মন কী সবসময় খারাপ ভাবনা ভাবছে? নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার ৫ উপায়

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬

মন কী সবসময় খারাপ ভাবনা ভাবছে? নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার ৫ উপায়

মানুষের মন বড় অদ্ভুত। কখনো চারপাশে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও মনের ভেতর জমে ওঠে অজানা আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা আর অস্বস্তি। ভবিষ্যতে কী হবে, কোনো ভুল হয়ে যাবে কি না, অন্যরা কী ভাবছে কিংবা অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা আবার ফিরে আসবে কি না—এসব ভাবনা কখনো কখনো মনের ওপর এমনভাবে চেপে বসে যে বর্তমানের ভালো মুহূর্তগুলোও আর উপভোগ করা যায় না। অথচ বাস্তবে সবকিছু খারাপ হচ্ছে, এমন নয়। অনেক সময় আমাদের মনই সম্ভাব্য বিপদের ছবি বারবার আঁকতে থাকে।


আপনার দেওয়া ছবিটিতে এই মানসিক অবস্থারই একটি সহজ অথচ অর্থবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একটি মুখের মাথার অংশে নীল ও লাল রঙের জট পাকানো রেখা, যা প্রতীকীভাবে বোঝায় মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া অসংখ্য চিন্তা। ছবির চারপাশের বার্তাগুলোও আমাদের পরিচিত কিছু অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়—সবকিছু ঠিক থাকলেও খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ নিয়ে বারবার দুশ্চিন্তা, একই চিন্তা ঘুরেফিরে আসা এবং নিজের মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন জাগা।


এটি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; বরং আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রত্যাশা ও তথ্যের অবিরাম প্রবাহের মধ্যে অনেক মানুষেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাকে বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, নেতিবাচক চিন্তা কেন তৈরি হয় এবং কখন তা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।


কেন একই চিন্তা বারবার ফিরে আসে?


কোনো সমস্যা সামনে এলে তা নিয়ে ভাবা স্বাভাবিক। বরং ভাবনার মাধ্যমেই আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজি, সিদ্ধান্ত নিই এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন চিন্তা আর সমাধানের পথ দেখায় না; বরং একই আশঙ্কার চারপাশে বারবার ঘুরতে থাকে।


মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের পুনরাবৃত্ত ও নেতিবাচক চিন্তার একটি পরিচিত ধারণা হলো রুমিনেশন (Rumination)। এতে মানুষ অতীতের ভুল, অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা কিংবা বর্তমানের দুশ্চিন্তা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকে। চিন্তাগুলো এতটাই পুনরাবৃত্ত হতে পারে যে অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। 


ধরা যাক, কেউ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করে ফেলেছেন। কাজটিতে কোনো বড় ভুল হয়নি, তবু তাঁর মনে প্রশ্ন জাগছে—কোথাও ভুল রয়ে গেল না তো? অন্যরা কি তাঁর কাজে অসন্তুষ্ট? ভবিষ্যতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না তো? একটির পর একটি প্রশ্ন মনের মধ্যে জমতে থাকে। বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করার বদলে ব্যক্তি তখন সম্ভাব্য বিপদ কল্পনা করেই মানসিক শক্তি ব্যয় করতে থাকেন।


এই প্রবণতার পেছনে থাকতে পারে অনিশ্চয়তা সহ্য করতে অসুবিধা, দীর্ঘস্থায়ী চাপ, অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা কিংবা ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখার আকাঙ্ক্ষা। তবে সবার ক্ষেত্রে কারণ এক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চাপের প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হয়। দীর্ঘস্থায়ী চাপ মন ও শরীর—উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে। 


সব ঠিক থাকলেও কেন খারাপ কিছু ঘটবে বলে মনে হয়?


ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, সবকিছু ঠিকঠাক চললেও মনে হতে পারে, খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে উদ্বেগের সম্পর্ক থাকতে পারে। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মন কখনো কখনো সম্ভাব্য বিপদের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। এর ফলে যা ঘটতে পারে, তা-ই যেন নিশ্চিতভাবে ঘটবে—এমন অনুভূতি তৈরি হয়।


যেমন, চাকরির সাক্ষাৎকারের আগে কেউ ভাবতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই ব্যর্থ হবেন। পরীক্ষার আগে একজন শিক্ষার্থী কল্পনা করতে পারেন, সব পড়া ভুলে যাবেন। প্রিয়জনের ফোন দেরিতে এলে কারও মনে হতে পারে, নিশ্চয়ই কোনো বিপদ ঘটেছে। এসব আশঙ্কা বাস্তব ঘটনার প্রমাণ নয়; বরং সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া চিন্তা।


এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাওয়া মানেই সেটি সত্যি, এমন নয়। একইভাবে, ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে, সেটিও ঠিক নয়। প্রয়োজন হলো বাস্তব পরিস্থিতি ও মনের আশঙ্কাকে আলাদা করে দেখতে শেখা।


অতীতের ঘটনা বারবার মনে পড়া


ছবিতে একই চিন্তা বারবার ফিরে আসার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। অনেক সময় অতীতে বলা কোনো কথা, করা কোনো ভুল কিংবা বিব্রতকর অভিজ্ঞতা মনের মধ্যে বারবার ফিরে আসে। মানুষ ভাবতে থাকেন, অন্যভাবে বললে ভালো হতো, অন্য সিদ্ধান্ত নিলে হয়তো ফলাফল ভিন্ন হতো।


অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উপকারী। কিন্তু একই ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবলেও যখন নতুন কোনো উপলব্ধি আসে না, তখন তা মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে। কেউ কেউ এর কারণে বর্তমানের কাজে মন দিতে পারেন না, সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন কিংবা ঘুমের সময়ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পান না।


এই চক্রে চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণ পরস্পরকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ ভাবলেন যে অন্যরা তাঁকে পছন্দ করেন না। এতে তাঁর মন খারাপ হলো এবং তিনি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিলেন। যোগাযোগ কমে যাওয়ায় একাকিত্ব বাড়ল, আর সেই একাকিত্ব আবার আগের ধারণাটিকে আরও সত্য বলে মনে করাল। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা NHS-এর ব্যাখ্যায়, এমন চিন্তা-অনুভূতি-আচরণের চক্র ভাঙতে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) সহায়ক হতে পারে। 


নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভাঙতে কী করা যায়?


মনের সব চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে চিন্তা এলে তার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করব, তা ধীরে ধীরে শেখা যায়। এর জন্য বড় কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি ছোট অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।


প্রথমত, চিন্তাটিকে চিন্তা হিসেবেই শনাক্ত করুন। মনে যখন আসে, ‘নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটবে’, তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটি কি কোনো বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি, নাকি আমার আশঙ্কা? এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য চিন্তাকে জোর করে দূর করা নয়; বরং সেটিকে একটু দূর থেকে দেখার সুযোগ তৈরি করা।


দ্বিতীয়ত, যা নিয়ন্ত্রণে আছে, সেদিকে মনোযোগ দিন। ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনা আগাম নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু আজকের একটি প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করা, কারও সঙ্গে কথা বলা কিংবা কোনো সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা সম্ভব। যে বিষয়গুলো পরিবর্তন করা যায় না, সেগুলো নিয়ে অবিরাম ভাবার বদলে বর্তমানের কার্যকর পদক্ষেপে মন দেওয়া উপকারী হতে পারে।


তৃতীয়ত, মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনুন। ধীরে শ্বাস নেওয়া, আশপাশের দৃশ্য ও শব্দে মনোযোগ দেওয়া কিংবা হাঁটার সময় শরীরের নড়াচড়া লক্ষ করা—এ ধরনের অনুশীলন চিন্তার ঘূর্ণি থেকে কিছুটা বিরতি দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Doing What Matters in Times of Stress নির্দেশিকায়ও বর্তমান মুহূর্ত সম্পর্কে সচেতন হওয়া, কঠিন অনুভূতিকে শনাক্ত করা এবং নিজের প্রতি সদয় হওয়ার মতো কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। 


চতুর্থত, শরীরের যত্ন নিন। নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা এবং কাছের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত খবর বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার যদি উদ্বেগ বাড়ায়, তাহলে সেগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নেওয়া যেতে পারে। 


পঞ্চমত, নিজের সঙ্গে কথা বলার ধরন বদলান। কোনো ভুল হলে নিজেকে ব্যর্থ বা অযোগ্য আখ্যা না দিয়ে ভাবুন, এই অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা যায়। অন্যের প্রতি আমরা যে সহানুভূতি দেখাই, নিজের প্রতিও তার কিছুটা প্রয়োগ করা দরকার। নেতিবাচক চিন্তা ফিরে এলে নিজেকে দোষারোপ না করে শান্তভাবে সেটিকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করুন।


কখন পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন?


মাঝেমধ্যে দুশ্চিন্তা হওয়া মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তাই নেতিবাচক চিন্তা এলেই কোনো মানসিক রোগ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তবে চিন্তা ও উদ্বেগ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, ঘুম বা মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়, কাজকর্ম ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে কিংবা দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা কঠিন করে তোলে, তাহলে মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।


সূত্র: ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস

sidebar ad