ডেঙ্গু: উপসর্গ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ (ভিডিওসহ)


ডেঙ্গু: উপসর্গ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ (ভিডিওসহ)

বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। এডিস মশাবাহিত এই ভাইরাসজনিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডেঙ্গুর উপসর্গ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান।


ভিডিও লিঙ্ক


ডেঙ্গু কত ধরনের?


চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডেঙ্গুকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়—


১. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু (Classical Dengue Fever)


২. ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (Dengue Hemorrhagic Fever)


৩. ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (Dengue Shock Syndrome)


ডেঙ্গুর প্রধান উপসর্গ


ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ থাকে না। তবে রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বর হতে পারে, যা অনেক সময় ১০৩° থেকে ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছে যায়।


এ ছাড়া দেখা দিতে পারে—


  • তীব্র মাথাব্যথা 
  • চোখের পেছনে ব্যথা 
  • মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা 
  • হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা 
  • বমি বমি ভাব বা বমি 
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা 
  • শরীরে লালচে র্যাশ 
  • রক্তের প্লেটলেট কমে যাওয়া 


ডেঙ্গুর শরীরব্যথা এতটাই তীব্র হতে পারে যে রোগীর মনে হয় যেন শরীরের হাড় ভেঙে যাচ্ছে। এ কারণেই ডেঙ্গুকে  ‘ব্রেকবোন ফিভার (Breakbone Fever)’ বলা হয়।

   

‘ডেঙ্গু’ নামের উৎপত্তি


একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রচলিত সোয়াহিলি ভাষার "ডেঙ্গে (Denge)" শব্দ থেকে "ডেঙ্গু" নামটির উৎপত্তি। 'ডেঙ্গে' শব্দের অর্থ বাঁকা হয়ে যাওয়া। তীব্র শরীরব্যথার কারণে রোগীরা শরীর বাঁকা করে চলাফেরা করতেন বলেই এ নামের প্রচলন হয়েছে।


প্লাটিলেট কমে গেলে কী হয়?


প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে গেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এর ফলে দেখা দিতে পারে—


দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়া 


  • নাক বা মুখ দিয়ে রক্তপাত 
  • চোখে রক্তক্ষরণ 
  • অন্ত্রে রক্তপাত 
  • ত্বকে লালচে দাগ 


রোগের অবস্থা গুরুতর হলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ (Internal Bleeding) হতে পারে, যা জীবনহানির কারণও হতে পারে।


কীভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়?


ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে—


    • DENV-1 
    • DENV-2 
    • DENV-3 
    • DENV-4 


রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তের জন্য NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত ডেঙ্গু নির্ণয় করা সম্ভব।


ডেঙ্গুর চিকিৎসা


ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেই।

জ্বর ও ব্যথার জন্য—


প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে।


তবে নিচের ওষুধগুলো খাওয়া উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—


  • আইবুপ্রোফেন 
  • ডাইক্লোফেনাক 
  • কেটোপ্রোফেন 
  • এ ধরনের অন্যান্য NSAID ওষুধ 


কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?


নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে—

  • বারবার বমি 
  • রক্তপাত 
  • প্রচণ্ড দুর্বলতা 
  • শ্বাসকষ্ট 
  • অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব 
  • অন্য কোনো জটিল উপসর্গ 


এ সময় পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন এবং অন্যান্য তরল খাবার পান করাও অত্যন্ত জরুরি।


ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়


ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। তাই প্রতিরোধের মূল উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। বর্তমানে দেখা গেছে, শুধু পরিষ্কার পানিই নয়—যেকোনো জমে থাকা পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। এ ছাড়া বাড়ির ভেতরে যেসব স্থানে পানি জমে থাকতে পারে:


  • এসির নিচের ট্রে 
  • ফ্রিজের ট্রে 
  • ওয়াটার ফিল্টারের ট্রে 
  • ফুলের টব 
  • ভাঙা পাত্র 
  • বোতলের ঢাকনা 
  • ছোট ছোট গর্ত 


মাত্র ২–৩ মিলিমিটার পানি জমে থাকলেও সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। তাই সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার এসব স্থান পরিষ্কার করতে হবে।


বাড়ির বাইরে যেসব স্থান পরিষ্কার রাখা জরুরি


  • ফুলের টব 
  • ডাবের খোসা 
  • নারিকেলের খোসা 
  • পরিত্যক্ত পাত্র 
  • নালা-নর্দমা 
  • যেকোনো স্থানে জমে থাকা পানি 



সামান্য সচেতনতাই এডিস মশার বংশবিস্তার অনেকাংশে রোধ করতে পারে



ব্যক্তিগত সুরক্ষা


আগে ধারণা ছিল এডিস মশা শুধু দিনের বেলায় কামড়ায়। তবে বর্তমানে জানা গেছে, এটি দিন ও রাত—উভয় সময়েই কামড়াতে পারে। যদিও ভোর ও সন্ধ্যায় এর সক্রিয়তা বেশি থাকে।



নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে—


দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন। 


বাইরে গেলে ফুলহাতা পোশাক পরুন। 


প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক (Repellent) ব্যবহার করুন। 


ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশানাশক স্প্রে করা যেতে পারে। 


কখন সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকবেন?

বাংলাদেশে সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্তও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।


কারা বেশি ঝুঁকিতে?


নিচের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে—

  • শিশু 
  • বয়স্ক ব্যক্তি 
  • ডায়াবেটিস রোগী 
  • উচ্চ রক্তচাপের রোগী 
  • দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি 



সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ


ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো সচেতনতা। নিয়মিত বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।


লেখক: কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান

এমবিবিএস, এমপিএইচ, এমফিল, ডিএমও, ডিএই (যুক্তরাষ্ট্র)

জনস্বাস্থ্য, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও হাইপারবেরিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল


গ্রন্থনা: ইশরাত জাহান এনা


ঢাকা/লিপি

sidebar ad