যখন টাকাই হয়ে ওঠে সমাজের একমাত্র মূল্য: তখন কী একটি রাষ্ট্র সহজে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে?


যখন টাকাই হয়ে ওঠে সমাজের একমাত্র মূল্য: তখন কী একটি রাষ্ট্র সহজে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে?

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনীতিতে নয়, বরং তার মূল্যবোধে। অর্থনীতি একটি জাতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধই একটি জাতিকে সভ্য করে। ইতিহাস সাক্ষী—যে সমাজে জ্ঞান, সততা, মানবিকতা ও ন্যায়বোধ অর্থের কাছে পরাজিত হয়েছে, সেখানে উন্নয়নের সুউচ্চ অট্টালিকা দাঁড়ালেও ভেতরে ভেতরে সেই সমাজ ভেঙে পড়েছে।


ধরা যাক, একটি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ পর্যন্ত সবাই যদি বিশ্বাস করে, ‘টাকাই সব।’ টাকা থাকলে সম্মান, টাকা থাকলে পদ, টাকা থাকলে সুযোগ, টাকা থাকলে বিচার, টাকা থাকলে পরিচয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, সেই সমাজে কী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব, নৈতিকতা কিংবা সুশীল সমাজ টিকে থাকতে পারে?


সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, এ ধরনের সমাজকে শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। কারণ তখন সমস্যাটি অর্থনীতির নয়; সমস্যাটি সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং সামাজিক চেতনার।


অর্থ যখন মূল্যবোধকে প্রতিস্থাপন করে


সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার দেখিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে কেবল অর্থ নয়, একটি সমাজের নৈতিক সংস্কৃতিও কাজ করে। অন্যদিকে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ু বলেন, সমাজে শুধু অর্থনৈতিক পুঁজি নয়, সামাজিক পুঁজি ও সাংস্কৃতিক পুঁজিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


কিন্তু যখন অর্থই একমাত্র পুঁজি হয়ে যায়, তখন একজন শিক্ষক আর একজন অসৎ ব্যবসায়ীর সামাজিক মর্যাদা একই মানদণ্ডে বিচার হয় না। একজন গবেষকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের চেয়ে একজন বিত্তশালী ব্যক্তির সাময়িক ক্ষমতা বেশি গুরুত্ব পায়। তখন সমাজ ধীরে ধীরে মেধাকে নয়, সম্পদকে অনুসরণ করতে শুরু করে।


এর ফলেই জন্ম নেয় একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি—‘সফল হও, যেভাবেই হোক।’


সুশীল সমাজ কেন দুর্বল হয়ে পড়ে?


সুশীল সমাজ বলতে আমরা শুধু কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে বুঝি না। এর মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং সচেতন নাগরিক—যাঁরা রাষ্ট্রকে নৈতিক দিকনির্দেশনা দেন।


কিন্তু যখন অর্থই সামাজিক মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে যায়, তখন এই মানুষগুলোর সামাজিক প্রভাব কমতে থাকে।


একজন গবেষক হয়তো ৩০ বছর গবেষণা করে সমাজের জন্য অবদান রাখলেন, কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সম্মান পেয়ে গেলেন এমন একজন, যিনি শুধু বিপুল সম্পদের মালিক।


ফলে তরুণ প্রজন্মের সামনে একটি নতুন বার্তা পৌঁছে যায়—


‘সৎ হওয়ার দরকার নেই; ধনী হওয়াই যথেষ্ট।’


এই মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।


দুর্নীতির মনস্তত্ত্ব এখানেই জন্ম নেয়


মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা রয়েছে—Normative Behaviour। অর্থাৎ, মানুষ তার আশপাশের মানুষের আচরণকেই স্বাভাবিক মনে করে।


যদি একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই দেখে—


চাকরি পেতে ঘুষ লাগে,

পদোন্নতিতে তদবির লাগে,

সম্মান পেতে অর্থ লাগে,

আইনের প্রয়োগেও অর্থের প্রভাব রয়েছে,


তাহলে তার কাছে এগুলোই স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে ওঠে।


এভাবেই দুর্নীতি শুধু একটি অপরাধ থাকে না; এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।


বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্য অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের চেয়েও বিপজ্জনক


বিশ্বব্যাংক বহুবার বলেছে, দুর্বল প্রতিষ্ঠান (Weak Institutions) উন্নয়নের বড় বাধা। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কেন দুর্বল হয়?


কারণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন মানুষ।


যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ, পরিচয় বা প্রভাব কাজ করে, তখন প্রতিষ্ঠানের মান ধীরে ধীরে কমে যায়।


ফলে—


বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হয়,

গবেষণা কমে যায়,

সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা হারায়,

বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়,

প্রশাসনে দক্ষতার পরিবর্তে আনুগত্য মূল্য পায়।


এটিই একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।


তাহলে কী এমন সমাজ কখনও পরিবর্তিত হয় না?


ইতিহাস বলছে—হয়।


কিন্তু সহজে নয়।


দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, ফিনল্যান্ড কিংবা নর্ডিক দেশগুলোর ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি তারা শিক্ষা, আইন, জবাবদিহি এবং সামাজিক নৈতিকতার ওপর সমান গুরুত্ব দিয়েছে।


একটি সমাজ তখনই পরিবর্তিত হতে শুরু করে, যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে—


সৎ মানুষও সফল হতে পারে,

আইন সবার জন্য সমান,

মেধার মূল্য আছে,

রাষ্ট্র ব্যক্তির চেয়ে বড়,

সম্মান কেনা যায় না; অর্জন করতে হয়।

কেন পরিবর্তন এত কঠিন?


কারণ এটি কেবল সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়।


এটি একটি collective mindset বা সমষ্টিগত মানসিকতার পরিবর্তনের বিষয়।


একটি প্রজন্ম যদি অর্থকে একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিশ্বাস করে, তাহলে সেই বিশ্বাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যায়।


ফলে একটি সামাজিক চক্র তৈরি হয়—


অর্থ → ক্ষমতা → প্রভাব → আরও অর্থ → আরও ক্ষমতা।


এই চক্র ভাঙতে বহু বছর লাগে।


পরিবর্তনের শুরু কোথায়?


পরিবর্তনের শুরু হয় তিনটি জায়গা থেকে।


এক. পরিবার


যদি বাবা-মা সন্তানকে শুধু বলেন, ‘বড় হয়ে অনেক টাকা উপার্জন করো’, কিন্তু কখনও না বলেন, ‘ভালো মানুষ হও’, তাহলে সমস্যার শুরু পরিবার থেকেই।


দুই. শিক্ষা


শিক্ষা যদি শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হয়, চরিত্র গঠনের নয়, তাহলে সমাজে জ্ঞান থাকবে, কিন্তু প্রজ্ঞা থাকবে না।


তিন. নেতৃত্ব


রাষ্ট্রের নেতৃত্ব, ব্যবসায়িক নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এবং সামাজিক নেতৃত্ব—সবখানেই সততা ও জবাবদিহির উদাহরণ তৈরি করতে হবে।


মানুষ বক্তৃতা থেকে কম শেখে; উদাহরণ থেকে বেশি শেখে।


সুশীল সমাজের নতুন ভূমিকা


আজকের পৃথিবীতে শুধু সমালোচনা করলেই সুশীল সমাজের দায়িত্ব শেষ হয় না।


তাদের এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে—


একজন সৎ শিক্ষক সম্মান পান,

একজন গবেষকের কথা গুরুত্ব পায়,

একজন উদ্যোক্তা কর ফাঁকি না দিয়েও সফল হতে পারেন,

একজন সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ না নিয়েও মর্যাদা নিয়ে অবসর নিতে পারেন।


এই পরিবর্তন আইন একা করতে পারবে না।


এটি সামাজিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।


পরিশেষে


যে সমাজে অর্থই একমাত্র পরিচয় হয়ে যায়, সেখানে নৈতিকতা ধীরে ধীরে বিলাসিতায় পরিণত হয়। আর যেখানে নৈতিকতা বিলাসিতা, সেখানে দুর্নীতি ব্যতিক্রম নয়; নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।


তবুও আশার জায়গা আছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, কোনো সমাজ চিরকাল মূল্যবোধের সংকটে আটকে থাকে না। তবে সেই পরিবর্তন শুরু হয় তখনই, যখন একটি জাতি সম্মানকে অর্থের সঙ্গে নয়, চরিত্রের সঙ্গে; সাফল্যকে সম্পদের সঙ্গে নয়, অবদানের সঙ্গে; আর ক্ষমতাকে প্রভাবের সঙ্গে নয়, দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে শেখে।


একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই ঘটে, যখন মানুষ প্রশ্ন করে—‘কার কাছে কত টাকা আছে?’—এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ‘কার মধ্যে কত সততা, কত জ্ঞান এবং কত মানবিকতা আছে?’


কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থ একটি সমাজকে ধনী করতে পারে, কিন্তু কেবল মূল্যবোধই একটি জাতিকে মহান করে।

sidebar ad