী মিটিংয়ে নিজের মতামত তুলে ধরতেন, তিনি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় নীরব থাকেন। যে ব্যক্তি বড় দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনি হয়তো সুযোগ এসেও বলেন, ‘এবার থাক, পরে দেখা যাবে।’
বাইরে থেকে এসব আচরণকে অনাগ্রহ, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা উদ্যোগহীনতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাজ করতে পারে আরও গভীর একটি অনুভূতি—আবার ব্যর্থ হওয়ার ভয়। এখানে মানুষটি শুধু সাফল্য অর্জনের জন্য লড়াই করছেন না; বরং অতীতের কষ্টকর অভিজ্ঞতা আবার ফিরে আসবে কি না, সেই আশঙ্কার সঙ্গেও প্রতিনিয়ত লড়ছেন।
ব্যর্থতার স্মৃতি যখন আত্মবিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী
কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক রকম নয়। কেউ একটি প্রজেক্টে ব্যর্থ হয়ে পরেরবার আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নেন। আবার কেউ একই অভিজ্ঞতার পর নিজের সক্ষমতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েন। পার্থক্যটা অনেক সময় শুধু ব্যর্থতার ঘটনায় নয়, বরং সেই ঘটনাকে মানুষ কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন, তার ওপরও নির্ভর করে।
কোনো একটি কাজে ব্যর্থ হওয়া আর নিজেকে ব্যর্থ মানুষ মনে করা এক বিষয় নয়। কিন্তু যখন একটি ভুল ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তাঁর মনে হতে পারে, ‘আমি এই কাজের জন্য যথেষ্ট ভালো নই’, ‘আমাকে দিয়ে হবে না’ কিংবা ‘চেষ্টা করেও লাভ নেই’। এ ধরনের ধারণা নতুন পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতার ভয় নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাতেও দেখা যায়, নেতিবাচক মূল্যায়নের আশঙ্কা এবং নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ মানুষকে এমন আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে তিনি নিজের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ নেওয়ার বদলে অযোগ্য প্রতিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলেন।
ফলে একটি ব্যর্থতা ধীরে ধীরে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যে ব্যক্তি একসময় নতুন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাতেন, তিনি হয়তো এখন অপেক্ষা করেন অন্য কেউ দায়িত্বটি নিক। নতুন কোনো ধারণা মাথায় এলেও তা প্রকাশ করার আগে বহুবার ভাবেন। নিজের কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন। এভাবে প্রত্যাখ্যানের ভয় থেকে তৈরি হয় নীরবতা, আর নীরবতা থেকে হারিয়ে যেতে পারে বিকশিত হওয়ার অনেক সুযোগ।
নতুন সুযোগ সামনে এলেই পুরোনো অভিজ্ঞতার ফিরে আসা
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন কর্মী একবার গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনায় ভুল করেছিলেন। উপস্থিত কর্মকর্তাদের কেউ তাঁর কাজের সমালোচনা করেছিলেন, কেউ হয়তো অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ঘটনাটি তাঁর কাছে এতটাই বিব্রতকর ছিল যে পরবর্তী কয়েক মাস তিনি আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনায় স্বেচ্ছায় অংশ নেননি।
এরপর একদিন তাঁকে একটি বড় ক্লায়েন্টের সামনে নতুন প্রজেক্ট উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হলো। এটি হতে পারত তাঁর দক্ষতা দেখানোর সুযোগ, পেশাগত উন্নতির সিঁড়ি। কিন্তু দায়িত্বটি পাওয়ার পর আনন্দের বদলে তাঁর মনে জেগে উঠল পুরোনো ভয়। আগের ভুলের দৃশ্য মনে পড়তে লাগল। মনে হলো, এবারও যদি কথা আটকে যায়? ক্লায়েন্ট অসন্তুষ্ট হলে কী হবে? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবার সমালোচনা করলে?- শেষ পর্যন্ত তিনি হয়তো দায়িত্বটি এড়িয়ে গেলেন কিংবা অন্য কাউকে সুযোগটি নিতে দিলেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নতুন পরিস্থিতিটি আগের ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি ছিল না। তবু অতীতের অভিজ্ঞতা বর্তমানের পরিস্থিতিকে একই রকম বিপজ্জনক বলে মনে করিয়েছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ব্যর্থতা এড়িয়ে চলার প্রবণতার একটি উদাহরণ হতে পারে।
এড়িয়ে যাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি মিলতে পারে। উপস্থাপনায় ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকল না, সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হলো না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে একই ধরনের সুযোগ বারবার এড়িয়ে গেলে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতার ভয় ও কাজ-পরবর্তী পুনরাবৃত্ত চিন্তার সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও এই আশঙ্কা, আত্মসন্দেহ এবং ব্যর্থতার সম্ভাবনা এড়িয়ে চলার মধ্যে সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কি এই ভয় বাড়িয়ে দেয়?
অতীতের ব্যর্থতার ছায়া শুধু ব্যক্তির মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যে প্রতিষ্ঠানে ছোট ভুলের জন্য কর্মীদের প্রকাশ্যে অপমান করা হয়, যেখানে ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে না দেখে অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে কর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি নিতে ভয় পেতে পারেন। তাঁরা নতুন ধারণা প্রকাশের বদলে নিরাপদ পথ বেছে নেন, ভুল হতে পারে এমন কাজ থেকে দূরে থাকেন এবং সমস্যার কথা গোপন করার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে, যে কর্মপরিবেশে কর্মীরা প্রশ্ন করতে পারেন, ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং অসম্মানিত হওয়ার ভয় ছাড়াই মতামত প্রকাশ করতে পারেন, সেখানে শেখা ও উন্নতির সুযোগ বাড়ে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন কর্মক্ষেত্রে এই নিরাপদ পরিবেশকে Psychological Safety বা মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ ধরনের নিরাপত্তার অভাব ভুল সংশোধন, নতুন ধারণা প্রকাশ এবং কার্যকর দলগত কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তাই কোনো কর্মী বারবার সুযোগ এড়িয়ে চললে তাঁকে শুধু আত্মবিশ্বাসহীন বলে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর আগের অভিজ্ঞতা, কর্মক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া জানানোর ধরন এবং ভুল করলে কী ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অতীতের ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ
অতীতের ব্যর্থতা ভুলে যাওয়া সব সময় সম্ভব নয়, আর ভুলে যাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বদলানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমেই প্রয়োজন, ব্যর্থতার ঘটনাকে নিজের সম্পূর্ণ যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে না দেখা। একটি প্রজেক্ট প্রত্যাশামতো সফল হয়নি বলে একজন কর্মী সব কাজে অদক্ষ হয়ে যান না। একটি সাক্ষাৎকারে প্রত্যাখ্যাত হওয়া মানেই তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। নির্দিষ্ট ঘটনার ভুল, সীমাবদ্ধতা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যায়; কিন্তু সেই ঘটনাকে নিজের স্থায়ী পরিচয় বানিয়ে ফেলা উন্নতির পথ সংকুচিত করে।
দ্বিতীয়ত, নতুন সুযোগের মুখোমুখি হলে একবারেই বড় সাফল্য অর্জনের চাপ না নিয়ে ছোট পদক্ষেপে এগোনো যেতে পারে। যিনি আগে উপস্থাপনায় ভুল করেছিলেন, তিনি প্রথমে ছোট দলের সামনে অনুশীলন করতে পারেন। যিনি সমালোচনার ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন না, তিনি প্রথমে পরিচিত সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারেন। ধীরে ধীরে নতুন অভিজ্ঞতা পুরোনো আশঙ্কাকে বাস্তবতার আলোকে যাচাই করার সুযোগ তৈরি করে।
তৃতীয়ত, ব্যর্থতার পর নিজের সঙ্গে কীভাবে কথা বলছেন, তা খেয়াল করা জরুরি। ‘আমি পারি না’ বলার বদলে প্রশ্ন করা যেতে পারে—‘কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছিল?’, ‘পরেরবার কী পরিবর্তন করতে পারি?’ এতে ব্যর্থতা ব্যক্তিগত অপমানের বদলে শেখার উপকরণ হয়ে উঠতে পারে। একটি প্রজেক্ট ব্যর্থ হওয়ার পর কর্মীরা কীভাবে সেই অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করেন, তা তাঁদের পরবর্তী শেখার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলে সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় উঠে এসেছে।
আর যদি অতীতের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি কিংবা কাজ এড়িয়ে চলার প্রবণতা তৈরি করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ব্যর্থতা শেষ কথা নয়
কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথে অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যদি প্রতিটি নতুন সুযোগের সামনে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়, তাহলে সতর্কতা একসময় সীমাবদ্ধতায় পরিণত হয়।
একবার ব্যর্থ হওয়া মানে একই পরিণতি আবার ঘটবেই, এমন নয়। আগের ভুল থেকে শেখা যায়, প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়ানো যায়, সিদ্ধান্তের ধরন বদলানো যায় এবং আরও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে চেষ্টা করা যায়। সাফল্যের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না, কিন্তু ব্যর্থতার আশঙ্কায় প্রতিটি সুযোগ ছেড়ে দিলে নিজের সম্ভাবনাকে যাচাই করার পথও বন্ধ হয়ে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি ব্যর্থতা আপনার জীবনের একটি ঘটনা—আপনার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। অতীতকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন তাকে ভবিষ্যতের একমাত্র নির্দেশক হতে না দেওয়া। কারণ কর্মক্ষেত্রে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস মানে কখনোই ব্যর্থ না হওয়া নয়, বরং ব্যর্থতার স্মৃতি সঙ্গে নিয়েও নতুন কিছু শেখার এবং আবার চেষ্টা করার সুযোগ নিজেকে দেওয়া।
সূত্র: PLOS ONE