ফার্স্ট এইড বক্স: ছোট জিনিসে বড় ভরসা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬

ফার্স্ট এইড বক্স: ছোট জিনিসে বড় ভরসা

শায়লা জাহান


সন্ধ্যেবেলা। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর ঘরের ভেতর পরিবারের সবাই মিলে জমে উঠেছে গল্পের আসর। এমন আবহে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা আর গরম গরম  পাকোড়া যেন আনন্দটাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই রেণুও উঠে গেলেন রান্নাঘরে, সবার জন্য পছন্দের নাস্তা বানাতে। তেল গরম হয়েছে, একের পর এক পাকোড়া কড়াইয়ে ছাড়ছেন তিনি। 


ঠিক তখনই, চোখের পলকে কড়াই থেকে ছিটকে আসা ফুটন্ত গরম তেল এসে পড়ল তাঁর হাতে। মুহূর্তেই আনন্দমুখর পরিবেশ বদলে গেল উৎকণ্ঠায়। কেউ ব্যান্ডেজ খুঁজছে, কেউ বার্ন জেল, কেউ বা আবার তুলা আর অ্যান্টিসেপটিক কোথায় রেখেছে তা-ই মনে করতে পারছে না। প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো জোগাড় করতে করতেই কেটে গেল মূল্যবান কয়েকটি মিনিট। 


এমন সিনারিও শুধু এই একটি পরিবারেই নয়, প্রায় প্রতিটি ঘরেই ঘটে। কখনো শিশুর হাঁটু ছিলে যায় তো কখনো বা কাটাকাটি করতে যেয়ে ছুরি দিয়ে আংগুল কেটে যায়, আবার কখনো হঠাৎ জ্বর বা অ্যালার্জির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব মুহূর্তে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন হয় প্রস্তুতির। আর সেই প্রস্তুতির সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো একটি সঠিকভাবে সাজানো ফার্স্ট এইড বক্স। কারণ ছোট্ট এই একটি বক্স, বড় বিপদের প্রথম ভরসা। 


ফার্স্ট এইড বক্স হলো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী, যন্ত্রপাতি এবং ওষুধের একটি সংগ্রহ যা পেশাদার চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ছোটখাটো আঘাত বা হঠাৎ অসুস্থতার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও সাময়িক চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হয়। একটি সুসজ্জিত কিট এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যাতে কেটে যাওয়া, ছিলে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, মচকানো এবং মৃদু অ্যালার্জির মতো সাধারণ কিন্তু জরুরী পরিস্থিতিগুলো গুরুতর আকার ধারণ করার আগেই সামাল দেওয়া যায়।  


যদিও আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই ছিল, আমরা বর্তমানে যে আধুনিক ফার্স্ট এইড কিট দেখি, তাঁর উদ্ভাবন মূলত ১৮০০ এর দশকের শেষের দিকে হয়েছিলো। রবার্ট উড জনসন, যিনি ১৮৮৬ সালে জনসন অ্যান্ড জনসন কর্পোরেশন সহ-প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁকেই প্রায়শই ফার্স্ট এইড বক্স আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তারপর থেকে, ফার্স্ট এইড কিট উন্নত হয়েছে এবং জরুরী পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের জন্য একটি অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে। 


ফার্স্ট এইড কিট সাধারণত বিভিন্ন আকার ও আয়তনের হয়ে থেকে। স্থানীয় ওষুধের দোকানে এগুলো পাওয়া যেতে পারে আবার আপনি নিজেও এটি তৈরি করে নিতে পারেন। আপনি তৈরি করা কিট কিনুন বা নিজেই এটি প্রস্তুত করুন, উভয় ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করুন যে এতে প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী রয়েছে। একটি আদর্শ পারিবারিক ফার্স্ট এইড বক্সে মূলত চার ধরনের জিনিস থাকা উচিৎ-


ক্ষত পরিষ্কার ও ড্রেসিং সামগ্রী


- অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড বা ক্রিম যেমন স্যাভলন, ডেটল বা পোভিডিন-আয়োডিন (যেমন ভায়োডিন) মলম

- ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও ঢাকার জন্য জীবাণুমুক্ত গজ ও তুলো

- গজ আটকে রাখার জন্য রোল ব্যান্ডেজ ও আঠালো টেপ

- ছোটখাটো কাটার জন্য বাহিরের ময়লা বা কণা প্রবেশ করে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়,সেজন্য বিভিন্ন আকারের ওয়াটারপ্রুভ ব্যান্ড-এইড

- মচকে যাওয়া বা পেশির ব্যথায় ব্যবহারের  জন্য ক্রেপ ব্যান্ডেজ 


প্রয়োজনীয় সাধারণ ওষুধপত্র


- জ্বর ও সাধারন ব্যথানাশকের জন্য প্যারাসিটামল (শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের উপযোগী)

- অ্যালার্জিজনিত সমস্যা এবং পোকামাকড়ের কামড় বা হুল ফোটানোর চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট/ তরল ওষুধ 

- এসিডিটি বা পেটের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্য অ্যান্টাসিড

- শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণের জন্য রিহাইড্রেশন স্যাচেট  

- পোড়া ক্ষত উপশমের মলম যেমন বার্নল, যা ঘরের রান্নাবান্না বা অন্য কোনোভাবে হালকা পুড়ে গেলে দারুণ কাজ করে 


প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম


- শরীরের তাপমাত্রা বা জ্বর মাপার জন্য ডিজিটাল থার্মোমিটার সবচেয়ে নিরাপদ

- ব্যান্ডেজ, গজ বা টেপ কাটার জন্য ছোট কাঁচি

- চামড়ায় অনেক সময় অসাবধানতাবশত কাঁটা বা কাঁচের টুকরা ঢুকে যায়। ড্রেসিং বা ব্যন্ডেজ করার আগে তা সাবধানে বের করার জন্য চিমটা অনেক কার্যকর 

- রক্তচাপ মাপার যন্ত্র। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য এটা খুবই জরুরী 

- ব্যন্ডেজ ও স্লিং আটকে রাখার জন্য সেফটি পিন 



ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী


- প্রাথমিক চিকিৎসা শুরুর আগে হাত জীবাণুমুক্ত করার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার 

- ক্ষত পরিস্কার করার জন্য অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপস

- ক্ষত ও চোখ থেকে ময়লা বা কণা নিরাপদে ধুয়ে পরিষ্কার করার জন্য জীবাণুমুক্ত স্যালাইন দ্রবণ

- ক্ষতের সংক্রমণ এড়াতে ডিসপোজেবল গ্লাভস


জরুরী টিপস


- পরিবারের কারো যদি ডায়াবেটিস, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ সহ অন্য কোন দীর্ঘমেয়াদী রোগ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ বা ইনহেলারও সরবরাহ করে রাখুন। 

- প্রতি ৬ মাস পর পর ফার্স্ট এইড বক্সের ওষুধগুলোর মেয়াদ পরীক্ষা করুন। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বদলে নতুন ওষুধ রাখুন। 

- বক্সটি শুকনো ও ঠান্ডা এমন স্থানে রাখুন যাতে পরিবারের যে কোন সমস্যায় তা সহজেই পাওয়া যায়। আর তা অবশ্যই শিশুদের হাতের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।

- বক্সের ভেতরে একটি কাগজে প্রয়োজনীয় নাম্বার সমূহ যেমন পারিবারিক চিকিৎসক, নিকটস্থ হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্সের হটলাইন নাম্বার লিখে রাখুন। 


দূর্ঘটনা এড়ানো সবসময় সম্ভব নয়, কিন্তু তা মোকাবেলা করতে প্রস্তুত থাকা সম্ভব। এটি পেশাদার চিকিৎসাসেবার বিকল্প নয়। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হলো একটি পরিপূর্ণ ফার্স্ট এইড বক্স। তাই ঘরে না থাকলে আজই একটি প্রস্তুত করে রাখুন। আর যদি থেকে থাকে তবে বক্সটি খুলে দেখুন প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে তো?   


তথ্যসূত্র:

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (হু), মায়ো ক্লিনিক, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি


ছবি: সংগৃহীত


sidebar ad